তৈস্তের্জীবোপহারৈর্গিরিকুহরশিলাসংশয়ামচয়িত্ব
দেবীং কান্তার দুর্গা রুধিরমুপতরু ক্ষেত্র পালায় দত্ত্বা।
তম্বীবীণা বিনোদব্যবহৃতসরকামচিহ্ন জীর্ণে পুরাণীং
হালাং মালুরকোষৈষু বতিনাহচরা বর্বঃ শীলয়ন্তি।
অনেকগুলো আর্য ও অনার্য দেবতা মিলে ধর্মঠাকুর হয়েছেন। বৈদিক বরুণ ও রথারোহী সূর্য, অবৈদিক কূর্মাবতার, ঈরাণীয় বুটপরা ঘোড়াচড়া সিপাহী মিহির, ভবিষ্য বা পৌরাণিক কল্কি অবতার ও অনার্য পাষাণ, তাম্রধাতু ও বৃক্ষদেবতা–এই সব মিলে ধর্মঠাকুরের উদ্ভব।
ধর্মঠাকুরের ধ্যানে তাঁকে শূন্যমূর্তি বলা হয়েছে। এই শূন্য বৌদ্ধ মহাযান মতের শূন্য নয়। এখানে শূন্য মানে নিষ্কলঙ্ক শুভ্র। ধর্মদেবতা নিষ্কলঙ্ক সবশ্বেত তাঁর বাহন উলুক বা উল্লুক হচ্ছে পেঁচা বা শাদা কাক। রূপকচ্ছলে ধর্মঠাকুরকে শাদা হাঁস কল্পনা করা হয়েছে। সিপাহী মূর্তিতেও তাঁর বাহন শ্বেত-অশ্ব। ধর্মপূজার মন্ত্রে সূর্যকে নিরঞ্জন শূন্য দেহ বলা হয়েছে। ধর্মঠাকুরের প্রতীক যা পূজা করা হত, তা হচ্ছে কূর্মাকৃতি পাষাণ খণ্ড অথবা পাষাণ নির্মিত কূর্মবিগ্রহ। কূর্ম-প্রতিমার পৃষ্ঠে সাধারণত ধর্মঠাকুরের পাদুকাচিহ্ন আঁকা থাকত। এই পাদুকাচিহ্নই ধর্মঠাকুরের আসল প্রতীক। ধর্মপণ্ডিত অর্থাৎ ধর্মপূজার যারা পুরোহিত তারা সর্বদা গলায় ধর্মঠাকুরের পাদুকা ঝুলিয়ে রাখতেন। ধর্ম ছিলেন আদিতে যোদ্ধা ডোম জাতির দেবতা, তাই ডোমেরাই ধর্মপূজার প্রধান অধিকারী ছিল। এখন কৈবর্ত, বার্মাদ, ধোপা, পুঁড়ি ইত্যাদি নানাজাতির ধর্মপণ্ডিত দেখা যায়। যেখানে ধর্মঠাকুর শিব বা বিষ্ণু হয়ে গেছেন সেখানে পৌরোহিত্য ব্রাহ্মণে গ্রহণ করেছে (সুকুমার সেন–প্রাচীন বাংলা ও বাঙ্গালী)।
উপরের মন্তব্যগুলি বোধ হয় বিশদ করবার প্রয়োজন আছে। আমাদের মৌল বক্তব্য ভারতীয় আর্যদের উপর অনার্যদের প্রভাব। এ এত বেশি এবং সুদূরপ্রসারী যে, তা সহজে হৃদয়ঙ্গম করা একরূপ অসম্ভব। আর্যগণ শুধু ঋগ্বেদ সম্বল করে ভারতে এসেছিলেন এবং সংখ্যায়ও খুব বেশি এসেছিলেন বলে মনে করবার কোনো কারণ নেই। সুতরাং বৈদিক ধর্মশাস্ত্রের যে ক্রমপরিণতি ও প্রসার ঘটেছে তাতে অনার্য অবদান তুচ্ছ নয়। অথর্ব বেদ পুরো এবং সাম বেদের কোনো কোনো সূক্ত এদেশেই রচিত হয়। ব্রাহ্মণ ও আরণ্যক দুটোও এখানেই রচিত। আরণ্যক বিধিতে যে ভাববাদী দ্রাবিড় প্রভাব পড়েছে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কেননা ক্রিয়াসর্বস্ব বৈদিক ধর্মের সহসা কল্পনাশ্রয়ী হবার অন্য কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
বৈদিক ধর্ম একান্তভাবে অনুষ্ঠান-প্রধান। এ ধর্মের আদি দেবতা প্রকৃতি-প্রতীক। যেমন বরুণ, অগ্নি, ইন্দ্র প্রভৃতি। যাগযজ্ঞই ধর্মাচরণে একমাত্র পন্থা। এক কথায় বেদের কর্মকাণ্ড অবিমিশ্র আর্যধর্ম। ব্রাহ্মণ এবং জৈমিনির পূর্ব-মীমাংসাও আর্যসৃষ্টি। সাংখ্য ও যোগ কিন্তু অনার্যদর্শন।
