এখানে কয়েকটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য; (১) বৈদিক সাধন-ভজন যজ্ঞের মারফতই চলত। (২) কোনো বিশেষ দেবতার প্রতি আনুগত্য বা ভক্তি প্রদর্শন আবশ্যিক ছিল না, যেমন দেবতাগণ যজ্ঞ মারফত ভোগ পেলেই মূল-স্বরূপ অভিষ্ট বরদানে বাধ্য হতেন (৩) ভক্তিমার্গ ও জ্ঞানমার্গ তখনো প্রচলিত হয়নি, শুধু কর্মমার্গই ছিল। (৪) সৃষ্টি ও স্রষ্টা, জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে গভীরতর জিজ্ঞাসা তখনো প্রবল হয়নি। (৫) তখনো পৌত্তলিকতা প্রশ্রয় পায়নি। এর পরের স্তরে বৈদিক আর্যধর্মের মিশ্র বিকাশ হয় অনার্য সাংখ্য ও যোগদর্শন অবলম্বন করে। পরবর্তী যোগশাস্ত্রে সম্ভবত আর্যপ্রভাবই বেশি। এবং কালিক বিকাশের ধারায় তা জটিল ও বিভিন্নমুখী হয়ে উঠেছে, কপিল সাংখ্য বা পাতঞ্জল যোগের কিছুই এখন অবশিষ্ট রয়েছে বলে মনে হয় না। কপিল-সাংখ্যসূত্র বোধ হয় খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ-তৃতীয় শতকে রচিত হয় আর খ্রীস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পতঞ্জলি যোগসূত্র রচনা করেন। খ্রীস্টীয় প্রথম শতকের চরক ও আড়াঢ় ঋষি সাংখ্যমত নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। আধুনিক স্যাংখ্যমতের ভিত্তি হচ্ছে খ্রীস্টীয় তৃতীয় শতকে রচিত ঈশ্বরকৃষ্ণের সাংখ্য-কারিকা। সুতরাং সাংখ্য ও যোগ যে বৌদ্ধ-জৈন প্রভাবিত তাতে সন্দেহ নেই। কাজেই আলোচনা নিরর্থক। সাংখ্য সিদ্ধান্ত প্রকৃতি ও পুরুষ তত্ত্ব-ভিত্তিক। যোগ ঈশ্বরবাদী, সাংখ্য নিরীশ্বর।
বেদান্ত দর্শনের ভাস্কর বা শঙ্কর সিন্ধুদেশে মুসলমান বিজয়ের পরে আবির্ভূত হন। জ্ঞানমার্গ শঙ্করেরই সৃষ্টি। প্রজ্ঞা দ্বারাই মুক্তি বা মোক্ষলাভ ঘটে। তজ্জন্য কোনো প্রকার যাগযজ্ঞ, সন্ধ্যা বন্দনাদি নিত্য কর্ম; গ্রহণ প্রভৃতিতে স্নান, দান প্রভৃতি নৈমিত্তিক কর্ম; কিম্বা নানা পূজা-অর্চনাদি কার্যকর্ম করিবার প্রয়োজন নাই। যাহারা বেদবিধি নিষেধাদি মানিয়া চলিবেন তাহারা তত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী নন।১ শঙ্করের মায়াবাদ ভাববাদী বৈরাগ্যপ্রবণ দ্রাবিড় প্রভাবের ফল। আনুষ্ঠানিক ধর্মে অস্বীকৃতি বৈদিক প্রভাবমুক্তির পরিচায়ক। জীব ও জগৎ প্রাতিভাসিক সত্যমাত্র–পূর্ণজ্ঞানে অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞানের উন্মেষের সঙ্গে এর বিলুপ্তি–এই মায়াবাদ বৈরাগ্যবাদের জন্ম দেয়। শঙ্করের মতবাদকে অদ্বৈতবাদ বলে-ব্ৰহ্ম ছাড়া কিছুই নেই; আর সব মিথ্যে; অবিদ্যা বা অজ্ঞানতার দরুন জীব বা জগৎ সত্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে মাত্র। কাছেই ব্ৰহ্ম ছাড়া আর সব মিথ্যে—-একেম মেবা দ্বিতীয়ম শঙ্কর জ্ঞান-প্রজ্ঞালাভের সাধনা ছাড়া অন্য আরাধনা স্বীকার করেন না। শঙ্করের অদ্বৈতবাদ ও জ্ঞানমার্গ প্রবর্তনের মূলে যে ইসলামের প্রভাব রয়েছে–আজকাল তা আর অস্বীকৃত হয় না।
