জীবন-প্রতিবেশে যখন অসঙ্গতি, অন্যায়, পীড়ন ও অভাব দেখা দেয়, অর্থাৎ যখন জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা নেমে আসে, তখনই তার কারণ নিরূপণ ও কারণ আপসারণের প্রয়োজন অনুভূত হয়। এবং তখন মননশীল, দায়িত্বসচেতন ও কর্তব্যপরায়ণ মানুষ প্রতিকারের উপায় খোঁজে। এতেই নতুন চিন্তার জন্ম হয় এবং মতরূপে, ধর্মরূপে, নীতিরূপে ও আদর্শরূপে তা কর্মে ও আচরণে অভিব্যক্তি পেতে থাকে। যারা বর্তমান পরিবেশের সুযোগে বড় হয়েছে কিংবা বড় রয়েছে, তারা এ পরিবেশের পরিবর্তনে আতঙ্কিত হয়। কেননা পরিবর্তিত পরিবেশে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কাজেই স্থিতিতে তাদের মঙ্গল, গতিতে অকল্যাণের আশঙ্কাই প্রবল। তাই তারা সর্বপ্রকার নতুন ভাব-চিন্তা-আচার ও রীতিনীতি-পদ্ধতির প্রতিরোধকল্পে মরিয়া হয়ে দাঁড়ায়। তারা ইতিহাসে রক্ষণশীল কিংবা গোড়া অভিধা পায়। তারা সংখ্যায়ও থাকে গরিষ্ঠ। তবু তাদের আপাতপ্রাবল্য পরিণামে তাদের পরাজয়ের পথই মুক্ত করে দেয়। ইতিহাসের সাক্ষ্য তারা স্বার্থবশে অস্বীকার করে। ফলে নতুনের জয় যে অবশ্যম্ভাবী তা তারা। মানতে চায় না। তারা যতই আঘাত হানে, আহত ততই প্রবল হয়। আপাত পরাজয়ের ছলে জয়ের নিশানই হাতে পায় আহত। হযরত ইব্রাহীম, হযরত মুসা, হযরত মুহম্মদকে পালাতে হয়েছিল, মরতে হয়েছিল হযরত ঈসাকে। এর আগে-পরেও এমনি কত কত ঘটনা ঘটে গেছে। কিন্তু জয়ী হয়েছেন পলাতক-পরাজিত-নিহতরাই। কাজেই কোনো প্রতিকূল প্রতিবেশেই নতুন চিন্তার মৃত্যু নেই। সে চিন্তা বরং দূর্বার মতোই হয় দুর্বার–কাটাগাছের অঙ্কুরের মতো জেগে ওঠে স্পর্ধায়, ঔদ্ধত্যে ও প্রাণপ্রাচুর্যে।
যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, প্রতিযোগিতা নেই, সেখানে জীবনের বিকাশ নেই, উল্লাস নেই, প্রেরণা নেই, নেই কোনো প্রয়াস। জীবনের জাগরণের জন্য চাই দ্বন্দ্ব, চাই সংঘাত। আর দ্বন্দ্ব সগ্রামের পূর্বগামী হচ্ছে স্বপ্ন-ভাব-চিন্তা-পরিকল্পনা, সহচর হচ্ছে কর্ম। এ দ্বন্দ্বে-সংঘাতে যারা ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের চোখে পাপী-অপরাধী-আসামী–পরিণামে জয়ী হয় তারাই। এমনি নতুন চিন্তা আঘাতেই জাগে। তাই এ চিন্তা আঘাতেরই সন্তান। এই অর্থেই আঘাত সে যে পরশ তব সেই তো পুরস্কার।
দূর্বা ক্ষুদ্র ও কোমল। পায়ে দলিত হওয়াই তার নিয়তি। তবু সে অমর ও চিন্ময়–সবুজ ও প্রাণময়। তেমনি মানবদরদী ও মানবতাবাদী মনীষীরা সংখ্যায় নগণ্য বাহুবলে তুচ্ছ। নির্যাতনই তাদের ললাটলিপি। তবু তারাই মানবভাগ্যের নিয়ন্তা। তাঁরা ভাঙেন কিন্তু মচকান না। নিজেরা মরেন কিন্তু দিয়ে যান আবেহায়াত। চিন্তাবিদ বাহ্যত একক ব্যক্তি, কিন্তু আসলে রক্তবীজ। দূর্বার মতোই চিন্তা ও চিন্তাবিদের ধ্বংস নেই। সে মরে মরেই বাঁচে।
নজরুল সমীক্ষা : অন্য নিরিখে
০১.
