মুঘল আমলে বিশেষ করে জাহাগীরের আমল থেকে এদেশে ইরানি প্রভাব প্রবল হতে থাকে। ইরানের সাফাভী বংশীয় শাসনের অবসান ঘটলে বহু শিয়া মুর্শিদাবাদেও আশ্রয় পায়। তার ফলে এদেশে কারবালা মহরমের পার্বণিক বিকাশ ও প্রসার ত্বরান্বিত হয়। সুন্নীদের মানস-প্রশ্রয়ে তা শহরে শহরে সর্বজনীন জাতীয় পার্বণের রূপ নেয়। এদেশের এমনি আবহে লোকের কৌতূহল মিটানোর প্রয়োজনে অনেক জঙ্গনামা রচিত হয়েছে।
বাঙলায় মক্তুল হোসেন বা জঙ্গনামা কিংবা শহীদ-ই-কারাবালার আদি কবি দৌলত উজির বাহরাম খান (ষোলো শতক), দ্বিতীয় কবি মীর বা শেখ ফয়জুল্লাহ- র (ষোলো শতক) রচিত চৌতিশায় যয়নবের বিলাপ পাওয়া গেছে। তৃতীয় কবি আমাদের আলোচ্য মুহম্মদ খান। এর পরে যারা জঙ্গনামা রচনা করেছেন তাদের মধ্যে হায়াত মাহমুদ, জাফর, জিন্নত আলী, আলী মুহম্মদ, আবদুল ওহাব, হামিদুল্লাহ খান, ফকির গরীবউল্লাহ, ইয়াকুব (?), সাদ আলী, রাধাচরণ গোপ, মুহম্মদ মুনশী, জনাব আলি ও আবদুল হামিদের নাম উল্লেখ্য।
.
০২.
মুহম্মদ খানের মক্তুল হোসেন ঐতিহাসিক উপাদানের আধার হিসেবেও মূল্যবান গ্রন্থ। তিনি মঞ্জুল হোসেন কাব্যে তাঁর সমকাল অবধি চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসের আভাস দিয়েছেন। কবির মাতৃকুল ছিল পীর পরিবার, আর পিতৃকুল ছিল শাসক পরিবার। কবির পীর ছিলেন নবীবংশ-এর কবি পীর মীর সৈয়দ সুলতান। সৈয়দ সুলতান মোলো শতকের সাহিত্য, ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একজন দিকপাল। অতএব কবি মুহম্মদ খান ছিলেন সতেরো শতকের চট্টগ্রামের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মুখ্য ব্যক্তিদের অন্যতম। তাঁর মাতৃকুল ও পিতৃপুরুষের বংশ-তালিকা এরূপ :

কবির পূর্বপুরুষ রাস্তিখান গৌড়সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহর অধীনে চট্টগ্রামের শাসক ছিলেন। তারপর চট্টগ্রাম কখনো গৌড়শাসনে কখনো আরাকান অধিকারে থাকলেও এঁরা বংশপরম্পরায় শাসক পদে নিযুক্তি পেয়েছেন। মিনা খান সম্ভবত পরাগল খানের ছোটভাই ও ছুটি খানের পিতৃব্য। মুহম্মদ খান মিনা খানের বংশধর বলেই পরাগল খানের নামোল্লেখ করেননি। লক্ষণীয় যে, পিতা ও পিতৃব্য এবং মাতামহ ও মাতামহের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছাড়া কবি সর্বত্র একক বংশধরেরই পরিচয় দিয়েছেন।
মুহম্মদ খানের পিতৃব্য ইব্রাহিম খান ছিলেন আরাকান রাজ্যের চট্টগ্রামস্থ অধিকারের শাসক বা উজির। মুহম্মদ খানও সম্ভবত শখ ও মাতামুহুরী নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে নায়েব-উজির ছিলেন। আঠারো-উনিশ শতকের কবি মুহম্মদ চুহর কবিপ্রণামে মুহম্মদ খানকে পীর-কবি বলে উল্লেখ করেছেন :
আদ্য গুরু কল্পতরু ছৈদ সুলতান
কবি আলাওল পীর মোহাম্মদ খান।
.
০৩.
কবি সৈয়দ সুলতানের ইচ্ছে ছিল সৃষ্টিপত্তন থেকে শুরু করে কেয়ামত অবধি ইসলামী ধারার একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিকথা রচনা করবেন। সৃষ্টি-পত্তন থেকে ওফাত-ই-রসুল ত রচনা করে কোনো কারণে তিনি লেখনী ত্যাগ করেন। মঞ্জুল হোসেন-এ তাঁর আরব্ধ কর্মে সমাপ্তি দান করে, তার স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করেন তাঁর প্রিয় শিষ্য কবি মুহম্মদ খান।
পীরের পাণ্ডিত্য ও জ্ঞান-গভীরতা শিষ্যের ছিল না সত্য, কিন্তু কবিত্বে, সহৃদয়তায়, সংবেদনশীলতায়, ভাষার লালিত্য ও বর্ণনভঙ্গির নিপুণতায় শিষ্য পীরকে অতিক্রম করেছেন। এখন পীর-সাগরেদ সংবাদ মুহম্মদ খানের মুখেই শোনা যাক :
ইমাম হোসেন বংশে জন্ম গুণনিধি।
সর্বশাস্ত্রে বিশারদ নবরস দধি
শ্যাম নবজলধর সুন্দর শরীর
দানে কল্পতরু পৃথিবী সম স্থির।
অসীম মহিমা পীর শাহ্ সুলতান।…
উদরেত বৈসে তান জগতের গুণ
বিজয় করিলা শাস্ত্র পৃথিবী ত্রিকোণ।
হৃদয় মুকুর তান নাশে আন্ধিয়ার।
বহু যত্নে এহি রত্নে কৈলা করতার।
নবীবংশ রচিছিলা পুরুষ প্রধান
আদ্যের উৎপন্ন যত করিলা বাখান।
রসুলের ওফাত রচি আর না রচিলা
অবশেষে রচিবারে মোক আজ্ঞা দিলা।
তান আজ্ঞা শিরে ধরি মনে আকলি।
চারি সাবার কথা কৈলু পদাবলী।
দুই ভাই বিবরণ সমাপ্ত করিয়া
প্রলয়ের কথা সব দিলু প্রচারিয়া
অন্তে পুনি বিরচিলু প্রভু দরশন
এহা হন্তে, ধিক কথা নাহি কদাচন।
দুই পঞ্চালিকা যদি একত্র করএ
আদ্যের অন্তের কথা সন্ধিযুক্ত হএ।
মঞ্জুল হোসেন এগারো পর্বে সমাপ্ত। কবির ভাষায় এর বিষয়সূচি এই :
১. আদিপর্বে ফাতেমার বিবাহ কহিব
দুই ভাইর জন্ম তবে পাছে বিরচিব।
২. কহিব দ্বিতীয় পর্বে শুন দিয়া মন
চারি আসহাবের কথা শাস্ত্রের নিদান।
৩ কহিব তৃতীয় পর্বে হাসনের বাণী
যয়নবকে বিবাহ করিলা মনে গুণি।