ধর্মের মূল লক্ষ্য সমাজ-প্রেক্ষিতে দায়িত্ব-চেতনা ও কর্তব্যবুদ্ধি জাগানো। দায়িত্ব-চেতনা ও কর্তববুদ্ধি জোর করে জাগানো যায় না। তার সাথে ব্যক্তি-মনের সায় থাকা চাই। মনের এই সম্মতি আসে সুরুচি ও আত্মসম্মানবোধ থেকে। অতএব আত্মমর্যাদাবোধই দায়িত্বজ্ঞানের ও কর্তব্য চেতনার উৎস। মর্যাদা সচেতন মানুষই কেবল দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যত্ন করে। আত্মসম্মানজ্ঞান আবার পরিবেশ ও শিক্ষার দান। শিক্ষার গুরুত্ব যে অধিক তার প্রমাণ দুষ্ট শিক্ষিত লোকের অপকর্মের সাধারণত মাত্রা ও সীমা আছে, দুষ্ট অশিক্ষিত লোকের নেই। তাছাড়া মর্যাদাকামী লোক জীবনে ও সমাজে অধিকার ভেদ মেনে চলে।
বিশেষ করে দেখা গেছে অধার্মিক আস্তিক মানুষও করে না হেন অপকর্ম নেই। কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস কাউকে সৎ ও উন্নত করে না, যদি না সে দায়িত্ববোধ, কর্তব্যবুদ্ধি ও মর্যাদাজ্ঞানসম্পন্ন হয়।
জানামি ধর্ম ন-চ প্রবৃত্তি। জানামি অধর্ম ন-চ নিবৃত্তি।–এই পুরোনো আপ্তবাক্য অপকর্মাসক্ত, লিলু আস্তিক মানুষেরই খেদোক্তি।
গত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় সভ্য ও আস্তিক যিশুর প্রেমবাদী খ্রীস্টান জার্মানেরা প্রায় এক লাখ ইহুদি হত্যা করেছে, আমেরিকানরা মেরেছে অসংখ্য জাপানি। অতগুলো পিঁপড়ে হত্যা করতেও বিবেকবান নাস্তিক মানুষের প্রাণে লাগে। খ্রীস্টান ও মুসলমান নাইজেরিয়া আজ ইবো গোত্রীয় আশি লক্ষ মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার বর্বর উল্লাসে মত্ত। দুনিয়ার ইতিহাসে বড় ছোট এমনি হাজার হাজার অমানুষিক দানবীয় নিষ্ঠুরতার ও অপকর্মের সাক্ষ্য রয়েছে। আজো এমনি বর্বরতার অবধি নেই। সবটাই প্রায় আস্তিক ও উন্নত ধর্মাবলম্বী মানুষের একক ও যৌথ স্বার্থে কৃত। গোষ্ঠী, সম্প্রদায় ও জাতি-চেতনা ছাড়াও ধর্মচেতনাও বহু বর্বরতার জন্যে দায়ী। অবশ্য রাজনৈতিক মতও এমনি গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়-চেতনা জাগায় আর বর্বরতায় উৎসাহিত করে। ধর্মমতবাদ কিংবা রাজনৈতিক মতবাদ যে-কোনো মতবাদ পরিণামে অসহিষ্ণুতা জাগায় মতবাদীর মনে। হাঙ্গেরী (১৯৫৬) ও চেকোশ্লোভাকিয়ায় (১৯৬৮) রুশ বর্বরতা, চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অমানুষিকতা, ভিয়েৎনামে আমেরিকার দানবিক দৌরাত্ম্য প্রভৃতি এ সূত্রে উল্লেখ্য।
অতএব ধর্মমত অথবা তার দার্শনিক ও রাজনৈতিক মতবাদ কোনোটাই মানুষের কল্যাণ আনেনি। কোনোটাই সংহত ও সংযত করতে পারেনি প্রবলের দৌরাত্ম্য, পারেনি দুর্বলকে প্রবলের পীড়ন থেকে রক্ষা করতে। ব্যষ্টির হৃদয়ে বিবেকের প্রতিষ্ঠা না হলে নীতিকথা, ধর্মকথা কিংবা তত্ত্বকথা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
কাজেই সমাজে-সংসারে পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যে-শান্তি ও স্বস্তি, যে-সুযোগ ও সুবিধা মেলে, তার জন্যে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রিক বিধিবিধানই যথেষ্ট।
অতএব আজকের দিনে মানুষের ধর্মগ্রন্থ হবে শাসনতন্ত্রের পুস্তক, হাদিস হবে দেশের আইন-কানুন আর লক্ষ্য হবে দায়িত্ব-কর্তব্য ও অধিকার-বুদ্ধিসম্পন্ন সুনাগরিকতা। এতেই মানুষের পার্থিব জীবনের মনুষ্য-রচিত সমস্যা মিটবে। অপার্থিব সুখলিলুরা বৈরাগ্যে-সন্ন্যাসে অভীষ্ট খুঁজুক- দীন-দুনিয়া জড়িয়ে ব্যবহারিক জীবনে ঝামেলা বাড়ানোর দুর্বুদ্ধি না-রাখাই শ্রেয়।
