৪. চতুর্থ মুসলিম পর্ব শুন দিয়া মন
৫. কহিব পঞ্চম পর্বে যুদ্ধ অবশেষে পাছে
৬. ষষ্টমে হোসেন পর্ব কহিবাম পাছে
৭. সপ্তমে স্ত্রীপর্ব কহিবাম পুনি
৮. অষ্টমেত দূতপর্ব শুন দিয়া মন
৯. নবমে ওলিদ পর্ব শুন গুণিগণ।
১০. দশমে এজিম পর্ব কহিবাম এবে
১১. একাদশ পর্ব তার পশ্চাতে কহিব
প্রলয় হইতে যথ অনর্থ হইব।
যেন মতে দজ্জাল পাপী ভুলাইব নর।
যেন মতে আসিয়া পুনি ঈসা পয়গাম্বর।
মোহাম্মদ হানিফা ইমাম সঙ্গে করি
যেমতে পালিবা নোক দজ্জাল সংহারি।
এআজুজ মাজুজ সেই দুই বাহিনী।
যেনমতে হেসাব দিবেক সর্বজনি।
একাদশ পর্বটি কেয়ামতনামা ও দজ্জালনামা নামে পৃথক দুখানি পুস্তিকা হিসেবেও চালু ছিল। এজিদ পর্বও হানিফার লড়াই নামে জনপ্রিয় হয়। এভাবে মুহম্মদ খান একটিমাত্র গ্রন্থে কেয়ামত অবধি বর্ণন করে পীরের অভিলাষ পূর্ণ করেন। মক্তুল হোসেন কাব্যের রচনাকাল মিলেছে :
মুসলমানি তারিখের দশ শত ভেল
শতের অর্ধেক পাছে ঋতু বহি গেল।
হিন্দুয়ানি তারিখের শুন কহি কত
বাণ বাহু শত অব্দ আর বাণ শত।
বিংশ তিন পূর্ণ করি চাহ দিয়া দধি।
পঞ্চালিকা পূর্ণ হৈল সে অব্দ
মাধবী মাসের সপ্ত দিবস গইল
সেই রাত্রি পঞ্চলিকা সমাপ্ত হইল।
[এত হিজরী ১০০০+৫০+৬=১৬৪৫-৪৬ খ্রীস্টাব্দ; এবং শক ৫ x ২ = ১০০০ +৫০০ + ২০ X ৩+৭= ১৫৬৭ + ৭৮ = ১৬৪৬ খ্রীস্টাব্দ মেলে।
.
০৪.
সব দেশের কাহিনী-কাব্যই ঐতিহ্য-নির্ভর। আমাদের বাঙালি মুসলিম রচিত সাহিত্যের উপজীব্যও ছিল মুসলিম ইতিকথা। তার মধ্যে ইসলামের উন্মেষ যুগের বীরত্ব-মহত্ত্বজ্ঞাপক গৌরবময় কাহিনীই বিশেষ করে তাঁদের কাব্য-সৌধ নির্মাণের উপকরণ যোগায়।
আরব দেশ, রূপকথার ভাষায়, সাত সাগরের ওপারে। সেকালে যানবাহনের সুবিধে ছিল না। আজকের মতো পৃথিবী তখনো মানুষের পদচারণের ক্ষুদ্র ক্ষেত্রে পরিণত হয়নি। তাই সত্যিকথাও কল্পনাপ্রিয় অজ্ঞ মানুষের মুখে মুখে রূপকথার মতো অবাস্তব, অস্বাভাবিক ও রোমান্টিক হয়ে উঠত। তাছাড়া মানুষের মনোজগতে–সাহিত্যের আনন্দ-মেলায়, আদর্শায়িত জীবন স্বপ্নে বাস্তবের মূল্য চিরকালই নগণ্য। যুক্তি-বুদ্ধির প্রভাব সেখানে সামান্যই। তাই ইসলামের উদ্ভবকালের জাতীয় বীরদের নানা যুদ্ধকাহিনী মনোময় কল্পনার অবাধ প্রশ্রয়ে রূপে-রসে, সত্য-মিথ্যায়, সম্ভব-অসম্ভবে, বাস্তবে-কল্পনায় আকর্ষণীয় অবয়ব পেয়েছে। মুহম্মদ খানের মঞ্জুল হোসেনও এমনি একটি করুণ মধুর, জ্বালা-বেদনা, হর্ষ-বিষাদ মিশ্রিত সুন্দর রচনা। এ কাব্য মৌলিক রচনা নয়, ফারসি কাব্যের অনুসৃতিমূলক। আবার এর আংশিক অনুকৃতি মেলে মীর মুশাররফ হোসেনের গ্রন্থে। জঙ্গনামা-র চরম ও সুন্দরতম রূপায়ণ হচ্ছে মীর মুশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধু। কিন্তু মধ্যযুগীয় কাব্য হিসেবে মঞ্জুল হোসেন এ জাতীয় কাব্যের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। মুহম্মদ খান নিজেই বলেছেন :
