.
০২.
যে পরিবেশে নজরুলের প্রতিষ্ঠা, তা আজ অপগত। এখন নজরুলকে কোনো দৃষ্টিতে দেখব, যাচাই করব কোনো নিরিখে, দৃষ্টি হবে কি ঐতিহাসিকের, নিরিখ হবে কি সাহিত্যের?
ঐতিহাসিকের বিচারে নজরুল যুগের দান ও যুগধর। তাঁর ভূমিকা ও সাফল্য সময়োচিত। তাঁর প্রয়াস ও প্রভাব উত্তেজনার মুহূর্তে গণমানসের চাহিদার আনুপাতিক। তাঁর চেতনা ও জীবনদর্শন পুরোনো ও স্থূল। সে কারণে তাঁর আহ্বান মর্মস্পর্শী ও গণ- বুদ্ধিগ্রাহ্য। কাজেই নজরুল Heor–জনমন অধিনায়ক।
উত্তেজনা জিনিসটি একমুখো বিশেষ চেতনার প্রসূন। কাজেই তা কেবল উদ্দীপক চায়, হিতাহিত পরখ করে না। অতএব নজরুলকে দিয়ে সমকালীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ হয়েছে, তাঁর মাধ্যমে গণবিক্ষোভ পেয়েছে অভিব্যক্তি। তাই নজরুল সফল ও সার্থক। গণমানসও কৃতার্থ এবং কৃতজ্ঞ। সুতরাং তার ভূমিকা কালিক, তাঁর সাফল্য স্থানিক এবং তাঁর প্রয়াস সাহিত্যিক।২ সদর্থেই বলা চলে, তিনি হুজুগ মিটানো যুগের কবি। তাঁর হালকা বক্রোক্তিই নিয়তি নির্দেশের মতো তাঁর সম্বন্ধে সত্য ভাষণের রূপ নিয়েছে :
বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবি।
ইতিহাস হচ্ছে মুখ্যত কাল-চেতনার স্বাক্ষর। এবং Literature-ও is a journalism that lasts, কাজেই নজরুল-সাহিত্য এ তত্ত্বের স্বীকৃতি অনুসারে সাময়িক নয়, চিরন্তন। এক বিশেষ দেশ-কালে মানুষের জীবন-প্রতিবেশ ও জীবন-চেতনার অক্ষয় শৈল্পিক সাক্ষ্য।
.
০৩.
কিন্তু সাহিত্যশিল্পের দাবী অন্যতর। শিল্প- নিরিখে যাচাই করলে নজরুলের ঠাই কোথায়, দেখা যাক। যাঁরা ঐতিহাসিক দৃষ্টির পক্ষপাতী, তাঁদের সঙ্গে আমাদের এখানেই ছাড়াছাড়ি। কেননা আমরা ভিন্নযুগের মানুষ। আমাদের কাছে নজরুল কেবল কবি-শিল্পী। তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ও সম্পর্ক সাহিত্যের হাটে। এখানে বক্তব্যের মূল্য কানাকড়ি, ভঙ্গির দাম অপরিমেয়, আদর্শের মূল্য গুরুতর, লক্ষ্যের প্রয়োজন স্বীকৃত, দর্শনের মিশ্রণ অভিপ্রেত। নজরুলের রচনায় আমরা কী পাই, এ তৌলে নজরুল কোথায় দাঁড়ান, খুঁটিয়ে দেখা যাক।
নজরুলের প্রথমদিককার সগ্রামী কবিতায় রয়েছে কোরান-হাদিস ও গীতা-পুরাণের বাণীর। ছান্দসিক রূপায়ণ। আস্তিক কবি ধর্মীয় চেতনার আশ্রয়ে, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বাণীর আবরণে তার বক্তব্য পেশ করেছেন। পুরোনো কথাই পাঠকের সুপ্ত চেতনায় তীক্ষ্ণ করে তুলবার এ এক সুপ্রয়াস মাত্র। অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী, ভাঙ্গার গান স্মর্তব্য। এক্ষেত্রে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের কবির জীবন-চেতনা কালোচিত নয়। কেননা তাঁর