এবারে মদের ব্যাপারে। হিটলারের খাস চাকর (ভ্যালে) লিঙে দশ বছর রুশদেশে কারাবাস করে, ১৯৫৫ সালে খালাস পেয়ে দেশে ফিরে হিটলার সম্বন্ধে অনেক কথা লিখেছেন। হিটলার নাকি প্রায়ই তাকে বলতেন, দেখ লিঙে, রাত্রে আপন ঘরে তুমি যত খুশি মদ খেয়ে যেমন খুশি মাতলামো কর, আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু সমাজে সাবধানে খেয়ো। বরমানও তাই সাবধানে মদ খেতেন।
আমার এই প্রবন্ধের তিন নম্বর ফুটনোটে যে চার নম্বরের লেখকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তিনি বলট।
পূর্বেই বলেছি হিটলার আত্মহত্যা করার ছাব্বিশ ঘন্টা পূর্বে তিনি হিটলার আর সাঙ্গোপাঙ্গদের ভূগর্ভ-নিবাস (বুঙ্কার) ত্যাগ করে প্রাণ বাঁচান। এই ভূগর্ভ-নিবাস বহু কামরায় বিভক্ত ছিল। তারই একটাতে থাকতেন তিনি আর তার সহকর্মী শরিংহফেন। হিটলারের আত্মহত্যার দু-তিন রাত্র পূর্বে ভোরের দিকে তার সহকর্মী তাঁকে জাগিয়ে বলেন, কান পেতে শোন, কী সব হচ্ছে। পাশের কামরায় তিন ইয়ার বরমান, জেনারেল বুর্গড আর জেনারেল ক্রেী মদ্যপানের সঙ্গে তর্কাতর্কি করছেন। রাশানরা তখন বার্লিনে ঢুকে গিয়েছে এবং কয়েকদিনের ভেতর যে তাদের জীবনমরণ সমস্যা দেখা দেবে সেটা জানতে পেরে বিশেষ করে বুর্গডফের আত্মগ্লানি দেখা দিয়েছে এবং তার জন্য তিনি প্রধানত নাৎসি পার্টি ও তার কর্তা বরমানকে দায়ী করছিলেন। বরমান আত্মপক্ষ সমর্থন করতে করতে বলছেন, এস, দোস্ত, আরেক পাত্তর হয়ে যাক–বুর্গ অধিকাংশ সময়ই মত্তাবস্থায় থাকতেন।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বলটু তার পর ঘুমিয়ে পড়েন।
দুপুরের দিকে বল্টু তার সহকর্মীর সঙ্গে গেলেন মিলিটারি কনফারেন্স রুমে–বুঙ্কারের ক্ষুদ্র-পরিসর কামরাগুলোর মধ্যে এইটেই ছিল সবচেয়ে প্রশস্ত। সেখানে গিয়ে দেখেন, হিটলার, এফা এবং গ্যোবেলস্ বসে আছেন, আর সামনের তিনখানা সোফাতে হিটলারের তিন ওমরাহ-বরমান, বুর্গড, ক্রেস্– লম্বা হয়ে, পা ফাঁক করে সর্বাঙ্গে কম্বল জড়িয়ে, সোফার ফাঁকা জায়গাগুলো কুশন (তাকিয়া-বালিশ) দিয়ে ভর্তি করে ঘরঘর করে প্রচুর নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছেন।
পূর্ব রাত্রির এবং সেই সকালের অত্যধিক সুমিষ্ট দ্রাক্ষারস পানের ধকল কাটিয়ে তখনও তারা জেগে উঠতে পারেননি। মদ্যপানশেষে তিন ইয়ার একসঙ্গে শোবার জন্য বড় ঘরটাই বেছে নিয়েছিলেন। বলট বলছেন, গ্যোবেলস্ তার দিকে এগুতে গিয়ে এদের নিদ্রাভঙ্গ না করার জন্যে প্রায় সার্কাস খেলোয়াড়ের মতো তাঁদের পা বাঁচিয়ে এক রকম ডিঙিয়ে এলেন। তাই দেখে এফা একটু মৃদু হাস্য করলেন। (পৃ. ৮১, ৮২)
এর পরও যদি প্রাগুক্ত প্রবন্ধ-লেখক বলেন বরমান মদ খেতেন না তা হলে আমরা সত্যিই নিরুপায়।
অবশ্য একথা ঠিক যে বরমান যতক্ষণ-না হিটলার ঘুমিয়ে পড়েন ততক্ষণ সচরাচর মদ খেতেন না। পাছে হিটলার ডেকে পাঠান। এমনকি স্বয়ং বরমানই তার স্ত্রীকে লিখছেন ফেব্রুয়ারি মাসে– (হিটলার আত্মহত্যা করেন ৩০ এপ্রিল ১৯৪৫, অপরাহ্র সাড়ে তিনটেয়; হিটলারের ভ্যালে খাস চাকর- লিঙের মতে ৩-৫০) ভাগ্যিস কাল রাত্রে এফার জন্মদিন পরবে আমি মদ্যপান করিনি, কারণ রাত সাড়ে তিনটেয় হিটলার আমাকে ডেকে পাঠালেন; আমি তাই সাদা চোখেই তার সঙ্গে কথাবার্তা কইতে পারলুম।
প্রাগুক্ত প্রবন্ধ-লেখক বলেছেন, বরমান হালকা চা খেতেন!
সে-ও সর্বজন সমক্ষে, হিটলারকে খুশি করার জন্য যেমন তিনি কচুঘেঁচু খেতেন তেমনি। কারণ, আর সবাই যখন মদ্যপান করতেন তখন হিটলার ঘন্টার পর ঘন্টা হালকা চা খেতেন, চীনারা, রুশোরা, কাবুলিরা যেরকম করে থাকে।
বরমান যে মদ্যপান করেন সেকথা হিটলারের অজানা ছিল না। বস্তুত বুঙ্কারের অনেকেই শেষের দিকে পরাজয় আসন্ন জেনে সুরাতে দুশ্চিন্তা ভোলবার চেষ্টা করছিলেন। সখা হফমান যখন হিটলারকে এপ্রিলের মাঝামাঝি শেষবারের মতো দেখতে আসেন তখন তাঁর জন্য শ্যাম্পেন অর্ডার দিয়ে হিটলার এই মন্তব্য করেন।
এ প্রবন্ধ লেখার উদ্দেশ্য আমার এ নয় যে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন করে বরমানকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করা। তদুপরি বরমানের এই বঙ্গদেশে আগমন অসম্ভব। ধরা পড়লে ভারত সরকার তাঁকে পয়লা প্লেনেই জর্মনি পাঠিয়ে দিতে কোনও আপত্তি করবেন না। তিনি থাকবেন ওইসব দেশেই যেসব দেশ আসামি বদলের চুক্তি জর্মনির সঙ্গে করেনি– অর্থাৎ নাৎসিদের প্রতি এখনও যাদের কিছুটা দরদ আছে। অবশ্য বরমান তার প্রাপ্য শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি পান সেটাও আমার উদ্দেশ্য নয়।
আমার উদ্দেশ্য, এইসব চৌদ্দ আর বাইশ ভাষায় প্রকাশিত মার্কিন কাগজগুলোকে যেন বঙ্গসন্তান চোখ-কান বন্ধ করে বিশ্বাস না করেন। বিশেষ করে যখন তারা স্বাস্থ্য সম্বন্ধে নানা প্রকারের উপদেশ দেয়।
———–
১. অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস বলতে হবে, নাস সাম্রাজ্য পতনের প্রায় এক বছর লুকিয়ে থাকার পর বরমানের স্ত্রী এক ক্যাথলিক পাদ্রির সাহায্য নেন, এবং মৃত্যুর পূর্বে আপন ডজনখানেক ছেলেমেয়েকে তাঁরই হাতে সঁপে দেন। এবং নির্মমতম পরিহাস– তাঁর বড় ছেলে ক্যাথলিক পাদ্রি হয়েছে।
২. এই দোস্ত হফমানকেই হিটলার পাঠিয়েছিলেন মস্কোতে, রিবেট্রপের সঙ্গে, নাৎসি-কম্যুনিস্ট চুক্তি সই করার সময় স্তালিন কী রকম লোক সে তত্ত্ব পর্যবেক্ষণ করার জন্য। হিটলারের মৃত্যুর পর ইনি হিটলার উয়োজ মাই ফ্রেন্ড নামক একটি পুস্তক লেখেন। ইনিই হিটলারের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন তাঁর ফোটোগ্রাফ ল্যাবরেটরির আসিসটেন্ট শ্রীমতী এফা ব্রাউনের সঙ্গে। আত্মহত্যা করার চল্লিশ ঘণ্টা পূর্বে হিটলার এফাঁকে বিয়ে করেন– পনেরো বছরের বন্ধুত্বের পর। এফাও একইসঙ্গে আত্মহত্যা করেন। উভয়কে একই চিতায় পোড়ানোর পর একই কবরে গোর দেওয়া হয়। রাশানরা স্কেলিটেনগুলো খুঁড়ে বের করে।