মনীষীরা যাই বলুন ধর্ম কিন্তু থাকবে। কেননা মানুষের অসহায়তায় ও দুর্বলতায় তার জন্ম ও স্থিতি। এবং ধর্মবিশ্বাস দুর্বল মানুষের দুর্যোগ-দুর্দিনে বল-ভরসার আকর– অভয় ও নিশ্চিত আশ্রয়। তাই ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় সংস্কার অধিকাংশ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে নিয়ামকরূপে পাবে চিরায়ু এবং হবে চিরঞ্জীব। যদিও সামাজিক শক্তি হিসেবে ধর্ম রাজতন্ত্রের মতোই বিলীয়মান।
তত্ত্ব-সাহিত্যের গোড়ার কথা
শোনা যায় আর্যরা ঋগ্বেদ সঙ্গে নিয়ে ভারতে এসেছিল। কিন্তু ভারতে প্রবেশ করে আর্যরা স্বধর্মে স্থির থাকতে পারেনি। দৈশিক ও কালিক প্রভাবে, ও অনার্য সংশ্রবে আর্যধর্ম বিবর্তিত ও রূপান্তরিত হয়েছে। অগ্নি, বরুণ, ইন্দ্রাদি দেবতার স্থানে শিব, বিষ্ণু প্রভৃতি দেবতার পূজা চালু হতে লাগল। এরূপে আর্যধর্মে প্রচুর অনার্য সংস্কার এবং বহু অনার্য দেবতা প্রবেশ করে তাকে এতই বিকৃত করেছেন যে, বৈদিক ধর্ম বলতে যা বুঝায়, তার আর বিশেষ কিছু অবশিষ্ট রইল না। বৈদিক ধর্ম বলে যে কথাটি আছে তা নাম সার, কথার কথা মাত্র। মূল আর্যধর্মের অনার্য উপাদানে পুষ্টি ও রূপান্তরের ইতিহাস অতি জটিল ও বহুবিস্তৃত। সে বিচার করতে গেলে লোেম তুলতে কম্বল উজাড় হবার কথা। ধর্ম-দর্শনের বহুধা বিস্তৃতি, সংস্কারের কলেবর বৃদ্ধি ও তেত্রিশ কোটি দেবতার উদ্ভবে দিশাহারা জনগণের পক্ষে ধর্মের পূর্ণরূপ হৃদয়ঙ্গম করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠল। তাই উপায়ান্তর না দেখে তারা যে কোনো একক দেবতার পূজা-প্রথা প্রচলন করতে বাধ্য হল। এভাবে শৈব, বৈষ্ণব প্রভৃতি সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। এই ধর্মশাস্ত্রের বিকাশে ও প্রসারে মুসলমান-পূর্ব যুগে কোনো বিদেশী প্রভাব ছিল না। অনার্য মানস-সংস্কার আর্য-মানসের উপর জয়ী হল। অনার্য-সভ্যতা যে আর্য-সভ্যতার চেয়ে উন্নত ছিল তার প্রমাণ মেলে আর্যদের এই সাংস্কৃতিক পরাজয়ে। তবু আর্যগণ বিজেতা এবং শাসক, তাই তারা গায়ের জোরেই সমাজে প্রধান রয়ে গেল। এ অনার্য অবদান আর্য- সংস্কৃতি নামে প্রচারিত ও প্রচলিত হল। শাসক ও অভিজাতশ্রেণী চিরকাল বিষয়-বুদ্ধি সম্পন্ন, তারা উচ্ছ্বাস বা হুজুগের বশে কিছু একটা করে বসে না। গরজ ও সুযোগ বুঝে তারা এমনিভাবে চলে যে, অন্যের কৃতির দ্বারা নিজেরাই লাভবান হয়, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বও বজায় থাকে। কিন্তু মানুষের অন্ধ ধর্মানুগত্যের সুযোগে আর্যগণ যখন শাসন-শোষণ ও ভয়ঙ্কর উৎপীড়ন শুরু করল, তখন বর্ধমান মহাবীর ও গৌতম বুদ্ধের নেতৃত্বে অনার্য অধ্যুষিত পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রবল বিদ্রোহ দেখা দেয়। বেদ-ব্রাহ্মণদ্বেষী জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন একান্তভাবে অনার্য সংস্কার-প্রসূত। বুদ্ধের নির্বাণবাদ ও অহিংসবাদ বলিপ্রিয় ও ত্রিলোকে বিশ্বাসী আর্য-মানসের সম্পূর্ণ বিপরীত। শঙ্করের মায়াবাদ ও অনার্য–মানস সম্ভুত। কৃষ্ণ মিত্রের (১০ শতক) প্রবোধ চন্দ্রোদয়ের দ্বিতীয় অঙ্কে রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ অহঙ্কার কাশীতে বেদান্ত চর্চার বাহুল্য দেখে অবজ্ঞা করে বলেছে : প্রত্যক্ষাদিপ্রমাসিদ্ধাথিরুদ্ধর্থববেধিনঃ। বেদান্তাঃ যদি শাস্ত্রনি বৌদ্ধে কিমপরাধ্যতে।