শাস্ত্রীয় মানবতা ন্যায় ও করুণাভিত্তিক, জীবন জীবিকার ক্ষেত্রে সম-অধিকারের অঙ্গীকারপ্রসূত নয়। তবু কবিচিত্তে অতীতের বন্ধনমুক্তির একটি লক্ষণ ছিল সুস্পষ্টতা তার গোঁড়ামিমুক্ত উদার দৃষ্টি, যে দৃষ্টি সম্প্রদায়-ভেদ মিথ্যা বলে জেনেছিল। এখানেই তাঁর আত্মশক্তির পরিচয়, তাঁর সৃষ্টির সৌন্দর্যের উৎস, এবং তাঁর কাব্য হৃদয়ভেদ্য হবার কারণ। এ পর্বে কবি মুখ্যত ন্যায়-নীতি ও আদর্শবাদের প্রেরণা সঞ্চারে প্রয়াসী। সে-প্রেরণা প্রধানত নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা এবং চেতনাপ্রসূত। তাই সর্বত্র তাঁর বাণীর বাহন ও সহগামী হয়েছে মুসলিম ঐতিহ্য ও হিন্দু পুরাণ।
দ্বিতীয় পর্বে পাচ্ছি! সাম্যবাদী, সর্বহারা, ফণিমনসা, জিঞ্জির, সন্ধ্যা ও প্রলয় শিখা। এ সময়ে কবি মানবিক আবেদনের ফলপ্রসূতায় আস্থাবান। এবার তাঁর যুক্তি দ্বিমুখো–শাস্ত্রীয় ও মানবীয়। ধর্মের দোহাই, বিবেকের দিব্যি ও মানবতার যুক্তি প্রয়োগে মানুষকে দায়িত্ব-সচেতন, কর্তব্যপরায়ণ, ন্যায়নিষ্ঠ ও সংবেদনশীল করে তুলতে কবির প্রযত্ন লক্ষণীয়। এ পর্বে কবির শাস্ত্র-চেতনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার সাম্য ও সমাজবাদের পরোক্ষ প্রভাব। এ স্তরে কবি তাই দ্বৈতসত্তায় দিশাহারা। আসলে ইসলামী সাম্য ও সমাজবাদের ধন বণ্টননীতির সমন্বয়ে তিনি দুকূল রক্ষায় প্রয়াসী। কেননা তার যুগে সমাজতন্ত্রে দীক্ষার পূর্বশর্ত ছিল নাস্তিক্য, তা তিনি গ্রহণ করেননি। কাজেই তিনি মার্কসীয় সমাজতত্ত্বে কিংবা লেনিনীয় সমাজ বিন্যাসে আস্থা রাখতে পারেননি। অতএব তার শ্রেণী-চেতনা তখনো ধর্মীয় সংস্কার প্রভাবিত। তাই তিনি যখন বলেন :
গাহি সাম্যের গান।
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই
নাহি কিছু মহীয়ান।
তখন তা মার্কসীয় শ্রেণীবিরোেধতত্ত্বের স্বীকৃতি নয়, বরং তার শাস্ত্রীয় মানুষ যে নুর-ই-ইলাহি ও আশরাফুল মখলুকাত কিংবা নরনারায়ণ ও জীব্ৰহ্ম—এ তথ্যের অঙ্গীকার মাত্র। কাজেই তিনি ধার্মিকের ন্যায় শাসিত প্রীতি-সুন্দর সমাজ কামনা করেছিলেন, নাস্তিকের ধন নিয়ন্ত্রণ ভিত্তিক সমাজ তাঁর অভিপ্রেত ছিল না। এক্ষেত্রে নজরুলের ভূমিকা কতকটা এ যুগের স্বধর্মপ্রিয় বুদ্ধিজীবীর মতো, যাঁরা ক্যুনিজমকে গ্রহণ করতে নারাজ, কিন্তু তার সুব্যবস্থায় ও প্রভাবে বিচলিত এবং স্বধর্মে ক্যুনিজমের ব্যবস্থাবলী সন্ধানে উৎসুক এবং স্বধর্মে কমুনিজমের নীতি ও আদর্শের মিল আবিষ্কার করে তৃপ্ত ও নিশ্চিন্ত। কাজেই মুক্তপ্রাণ হলেও নজরুল ছিলেন বদ্ধচিত্ত। তাই তিনি লড়িয়ে সৈনিক হয়েই রইলেন, জিগীষু সেনাপতি হয়ে উঠেননি। তাঁর কাব্যে তাই সমাজ ভাঙার গান আছে, গড়ার পরিকল্পনা নেই।