গীতায় ঋগ্বেদের কর্মবাদ স্বীকার করা হয়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে অদৃষ্টবাদ–যা বেদে ছিল না, যুক্ত হয়েছ। ফলে ধর্মের সঙ্গে শ্রদ্ধা ও ভক্তির রেশ মিশ্রিত হয়েছে। কর্মণ্যে বাদিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন-এ নিশ্চিতভাবে অবৈদিক। স্মরণ রাখা দরকার যে, গীতা অনার্যা মেছুনীর গর্ভজাত সন্তানের রচিত।
তারপর মুসলমান বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং তার আগেও ইরানী সূফীতত্ত্বের প্রভাবে ভারতে ভক্তিবাদের উদ্ভব হয়। বিশিষ্ট অদ্বৈতবাদী রামনুজ, দ্বৈতবাদী মাধ্ব ভেদাভেদবাদী নিৰ্ষাকচার্য, শঙ্করের মায়াবাদবর্জিত অদ্বৈতবাদ, চৈতন্যদেবের অচিন্ত্য দ্বৈতাদ্বৈতবাদ এর প্রভাবেই উদ্ভূত হয়। এই ভক্তিবাদের মধ্যে অন্তঃ সলিলা ফন্ধুর মতো বৈরাগ্যবাদই জয়ী হল–মূলত শঙ্করের মায়াবাদে ব্যবহারিক জীবনের অর্থাৎ পার্থিব জীবনের যে অসারতা ঘোষিত হয়েছে, তাই ভক্তিবাদের আবরণে স্বীকৃত হল– জগৎ সত্য হলেও নিত্য নয়, সুখময় নয়। কাজেই যা নিত্য, যা চরম, যা পরম, যা হলে নিশ্চিন্ত হওয়া চলে, নির্ঘ হওয়া সম্ভব হয়–তাকে পাওয়ার সাধনাই জীবনের চরম ও পরম ব্রত হওয়া উচিত। কাজেই অনিত্য সংসারের প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শন করাই হচ্ছে বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞাবানের লক্ষণ।
গীতায় কর্মের কথা আছে, শঙ্করে জ্ঞানের কথা রয়েছে। এই কর্মবাদের সঙ্গে আর্যদের মানস সম্পর্ক গভীরতম, জ্ঞানমার্গের সঙ্গেও যোগ সুদৃঢ়। তাই বর্ণহিন্দুগণ গীতা ও অদ্বৈতবাদ সহজে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ভক্তিবাদের প্রসার অনার্যদের মধ্যেই বেশি। প্রজ্ঞালব্ধ মুক্তি সবার পক্ষে সম্ভব নয়, কর্মলব্ধ মুক্তিও কি সহজ! তাই ভক্তিবাদ আভিজাত্যহীন জনসমাজে সাদরে গৃহীত হল। মানস বৈরাগ্যজাত এই ভক্তিবাদ। নয় শতক থেকেই রাধাবাদের তথা রাধাকৃষ্ণ লীলাতত্ত্বের উদ্ভব। রাধাকৃষ্ণ সম্ভবত দাক্ষিণাত্যের কৃষ্ণ নাপ্পিনাই লীলার প্রভাবে পরিকল্পিত। আর চৈতন্য সমকালে (মুখ্যত চৈতন্যের দান) ভক্তিবাদ প্রেমবাদে পরিণতি পায়।
এদিকে যোগ ও সাংখ্যের প্রভাবে তান্ত্রিক ও যোগ সাধনার বহুল প্রচলন হল। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মধ্যে গীতার কর্মবাদ ও শঙ্করের জ্ঞানবাদ উচ্চশ্রেণী অনার্যদের মধ্যে ভক্তিবাদ এবং নিম্নশ্রেণীর জনসাধারণের মধ্যে যোগ ও তন্ত্র প্রাধান্য লাভ করেছিল। বৌদ্ধ বজ্রযানীদের থেকেই নাথ-সহজিয়া মতের বিকাশ। এর জের রয়েছে বাউল মতে ও বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্বে এবং শৈব সাধনায়।
