বাঙলা দেশে বৌদ্ধধর্মের বিকৃতি যে প্রাচীন বিশ্বাস-সংস্কারগ্রস্ত অশিক্ষিত অনার্য মানসের প্রভাববশত ঘটেছে, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। শিব ও নারীদেবতাগুলো একান্তভাবে অনার্যদের দ্বারা পরিকল্পিত। শিবের সম্ভ, আদিনাথ, মহাদেব প্রভৃতি গুণ-নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে–তিনি অনার্য দেবতা। পুরাণ বর্ণিত দক্ষযজ্ঞ কাহিনীটি আর্যগণ কর্তৃক অনার্য দেবতা শিবের শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার প্রচেষ্টার আভাস দিচ্ছে। বাঙলার বৌদ্ধধর্মে শিবের স্থান হয়েছিল। ধর্মপালের প্রপৌত্র নারায়ণ পাল শিবভক্ত ছিলেন। শিব সম্বন্ধে অনেক গল্প আছে। এই শিব হচ্ছেন আদিনাথ, তারও আগে পরমাপ্রকৃতি আদ্যা। এর থেকেই সৃষ্টি পত্তন। এ শিব ও তাঁর পত্নী শিবানীকে (তৃতীয় জন্মে আদ্যা শক্তিই শিবপত্নী) কেন্দ্র করেই বিকৃত বৌদ্ধধর্মে যোগশাস্ত্র, দেহত্ত্ব (কায়াসাধন) সহজ সাধন, গুরুবাদ প্রভৃতির উদ্ভব হয়। এসব যোগতান্ত্রিক বৌদ্ধমতকে নাথপন্থ ও সহজিয়ামার্গ বলা হয়। এর অপর একটি শাখা ধর্মপূজা। এ সবই বৌদ্ধ-হিন্দু প্রভাবিত অনার্য ধর্ম। তন্ত্রমতও শিবেপ্রাক্ত। ভক্তিবাদটা আসলে অনার্য-মানস প্রসূত। গোটা ভারতবর্ষে ভক্তিধর্মের উন্মেষ ও বিকাশ অনার্যদের মধ্যেই হয়েছিল। এর উদ্ভবক্ষেত্র দাক্ষিণাত্য-অনার্য অধ্যুষিত উত্তরভারতের নিম্নশ্রেণীর (অনার্যদের) মধ্যে ভক্তিভাব প্রথম বিকশিত হয় এবং বাঙলাদেশেতো বটেই। ইতিহাস-পূর্ব যুগেও নারদ, প্রলোদ, শুক প্রভৃতি যারা ভক্তিবাদী ছিলেন, তাঁরা হয় অনার্য অথবা অনার্য রক্ত সম্পর্কিত ছিলেন। মাংসাশী আর্যগণের নিরামিষাশী হওয়াও অনার্য আচারের ব্যাপক প্রভাবের ফল।
এবার বাঙলার কথায় আসা যাক। বাঙলা দেশে ভক্তিধর্মের উদ্ভব সম্বন্ধে ডক্টর সুকুমার সেন বলেন, মহাযানের উপাস্য নরদেবতা অবলোকিতেশ্বর বাংলা দেশে লোকনাথ নাম নিয়ে বিষ্ণুর রূপান্তরে পরিণত হয়েছিলেন। এবং উত্তরাপথে বাসুদেব কৃষ্ণকে অবলম্বন করে যেমন ভক্তিপরায়ণ ভাগবত মত উদ্ভূত হয়েছিল, বাংলা দেশে তেমনি লোকনাথকে আশ্রয় করে ভক্তিধর্মের অঙ্কুর উদ্গত হয়েছিল। বাংলা দেশে রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনী বহুকাল থেকে প্রচলিত থাকলেও এই কাহিনীকে অবলম্বন করে অত সহজে ভক্তিধর্মের বিকাশ হয়নি, যত হয়েছিল অবলোকিতেশ্বর লোকনাথকে আশ্রয় করে।