অধিকাংশ মুসলমান এদেশী জনগণেরই বংশধর। এসব ধর্ম ও দর্শন সংস্কার তাদের অস্থিমজ্জার সঙ্গে মিশে রয়েছে। তাতে আবার শরীয়তের সঙ্গে সাক্ষাৎ-সম্পর্ক রাখা সম্ভব হয়নি অশিক্ষা ও সূফীমতের প্রবাল্যের দরুন। কাজেই সূফীতত্ত্বের সঙ্গে যেখানেই সাদৃশ্য-সামঞ্জস্য দেখা গেছে সেখানেই মুসলমানেরা অংশগ্রহণ করেছে। এভাবে বৌদ্ধ নাথপন্থ সহজিয়ার তান্ত্রিক-সাধনা শাক্ততন্ত্র, যোগ, ইউনানী-দর্শন প্রভৃতি তাদের আকর্ষণ করেছে এবং এভাবে তারা মিশ্র-দর্শনও খাড়া করেছে। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বলেন, আধ্যাত্মিক বা মারফতী সাহিত্যে ইরানের সূফী প্রভাব, বাঙলার বৈষ্ণব প্রভাব এবং হিন্দুর যোগশাস্ত্র ও দেহতত্ত্ব প্রভৃতির প্রভাব পড়েছে। বৌদ্ধ নাথ ও সহজিয়া পন্থের প্রভাবও রয়েছে এবং বাউল-মুর্শিদা সাহিত্য ছাড়াও নিছক দার্শনিক তত্ত্ব এখানে কম মেলে না। এসব বিভিন্ন ধারার সমন্বয়ের কারণ বোধ হয় এই যে, মানুষের হৃদয়ানুভূতিতে ও মননে এমন একটি স্তর আছে যেখানে সব ভেদাভেদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায়। আমাদের দেশের সাধকগণ অতিমাত্রায় আচারবর্জিত ও মর্মনিষ্ঠ। তাই এমন নির্বিচার সমন্বয় সম্ভব হয়েছে। হরগৌরী সম্বাদ, সত্যকলি বিবাদ সম্বাদ, জ্ঞান-প্রদীপ, যোগকলন্দর, আগম, জ্ঞানসাগর, আবদুল্লাহর সাওয়াল, মুসার সওয়াল মল্লিকার সওয়াল, ইউনান দেশের পুথি, গোরক্ষ বিজয়, সিরাজ সবিল, নুরজামাল প্রভৃতি গ্রন্থ এ শ্রেণীর। ১
সুতরাং দেখা যাচ্ছে বাঙালি মুসলমান মরমীয়ারা যে সাধনপন্থ আবিষ্কার করেছেন তা একান্তভাবে ইসলামী নয়। বস্তুত ভারতীয় সূফীমতবাদও একান্তভাবে আরব্য-পারসিক নয়। এতে যেমন ভারতীয় দর্শনের প্রচুর প্রভাব পড়েছে তেমনি বাঙালি মরমীয়াদের দর্শনে ও ধর্মে প্রচুর দেশজ তথা ভারতীয় উপাদান রয়েছে। ফলে এদেশে চিরকাল হিন্দু-মুসলমান হাতে হাত মিলিয়ে ও মনে মন মিশিয়ে অধ্যাত্মসাধনা করেছে। এভাবেই বাঙলা দেশে হিন্দু-মুসলমানদের মিলিত সাধনায় মরমীয়াদের উপমতগুলো সৃষ্ট হয়েছে। অবশ্য নিরক্ষর জনগণের ধর্ম ও দর্শন বলে এগুলো আশানুরূপ পুষ্ট হয়নি। এবং এ-কথাও স্বীকার্য যে বৈষ্ণব মতই প্রথম হিন্দু-মুসলমানকে একই সাধন-ক্ষেত্রে আনয়ন করে। অতএব এগুলো কোনো বিশেষ ধর্মবিশ্বাস বা সংস্কারের পরিচয় বহন করে না। জগৎ ও জীবনের রহস্য সম্বন্ধে মানুষের চিরন্তন জিজ্ঞাসা এবং তার রহস্য-উদঘাটনের চির কৌতূহল থেকেই এর জন্ম। এ প্রয়াস তাই ধর্মনিরপেক্ষ। যে স্তরের অনুভূতিতে মানবমনে দেশ-কাল, পাত্র ও বিশ্বাসের ভেদাভেদ ঘুচে যায়-এগুলো সে স্তরের অনুভূতি ও উপলব্ধির অভিব্যক্তি। তাই সৈয়দ সুলতান, মোহাম্মদ খাঁ, শেখচান্দ প্রভৃতি ইসলাম ও নবীকাহিনী যেমন শুনিয়েছেন, তেমনি আবার এসব মরমীয়াবাদও প্রচার করেছেন।
দূর্বা
