গিরিয়ার যুদ্ধে ও পলাশীর যুদ্ধে আদর্শ, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও পরিণামগত কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। বাঙালির এতে জানবার, বুঝবার ও ভাববার কিছুই ছিল না। কেবল রাজ্য কাড়াকাড়ির চিরকালীন তামাশাই দেখবার ছিল এবং তারা রসিক-দৃষ্টি দিয়ে দেখেওছে। সে যুগে দেশ ছিল রাজার রাজ্য। রাজ্য রক্ষার গরজ, প্রজা শাসনের দায়িত্ব এবং রাজ্য হারানোর দুর্ভাগ্য সবই ছিল রাজার। প্রজার কাছে এসব ছিল মনিব ও মালিক পরিবর্তনের একটি সাময়িক দুর্ভাগ্য মাত্র। সে মালিক স্বদেশী কিংবা বিদেশী, স্বজাতি কিংবা বিজাতি –এ বিচার তারা কোনো দিনই করেনি। এ বিচারে কেউ কখনো অভ্যস্তও ছিল না। এমনকি আঠারো শতক থেকে উনিশ শতকের প্রথমার্ধ অবধি এ চেতনা–এ দৃষ্টি ভারতের রাজন্যবর্গের মধ্যে অনুপস্থিত দেখি। ষোলো শতক থেকেই। পর্তুগীজদের মাধ্যমে য়ুরোপীয় শক্তির প্রভাব ও অধিকার এদেশে দৃঢ়মূল ও বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। কিন্তু বিদেশী-বিজাতি বলে তাদের কেউ ঠেকানোর চেষ্টা করেনি। কেবল প্রতিষ্ঠাকামী প্রবল প্রতাপ উঠতি শক্তিরূপে সমীহ-ই করেছে। এবং স্বস্বার্থে এদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের বদলে সহযোগিতাই করেছে এদেশের রাজন্যবর্গ। কর্নাটে ফরাসির ও বাঙলায় ইংরেজের ভূমিকা, মুঘল বাদশাহ কর্তৃক ইংরেজকে বাঙলা-বিহারের দেওয়ানী দান, টিপুসুলতানকে সাহায্যদানে নিজাম মারাঠার অস্বীকৃতি, সিপাহী বিপ্লবকালে রাজন্যবর্গের ব্রিটিশ-প্রীতি প্রভৃতি এই প্রসঙ্গে স্মর্তব্য। অতএব স্বাদেশিক ও স্বাজাতিক চেতনা শাসকগোষ্ঠীর মধ্যেও ছিল না। তাদের ছিল-দেশ-জাত মানুষ নিরপেক্ষ রাজ্য-চেতনা। কাজেই দেশী-বিদেশী যে-কোনো রাজশক্তিকে তারা সুবিধা ও প্রয়োজনমতো কখনো মিত্ররূপে, কখনোবা প্রতিদ্বন্দ্বীরূপেই ভেবেছেন। অবশ্য এরই নাম রাজনীতি।
মুর্শিদকুলি থেকে সিরাজউদ্দৌলা অবধি সবাই দুর্বল প্রভুর স্বৈরাচারী সুবাদার মাত্র। আঠারো উনিশ শতকে কখনো কখনো কোনো কোনো রাজা-বাদশা, সামন্ত ও ধর্মনেতা স্বস্বার্থে স্বাধর্মিক জাতীয়তার বুলি আওড়িয়েছেন বটে, কিন্তু তাদের সে-প্রয়াস মুঘল-মারাঠা কিংবা ইংরেজ-সাম্রাজ্যে তেমন কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। নাদির শাহ কিংবা আহমদ শাহ আবদালীর ভারত অভিযানে মারাঠা শক্তি ঘা খেয়েছে বটে, কিন্তু মুঘল শক্তিই হয়েছে বিলুপ্ত, যার ফলে ইংরেজ-শক্তি হল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আবার শিখ-হিন্দু-মুসলমান প্রতিবেশীসুলভ ঈর্ষা-বিদ্বেষ বশে যতটা সাম্প্রদায়িক হতে পেরেছিল, ওহাবী আন্দোলন ততটা ইংরেজদ্রোহী হতে পারেনি।