–বৌদ্ধ মতের ভক্তিভাবের সঙ্গে রাধাকৃষ্ণের কথাশিত বৈষ্ণব ভক্তিভাবের একটু তফাৎ আছে। বৈষ্ণব মতে ভক্তি জ্ঞানশূন্য এবং লীলাস্মরণ সাধনার একটা প্রধান অঙ্গ, কিন্তু বৌদ্ধমতে ভক্তি জ্ঞানেরই অঙ্গ। এখানে নাথ ও সহজপন্থ স্মরণীয়। সদগুরু থেকে জ্ঞান (মহাজ্ঞান) না পেলে সাধনায় সিদ্ধি নেই। বৌদ্ধভক্তিবাদ চৈতন্য ও তার আগের যুগে জয়দেব মিশ, চণ্ডীদাস, মাধবেন্দ্র পুরি প্রভৃতিকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে। (প্রত্যক্ষ প্রভাব এসেছিল সুফী মত থেকে এবং উত্তর ও দক্ষিণ ভারত থেকে)। তেরো শতকের বৌদ্ধ রামচন্দ্র কবিভারতীর ভক্তিশতক ও বৃত্রমালার প্রভাবও হয়তো চৈতন্যদেবের উপর পড়েছিল।
সুতরাং বাঙলার বৈষ্ণব, সহজিয়া, বাউল, মুর্শিদা, নাথপন্থ ও বৌদ্ধ সহজিয়া মত প্রভৃতি অনার্য মনোভঙ্গিরই প্রকাশ। ডক্টর সুকুমার সেন (প্রাচীন বাংলা ও বাঙালি) বলেন : বাংলা দেশে শাস্ত্রীয় বৈষ্ণব ধর্মের মধ্যে যেমন পূর্বেকার ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ ভক্তিবাদের যুক্তবেণী প্রবাহিত হয়ে এসেছে, তান্ত্রিক বৈষ্ণব অর্থাৎ বাউল সহজিয়া ইত্যাদি মতের মধ্যে তেমনি পূর্ব যুগের শৈব ও বৌদ্ধ তান্ত্রিক মতবাদের পরিণতি দেখা যায়। অষ্টম শতাব্দী কিংবা তারও পরে থেকে বাঙলা দেশে অনুন্নত শ্রেণীর মধ্যে তান্ত্রিক ভাবের দুটি ধর্মমত চলিত ছিল–শৈব-নাথ মত এবং বৌদ্ধ সহজিয়া মত (নাথ পন্থ ও চর্যাপদের সহজিয়া)। এই দুই মতের সাধনায় ও দর্শনে বিশেষ পার্থক্য ছিল না। নাথ সন্ন্যাসীরা নিজেদের যোগী বা কাঁপালিক বলত। এরা কানে নরাস্থি কুণ্ডল, কণ্ঠে নরাস্থি মালা, পায়ে নূপুর ও হাতে নরকপাল ধারণ করত এবং গায়ে ছাই মাখত। এদের আহার বিহার ছিল কদর্য, তাই গ্রামের বাইরে ছিল এদের কুঁড়েঘর। যোগীদের নামের শেষে শব্দ হত নাথ। বর্তমান সময়ে যুগী জাতির (তাঁতি) মধ্যে নাথ পদবি ও পূর্বেকার আচার-অনুষ্ঠান কিছু কিছু চলিত আছে। শৈব ও বৌদ্ধ সহজ সাধকেরা দেহতত্ত্বের সাধনা করত এবং আবশ্যক হলে যোগিনী বা অবধূতী অর্থাৎ সাধন-সঙ্গিনী গ্রহণ করত। এদের সাধনার সঙ্কেত নিহিত আছে চর্যাপদে। চর্যাপদগুলো বাঙলা পদাবলীর আদিরূপ। ধর্মপূজাকেও আমরা হিন্দু-বৌদ্ধ প্রভাবিত অনার্য ধর্ম বলেছি। সমাজের নিম্নস্তরে তখন অনার্য প্রথামতো স্থানীয় দেবদেবী প্রভৃতি উপ-দেবতার পূজা বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল। জাঙ্গুল, বাসুকী বজ্রতারা চণ্ডিকা মনসা ক্ষেত্রপাল শিব ষষ্ঠী যক্ষ (মদ্য-মাংস দিয়া কেহ যক্ষ পূজা করে–চৈ, ভা.) শীতলা ওলা ধর্মঠাকুর প্রভৃতি সে-কালীন দেবতা। অধিকাংশ দেবতার উদ্ভব ও প্রভাবক্ষেত্র রাঢ় অঞ্চলেই ছিল বলে মনে হয়। চণ্ডীমঙ্গলে তাই দেখতে পাই—-ব্যাধ গোহিংসক জাতিতে চোয়ার। কেহ না পরশ করে লোকে বলে রাঢ়। এ ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণহিন্দুর কথা। সদুক্তি কর্ণামৃতের একটি শ্লোকে এইরকম গ্রাম্যপূজার বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে :
