.
০৫.
মুহম্মদ খান সত্যকলি বিবাদ সম্বাদ নামে নীতিশিক্ষামূলক একখানি রূপককাব্যও রচনা করেছিলেন। এটিই তার প্রথম গ্রন্থ। এ কাব্যে সত্য ও কলির তথা ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, পাপ-পুণ্য আর সুমতি-কুমতির দ্বন্দ্ব ও সংঘাত একটি সরস উপাখ্যানের মাধ্যমে সার্থকভাবে চিত্রিত। এ কাব্যের বিষয়সূচি কবির জবানিতে এরূপ :
ক. প্রথমে সত্যক সত্যবতী দুই মিলি
যেন মতে কলির দুঃশীলা সঙ্গে কেলি।
সত্য সঙ্গে যুঝিতে কলির আগমন
মিত্র কণ্ঠ দূত গেলা নিষেধিতে রণ।
না করিল সন্ধিপত্র আইল পুরোহিত
নারদের স্থলে যুদ্ধ হৈল অতুলিত।
খ. দ্বিতীয় অধ্যায়ে দুই সৈন্যের সংগ্রাম
সত্যকলি বিবাদ সম্বাদ অনুপাম।
কপটে জিনিল সত্যে কলি ধনুর্ধর
মুহুশ্চিত সত্য লই পুনি গেল ঘর।
গ. তৃতীয় অধ্যায়ে তবে কহিলু কথন
কাঞ্চলি মুখেত শুনি সত্য অচেতন।
যেন মতে বিলাপিলা সত্যবতী নারী।
সুবুদ্ধি আনিলা গিয়া যোগী ধন্বন্তরী।
জ্ঞান-বড়ি দিয়া যোগী সত্যে চেতাইল
যোগী-সত্যবতী যেন সম্বাদ ঘুচিল।
ঘ. চতুর্থ অধ্যায়ে পুনি সত্য পাইল জয়
পুনি মুহুশ্চিত হৈল কলি পাপাশয়।
মৃতবৎ কলি লৈয়া দুঃশীলা কান্দিল
ভোগী-ধন্বন্তরী আসি কলি চেতাইল।
ভোগী সঙ্গে দুঃশীলার আছিল সম্বাদ
ঙ. পঞ্চম অধ্যায়ে পুনি যুদ্ধের বিবাদ
তৃতীয় [ ত্রেতা] দ্বাপরে যেন নিবারিল রণ
লাজ পাই ঘরে গেল কলীন্দ্র দুর্জন।
তত্ত্বকথা যেন গুরুভার হয়ে না পড়ে, সেদিকে কবির সতর্ক দৃষ্টি ছিল। তাই কবি চন্দ্ৰদৰ্প ইন্দুমতী, সূর্যবীর্য-চন্দ্ররেখা প্রভৃতি প্রণয়োপাখ্যানও প্রাসঙ্গিক করে সুকৌশলে এর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। সত্য ও পুণ্যের জয় এবং মিথ্যা ও পাপের পরিণামে ক্ষয় প্রদর্শনই কবির লক্ষ্য হলেও কবি শিল্পীসুলভ সংযম রক্ষা করেছেন এবং বাস্তবজীবনে উপলব্ধ সত্যে তার তাচ্ছিল্য ছিল না। বাস্তবজীবনে পাপ ও মিথ্যা যে সত্যের ও পুণ্যের উপরে জয়ী হয় (তা যত সাময়িকই হোক না কেন) এবং সত্য ও পুণ্যের পথ যে বন্ধুর, দুঃখ-দুষ্ট এবং বর্থতাকীর্ণ তাও কবি নিপুণতার সঙ্গেই চিত্রিত করেছেন।
কবির প্রতীকী চরিত্রগুলোও জড়প্রতীক নয়, একান্তভাবে রক্তমাংসের মানুষ। আমাদেরই ঘরের ও সমাজের লোক। চিনতে একটুও কষ্ট হয় না, বরং মনে হয় নিত্য-দেখা অতি পরিচিত জন। কোথাও রহস্যের কিংবা অজানার আড়াল নেই।
পাত্র-পাত্রীর নামগুলো যেমনি গুণপ্রতীক, তেমনি সুন্দর : সত্য, কলি, দুঃশীলা, পাপসেন, ভীতসেন, দুঃশল, মিথ্যাসেতু, কৃপণ, ভোগী, নারদ, মিত্ৰকণ্ঠ, সত্যকেতু, সত্যবতী, বীর্যশালী, ধর্মকেতু, সুখ, সুদাতা, যোগী প্রভৃতি।
সত্যের ধ্বজা সূর্য, কলির পতাকা চন্দ্র–এ দুটোও গভীরতর তাৎপর্যপূর্ণ। সূর্য অগ্নিময়– সত্যে দাহ আছে; চন্দ্র স্নিগ্ধ ও সুন্দর–পাপ আপাতমধুর ও লোভনীয়।
যোগী-সত্যবতী ও ভোগী-দুঃশীলা সম্বাদে ব্যবহারবিধি, নিয়ম-নীতি, পাপ-পুণ্য ও সংযম অসংযমের যে তত্ত্ব ব্যক্ত হয়েছে তা মানবজীবনের চিরন্তন সমস্যার ইতিকথা।
কবি প্রসঙ্গক্রমে তার সমকালীন লোকচরিত্রের যে আভাস দিয়েছেন, তাতেই বোঝা যায়। সতেরো শতকে বিশ শতকে তফাৎ নেই কিছুই। অধিকাংশ মানুষের অমানুষিকতা আজো তেমনি রয়েছে।
মুহম্মদ খান পীরের দৌহিত্র, সূফীপীরের মুরীদ ও নিজে পীর ছিলেন। আবার দুর্লভ কবিত্বও তাঁর ছিল, সর্বোপরি তিনি প্রশাসনিক বিভাগে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। অতএব তাঁকে আমরা সতেরো শতকের ধার্মিক ও ধর্মপ্রবক্তা, কবি ও সংস্কৃতিবিদ, রাজনীতিক ও অভিজাত নাগরিক হিসেবেই গ্রহণ করব। তিনি সতেরো শতকের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী মানুষের একজন। কাজেই তাঁর রচনা সে-শতকের সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মচিন্তার এবং নীতিবোধের প্রতীক ও প্রতিভূ।
[দশ শত বাণ শত বাণ দশ ধিক সনে তথা ১০০০ + ৫০০ + ৫ X ১০ + ৭ = ১৫৫৭ শকে-১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে এ গ্রন্থ রচিত।]
গবেষণা-সাহিত্য ও প্রবন্ধ-সাহিত্য
০১.
সাহিত্য ও শিল্প কিংবা ইতিহাস ও দর্শন সম্পর্ক এ-যুগে বিদ্বানদের ধারণা বদলে গেছে। আগেকার যুগে যে- কিছু সুন্দর করে আঁকলে-শিখলেই শিল্প বা সাহিত্যরূপে গৃহীত হত। তেমনি তথ্যের সমাবেশে হত ইতিহাস এবং তত্ত্বের উপস্থাপনায় হত দর্শন।
এখনকার যুগে ঘনিষ্ঠ জীবন-প্রতিবেশের নিরিখেই এগুলোর গুণাগুণ ও উপযোগ নির্ধারিত হয়। যেহেতু মানুষ তার সমকালীন স্বদেশে আনন্দ ও যন্ত্রণা এবং সম্পদ ও সমস্যা নিয়েই বাঁচে সেজন্যে তার সাহিত্যে ও শিল্পে কিংবা ইতিহাসে ও দর্শনে দেশ-কাল-সমাজ-প্রতিবেশপ্রসূত চেতনার স্বরূপ বিধৃত হবে–পাঠক-দর্শক এই প্রত্যাশাই রাখে। যদি সে প্রত্যাশা পূরণ না হয়, তাহলে রচিত শিল্প-সাহিত্য-ইতিহাস-দর্শন উপযোগ হারায়। কেননা উপযোগই সব সাধনার ও গুরুত্ব নিরূপণের মাপকাঠি।
গবেষণাও আজ আর তথ্যের উদঘাটনে ও সমাবেশে সমাপ্ত নয়। দেশগত কালিক জীবন প্রতিবেশের উন্মোচন ও বিশ্লেষণই গবেষকের লক্ষ্য। তাই ইতিহাসের ক্ষেত্রে কেবল বাহ্য ঘটনা কিংবা আচরণ ও তার ফলাফলই শুধু জ্ঞাতব্য নয়। স্থানিক ও কালিক পরিবেশ, নৈতিক চেতনা, আর্থিক অবস্থা, সাংস্কৃতিক মান, ধার্মিক প্রত্যয় ও সামাজিক ব্যবস্থা প্রভৃতির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সামষ্টিক প্রভাব জন- চৈতন্যে কীভাবে প্রতিফলিত এবং ভাব-চিন্তা-কর্মে কিরূপে অভিব্যক্ত তা দেখা-জানা-বোঝার জন্যেই ইতিহাস চর্চায় আজকের মানুষ আগ্রহী। দর্শনও আজ জীবন-নিরপেক্ষ তত্ত্বসর্বস্ব চিন্তার প্রসূন নয়–জগৎ প্রতিবেশে জীবন-চেতনার গভীরতর স্বরূপ যাচাইয়ের উপায় মাত্র।