মুহম্মদ খানে কহে শুনিতে মরম দহে।
পাষাণ হইয়া যায় জল।
এই দাবীতে অত্যুক্তি নেই। তাঁর কাব্য সত্যি কারুণ্যের নিঝর। তাই বলে বীররস-বিহীন নয়। যে যুগের, যে সমাজের, যে মানুষের কথা এতে বর্ণিত তা আজ ধূসর কল্পনার বিষয়। কিন্তু আজো সেই ক্রুরতা মানুষের ঘৃণা উদ্রেক করে; হোসেনের আত্মসম্মান বোধ, সত্যনিষ্ঠা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, নির্ভীকতা, আত্মত্যাগ আজো মানুষকে তার প্রতি শ্রদ্ধান্বিত করে; আজো তার বীরত্ব, মহত্ত্ব ও স্বাধীনতা-প্রীতি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
শির দেগা সের দেগা, নেহি দেগা আমামা –এই ছিল হোসেনের বক্তব্য। অন্যায় ও জুলুমের কাছে আত্মসমর্পণ করে অনুগৃহীতের সুখ তার কাম্য ছিলো না। জানের চেয়ে মান বড়, তার চেয়েও বড় স্বাধীনতা। সে-স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে এজিদের কৃপাজীবীর নিশ্চিন্ত জীবন তাঁর অভিপ্রেত ছিল না। তাই মৃত্যুর মাধ্যমে তিনি তাঁর মর্যাদা ও আদর্শ রক্ষা করলেন। সংগ্রামের ভেতরেই জীবনের সার্থকতা খুঁজলেন, মুযাহীদের জীবন এবং শহীদের মৃত্যুই তাঁর লক্ষ্য হল। শহীদ হয়েও যিনি মনুষ্যস্মৃতিতে অমর গাজীর গৌরব নিয়ে বেঁচে রইলেন। সেই হোসেনের সংগ্রামের কথা, শাহাদাঁতের কথা আজো এবং চিরকাল স্মরণীয় থাকবে, তাতে আর আশ্চর্য কী! বিশেষ করে, রসুলের দৌহিত্রের হৃদয়বিদারক কাহিনী সাড়ে তেরো শ বছর ধরে মুসলমানের চক্ষু অশ্রুসিক্ত রাখছে, কেয়ামত তক্ এমনি অশু ঝরবে তাদের দু-চোখের কোণ বেয়ে, যখন মুহম্মদ খানের লেখা-চিত্র তারা মানসচক্ষে প্রত্যক্ষ করবে :
স্বর্গ মর্ত্য পাতালে উঠিল হাহাকার
কান্দস্ত ফিরিস্তা সব গগন মাঝার।
বিলাপন্ত যথেক গন্ধর্ব বিদ্যাধর।
আর্শ কুর্সি লওহ্ আদি কাঁপে থরথর।
অষ্ট স্বর্গবাসী যথ করন্ত
ধিক ধিক কুফি সৈন্য অধার্মিক পাপ।
এ সপ্ত আকাশ হৈল লোহিত বরণ
কম্পমান সূর্য দেখি হোসেন নিধন।
ক্ষীণ হৈল নিশাপতি আমীরের শোকে
মঙ্গল অরুণ বর্ণ রক্ত মাখি মুখে।
বুধে বুদ্ধি হারাইল গুরু এড়ে জ্ঞান
শনি কালা বস্ত্র পিন্দে পাই অপমান।
জোহরা নক্ষত্র কান্দে ত্যাজি নাট গীত
ফাতেমা জোহরা কান্দে শোকে বিষাদিত।
সমুদ্রে উঠিল ঢেউ পরশি আকাশ
পর্বত ছাড়ে সঘন নিশ্বাস।
কম্পমান পৃথিবী যতেক চরাচর
হইল শোণিত বর্ণ দিগদিগন্তর।
জল ত্যাজে মীনগণে পক্ষী ত্যাজে বাসা
সব কান্দে হাসএ ইব্লিস অনা-আশা।