বেদান্ত আর্য-অনার্য উপাদানে রচিত। এগুলোর রচনাকাল খ্রীস্টপূর্ব সপ্তম-ষষ্ঠ থেকে খ্রীস্টীয় বৌদ্ধ শতক অবধি। কতগুলো উপনিষদের তাৎপর্য নিয়ে ব্রহ্মসূত্র ও গীতা কবে রচিত হয়, তা কেউ বলতে পারে না। ব্ৰহ্মসূত্রের আদি রচয়িতা বলে কথিত ব্যাসদেবের সূত্র পাওয়া যায়নি। আবার সব সূত্রই ব্যাসদেব রচনা করেছিলেন কিনা তাও নিঃসংশয়ে বলা যাবে না। গীতা ও মহাভারত দুটোই ব্যাসের নামে চলে, সুতরাং মনে করা যেতে পারে খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতকে এগুলো রচিত হয়। বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্র থেকেই বেদান্ত দর্শনের উৎপত্তি। এটা সম্ভবত খ্রীস্টীয় দ্বিতীয় শতকে রচিত হয়। আর্যগণ কবে থেকে তাঁদের আদিম ইষ্টদেবতাগুলোকে পরিত্যাগ করে এদেশের ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব প্রভৃতি দেবতার আরাধনা শুরু করেন ইতিহাস তা বলতে পারে না। কবে থেকে পূর্ব-মীমাংসা ও তৎসংপৃক্ত স্মৃতিতে অর্বাচীন দেবতাগণের স্থান হল তাও অজ্ঞাত।
সুতরাং আমাদের সিদ্ধান্ত দাঁড়াচ্ছে এই : কর্মকাণ্ড-সর্বস্ব ঋগ্বেদ নিয়ে যখন আর্যগণ ভারতে আসেন তখনো তাদের ধর্ম পরিণত রূপ গ্রহণ করেনি। প্রকৃতি-প্রতীক দেবতাগণের তুষ্টিবিধান করে ঐহিক অভিষ্ট সিদ্ধি করাই তাদের ধর্মাচরণের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। আবার তা-ও ভক্তি ও জ্ঞানসাপেক্ষ নয়, কর্মসর্বস্ব। অপৌরুষেয় অর্থাৎ ঈশ্বর বা অন্য কোনো ব্যক্তি বেদ রচনা করেন নাই। বেদ অনাদিকাল হইতে আকাশে নিত্য হইয়া রহিয়াছে। বিভিন্ন ঋষিদের মনে আবির্ভূত হইয়াছে মাত্র।–মীমাংসকেরা জগৎকে সত্য বলিয়া মানেন এবং তাহারা কোনো ঈশ্বর মানেন না এবং জগৎ যে কোনো সময়ে সৃষ্ট হইয়াছিল এবং কোনো সময়ে যে ইহা ধ্বংস হইবে তাহাও তাহারা জানেন না। কাজেই ঈশ্বর সম্বন্ধে কোনো আলোচনা মীমাংসার বিষয় নহে। যাগযজ্ঞে নানা দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু মীমাংসকেরা সেই সমস্ত দেবতার স্বতন্ত্র সত্তা মানেন না। উচ্চারিত মন্ত্রের মধ্যে তাঁহাদের সত্তা; যথাযথভাবে মন্ত্র উচ্চারিত হইলে এবং যথাযথভাবে যজ্ঞীয় অনুষ্ঠান সম্পাদিত হইলে সেই অনুষ্ঠানের ফলে যজ্ঞফল–যথা স্বর্গলাভ, পুত্রলাভ ইত্যাদি লাভ করা যায়। কোনো দেবতার অনুগ্রহে ও বিদ্বেষে কোনো সুফল বা কুফল হয় না। কাজেই স্বতন্ত্র দেবতা মানিবার কোনো প্রয়োজন নাই। (ভারতীয় দর্শনের ভূমিকা–ড. সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত)