আমাদের দেশে বরণডালায় ধান ও দূর্বা রাখার রেওয়াজ আছে। দুটোই আদিম অস্ট্রিক সংস্কার। একটি প্রাণের প্রতীক, অপরটি জীবিকার। দূর্বার প্রাণশক্তি দুর্বারই বটে। যতই দলিত হোক, যতই তাপদগ্ধ হোক, একবার পানির স্পর্শ পেলেই জেগে ওঠে। বাসন্তী হাওয়া, বিশেষ করে বৃষ্টির পানি পেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মরা দূর্বা সবুজের সমারোহ নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ায়। এক ধান জন্ম দেয় শত ধানের। তাই দূর্বা ও ধান হয়েছে আয়ুষ্কামী ও প্রাচুর্য-প্রত্যাশী মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রতীক।
সর্বপ্রাণবাদী ও জাদুবিশ্বাসী মানুষের অভিজ্ঞতার সঞ্চয় থেকেই এ প্রতাঁকের উদ্ভব। প্রকৃতিই মানুষের আদি ও অকৃত্রিম শিক্ষক এবং চিরন্তন জ্ঞানের উৎস। জীবনের মৌল প্রয়োজনবাঞ্ছা কেমন আশ্চর্য ঋজুতায় অভিব্যক্তি পেয়েছে ধানে ও দূর্বায়। এর মধ্যে রয়েছে অভিজ্ঞতা জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মনন ও কবিত্বের অনন্য সমন্বয় ও অপরূপ মাধুর্য।
এজন্যে প্রকৃতির মতো শিক্ষক নেই–প্রকৃতির মতো গ্রন্থ নেই। দুনিয়ার বহু মহামানব প্রকৃতি থেকে পাঠগ্রহণ করেই হয়েছেন লোক-শিক্ষক। প্রকৃতির পাঠের আদি অন্ত নেই। এ গ্রন্থ চিরনতুন ও চিরন্তন জ্ঞানের আধার। উৎসুক দৃষ্টিতে কৌতূহল নিয়ে প্রকৃতির দিকে তাকালেই নব নব তাৎপর্যে প্রকৃতি নতুন হয়ে ধরা দেয়। তার বিচিত্র রহস্য-চেতনা মানুষকে করে জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ।
দূর্বার সুপ্তি আছে–আত্মগুপ্তি আছে কিন্তু মৃত্যু নেই। মানুষেরও প্রয়োজন-চেতনার শেষ নেই। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে মানুষের যে-চিন্তা তারও ক্ষয় নেই, নেই মৃত্যু। অন্ন ও আনন্দের অন্বেষা মানুষকেও দূর্বার মতোই দেয় দুর্বারশক্তি। তাই মানুষের চিন্তার উন্মেষ কখনো রোধ করা যায় না। তার বিকাশ প্রবলতর শক্তি সাময়িকভাবে হয়তো ঠেকিয়ে রাখতে পারে; কিন্তু নির্মূল করবার শক্তি নেই কোনো মর্তমানবের। শোনা যায়, চারাগাছের ডগা ছাগলে চিবোলে তা বাড়ে না। তেমনি সমাজের কিংবা শাসকের বিরূপতায় চিন্তাও স্বাভাবিক বিকাশ পায় না। ছাগলের মুখ-লাগা চারার মতোই তা রুদ্ধ-বাড় হয়েই বেঁচে থাকে। আবার উদ্ভিদ জগতে এমন অনেক বৃক্ষ দেখা যায় যাদের গোড়া কেটে দিলেও প্রাণ হারায় না। বরং রক্তবীজের মতোই অসংখ্য হয়ে নব নব কিশলয়ের ধ্বজা নিয়ে আকাশের দিকে মাথা বাড়ায়। সামাজিক-রাষ্ট্রিক পীড়নও তেমনি চিন্তার প্রসার ঘটায়। কেননা নির্ধ-নির্বিঘ্ন পরিবেশে চিন্তার জন্ম নেই। সব প্রয়াসের পশ্চাতেই থাকে অভাববোধ। প্রাপ্তির প্রয়োজন-চেতনা না জাগলে প্রয়াসের প্রেরণা জন্মায় না। কাজেই বাধাই বাধা ছিন্ন করার প্রেরণা যোগায়, বন্দিত্বই জাগায় মুক্তির কামনা, পরাধীনের স্বাধীনতাবাঞ্ছাই যোগায় সংগ্রামের শক্তি। তেমনি চিন্তার স্বাধীনতা যেখানে অস্বীকৃত, চিন্তার প্রয়োজন ও প্রেরণা সেখানেই প্রবল।