অতএব আমাদের দেশের রাজনীতিতে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের পূর্বে স্বাদেশিক, স্বাজাতিক কিংবা স্বাধর্মিক জাতীয়তার কোনো ভূমিকা ছিল না। কাজেই ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে আলিবর্দী, কিংবা মীর জাফর আলী খাঁর ভূমিকা অভিন্ন। এবং সরফরাজ, সিরাজউদ্দৌলা কিংবা মীর কাসিমের দুর্ভাগ্যও নিত্যঘটিত ব্যক্তিগত ঘটনা। বস্তুত পলাশীর বিজয়ে নয়, দিল্লীর সম্রাট কর্তৃক ইংরেজকে দিওয়ান নিযুক্তির ফলেই বাঙলায় তথা ভারতে ইংরেজ-রাজত্ব প্রতিষ্ঠা পায়। কেননা ওটাই ছিল তাদের Locus standi, ওতেই দেশের রাজনীতিতে ওদের দৌরাত্ম্যের দাবী ও অধিকার স্বীকৃতি পেল।
আধুনিক স্বাদেশিক বোধ ও স্বাজাতিক চেতনা নিয়ে মুঘল সুবাদার অবাঙালি সিরাজউদ্দৌলাকে জাতীয় বীর ও বাঙলার স্বাধীনতার প্রতীকরূপে গ্রহণ করলে ইতিহাসের তথ্য ও মর্যাদা লঙ্ন করাই হবে। বস্তুত পলাশীর যুদ্ধের গ্লানি বা লজ্জা কোনোটাই বাঙালিকে স্পর্শ করার কথা নয়। যেমন মৌর্যযুগ থেকে সুন্দর শ্যামল স্বর্ণ-প্রসূ বাঙলাকে নিয়ে যত লড়াই হয়েছে বিদেশী প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে, তার কোনো জয়-পরাজয়ই বাঙালির গৌরব কিংবা গ্লানির বিষয় নয়।
বাঙালারি স্থায়ী কলঙ্কের কথা এই যে, ইদানীং পূর্বযুগে বাঙালি কৃচিৎ স্বদেশ স্বশাসনে রাখবার চেষ্টা করেছে। দেশের মানুষ দ্বারা শাসিত না হলে রাজনৈতিক অর্থে মানুষ কখনো স্বাধীন হয় না। এই তাৎপর্যে পাল কিংবা স্বাধীন সুলতানী আমলও (১৩৩৯-১৫৩৮ খ্র.) বাঙলা বা বাঙালির পক্ষে গৌরবের ও গর্বের নয়।
কবি মুহম্মদ খান ও তাঁর কাব্য
০১.
মুহম্মদ খান আমাদের সাহিত্যে একটি জনপ্রিয় নাম। তিনি প্রখ্যাত মঞ্জুল হোসেন তথা হোসেন বধ কাব্যের রচয়িতা।
কারবালা কাহিনী নিয়ে অনেক যুদ্ধকাব্য ও মর্সিয়া-সাহিত্য রচিত হয়েছে। কাব্যগুলো সাধারণত জঙ্গনামা এবং গান-গাথাগুলো জারি নামে পরিচিত। যুদ্ধকাব্যের ফারসি নাম জঙ্গনামা। কিন্তু বাঙলায় নামটি যোগরূঢ় হয়ে কেবল কারবালা যুদ্ধ বিষয়ক কাব্যই নির্দেশ করে।
কারবালার যুদ্ধে প্রতারিত ইমাম হোসেনের শোচনীয় পরাজয় ও নিধনের করুণ বৃত্তান্তই এ কাব্যে বর্ণিত। দুর্ভাগ্য লাঞ্ছনা পীড়ন পরাজয় ও হত্যার এমনি অগুণতি ঘটনা দুনিয়াব্যাপী ঘটেছে, আজো ঘটছে। ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা রয়েছে সে সবের বীভৎস কিংবা করুণ বিবরণ। লোকে সব কথা মনে রাখে না, সব ঘটনায় গুরুত্বও দেয় না। মুসলমানের হোসেন প্রীতি রসুল ও আলী-প্রীতির প্রতিচ্ছায়া। কারুণ্য বেদনা উত্তেজনা ও উচ্ছ্বাসের অপ্রতিরোধ্য উৎস ঐটিই। তাই বছরে একবার অন্তত মুসলমানেরা প্রিয়জন নিধনের সদ্যশোক অনুভব করে। বিশেষ করে পাকপঞ্চতন-ভক্ত শিয়া সম্প্রদায় সে শোকের অভিঘাতে বক্ষবিদারী রক্তক্ষরা বেদনায় অভিভূত হয়ে পড়ে। এমনি করে হোসেন বিষয়ক কাব্য ও গানগাথা রচন, পঠন ও শ্রবণ স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মীয় নিষ্ঠা ও জাতীয় প্রবণতায় রূপ পায়।