কাজী নজরুল ইসলাম পূর্ব বাঙলার সবচেয়ে প্রিয় নাম। দুই বঙ্গেই এই নাম নিত্য উচ্চারিত এবং পূর্ববাঙলায় নিত্য আলোচিতও। এ প্রিয়তা যতখানি আবেগ সঞ্জাত, ততখানি বিচারসিদ্ধ যে নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ শতকের দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকে বাঙালি মাত্রেই ছিল তাঁর কাব্যের রসমুগ্ধ, এবং অনুরাগপ্রসূত আবেগ-বশে তাঁকে বিদ্রোহী, বিপ্লবী, গণসংগ্রামী, সাম্যবাদী, এবং মানবতার, যৌবনের, তারুণ্যের ও স্বাধীনতার কবি প্রভৃতি নানা আখ্যায় বিভূষিত করে কৃতজ্ঞ মানুষ তাদের আকৃতির অভিব্যক্তি দিয়েছে।
তিনি বাঙালিকে চমকে দিয়েছিলেন, মাতিয়ে তুলেছিলেন ঠিকই। এবং এও সত্য যে রবীন্দ্রনাথ যে-দেশে অর্ধজীবন নিন্দা ও তাচ্ছিল্য পেয়েছেন, নজরুল প্রথম দর্শনেই পেয়েছেন বরণডালা। এটি তার প্রথম জয়।
যুদ্ধোত্তর য়ুরোপীয় বিপর্যয়, রুশবিপ্লব, বেঙ্গল প্যাক্ট, অসহযোগ, জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ড, সাইমন কমিশন, নেহেরু রিপোর্ট, কোলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, শ্রমিক ধর্মঘট, স্বরাজবাদী প্রভৃতির উত্তেজনাকর পরিবেশে নজরুলের কবিকর্মের শুরু ও চরম বিকাশ। গণসমাজের সব মতবাদীরই ঠিক মনের কথাটি প্রকাশ পাচ্ছিল তার রচনায়। কেননা তিনি কোনো একক মতে নিষ্ঠ ছিলেন না। বারোয়ারি দাবী মিটিয়েই তার আনন্দ। তাঁর বাণীও নতুন ছিল না, কারণ এক্ষেত্রে পূর্বসূরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ ও যতীন্দ্রনাথ। অবশ্য পাঠক-সমাজে তাদের প্রভাব ছিল সামান্য। তার মুখ্য কারণ তাঁদের বাণী যতটা তাত্ত্বিক, ততটা বাস্তব ছিল না। কিন্তু নজরুলের দৃষ্টি ছিল বাস্তব এবং ভঙ্গি ছিল অভিনব। ফলে তাকে মনের কথার মুখপাত্ররূপে পেয়ে দেশের শিক্ষিত মানুষ হল প্রীত। এভাবে গণহৃদয়ে আসন হল তার অনায়াসলব্ধ। তখন মানুষের ঔৎসুক্য ছিল উত্তেজনার ইন্ধন সন্ধানে এবং নজরুল তা না চাইতেই দিলেন অঢেল অজস্র। কাজেই নজরুল হলেন তাদেরই একজন। এই চারণ কবিকে আশ্রয় করেই তাদের যন্ত্রণা পেল অভিব্যক্তি, উত্তেজনা পেল প্রকাশ-পথ এবং তারুণ্য ও বাহুবল হল মহিমান্বিত। নজরুল হলেন গণকবি, তারুণ্যের কবি, যৌবনের কবি, জীবনের কবি, মুক্তির দিশারী কবি। এটি তাঁর দ্বিতীয় সাফল্য।
তাঁর তৃতীয় সাফল্য আসে সঙ্গীতকার রূপে। গণমানসে এই নতুন সুরের আবেদনও ছিল তীব্র ও দ্রুত। প্রথম দুটো স্বীকৃতি এসেছে শিক্ষিত সাহিত্য-পাঠক থেকে। তৃতীয়টি এল গণমানুষ থেকে। অতএব নজরুলের জনপ্রিয়তা ছাপিয়ে উঠল রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠাকেও। এতে অবশ্য বিস্ময়ের কিছু নেই। কেননা বিশেষ স্তরের বিদ্যা, বুদ্ধি ও রুচি অর্জিত না হলে রবীন্দ্রনাথ থাকেন নাগালের বাইরে। আসলে তো এবার ফিরাও মোরে, দীনের সঙ্গী, ধূলা মন্দির, অপমানিত, সবুজের অভিযান, নববর্ষ, শঙখ প্রভৃতি কবিতায় ও গানে বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথ বাঙলার তরুণদের যে আহ্বান জানিয়েছেলেন, তাতেই সাড়া দিয়েছিলেন নজরুল ইসলাম। নজরুলের আবেদন ছিল কানের কাছে–যা দৈহিক উত্তেজনা আনে ও লড়তে পাঠায় এবং যা স্বল্পপ্রাণ ও ক্ষণজীবী। আর রবীন্দ্রনাথের আর্জি ছিল বিবেক ও বুদ্ধির কাছে যা দায়িত্ববোধে প্রবুদ্ধ করে, যার ফল পরোক্ষ কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী।
