রোজেনবেরক হেসে উত্তর দিলেন, আমরা যুদ্ধে হেরেছি যে!(৯)
ইতোপূর্বে যে মনস্তত্ত্ববিদ মার্কিন ডাক্তার গিলবারটের উল্লেখ করেছি, তিনি এই কথোপকথনের ওপর ফোড়ন দিয়ে বলেছেন, এ হল গে টিপিকল নাৎসি যুক্তিপদ্ধতি।
বট্ট্যে? তা সে যাকগে আমরা এস্থলে আউশভিৎস-হিরোশিমার তুলনামূলক আলোচনা করব না।(১০) শুধু একটি সামান্য খবর পাঠককে দিই।
হিরোশিমায় এটম বম্ ফাটানো হয় ৬ আগস্ট ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে। এর পক্ষাধিক কাল পূর্বে মহাভারতের সঞ্জয়ের ন্যায় জাপান জয়াশা ত্যাগ করে যুদ্ধে নিরপেক্ষ দেশ সুইডেনের মারফত যুদ্ধবিরতি কামনা করে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পাঠায় (এর মাস তিনেক পূর্বে হিটলারের দক্ষিণ হস্ত স্বরূপ হিমলার তার প্রভু হিটলারকে না জানিয়ে ওই সুইডেনের মারফতেই মিত্রশক্তির নিকট সন্ধিপ্রস্তাব পাঠান, কিন্তু দুই মহাপ্রভুর কেউই খ্রিস্টের উপদেশ মানতেন না বলে বাম হস্তটি অর্থাৎ হিটলার খবরটা জানতে পান এবং আত্মহত্যার কয়েক ঘণ্টা পূর্বে হিমলারকে পদচ্যুত করেন) কিন্তু মার্কিন তখন হন্যে হয়ে উঠেছে, নবাবিষ্কৃত এটম বম্ একটা ঘনবসতিওলা শহরে ছাড়লে তার প্রতিক্রিয়া কী হয় সেটা জানবার জন্য। জাপানদত্ত সন্ধিপ্রস্তাব গ্রহণ করলে তো আর বোমাটার এক্সপেরিমেন্ট চালানো যায় না– এতএব, চালাও যুদ্ধ আরও কয়েকদিন, বোমা ফাটিয়ে দেখা যাক ক হাজার লোক স্রেফ পুড়ে মরে, শহর কতটা ধ্বংস হয়। বলা নিতান্তই বাহুল্য হিটলারের ক ক-তে গ্যাসে মৃত্যু ছিল সম্পূর্ণ যন্ত্রণাহীন, এটম বমে জাপানিরা জ্বলন্ত জামাকাপড় নিয়ে ছুটোছুটি করে মরেছে বহু সহস্র, এবং অসংখ্য জন মরেছে বোমার ফলে নানাবিধ অজানা-অচেনা রোগের যন্ত্রণায় বছরের পর বছর জীবন্ত হয়ে।…এবং কর্তারা একটা বোমা ফেলেই প্রসন্ন দক্ষিণং মুখং ধারণ করেননি। আমরাও জানি, এক সংখ্যাটাই বড়ই অপয়া নিদেন দুটো বাতাসা খেতে হয়।
স্পর্শকাতর পাঠক এতক্ষণে হয়তো কিঞ্চিৎ অসহিষ্ণু হয়ে ভাবছেন, আমি এসব পুরনো কাসুন্দি ঘাটছি কেন। তবে কি আমি মডার্ন লেখকদের পাল্লায় পড়ে বীভৎস রসের অবতারণা করে শিঙ ভেঙে বাছুরের দলে ভিড়তে চাই! ঈশ্বর রক্ষতু। আমার সেরকম কোনও উচ্চাশা নেই। বরঞ্চ বলব, মর্ডানদের এই যে নতুন টেকনিক আগেভাগে সব কিছু বলে দিয়ে কোনও প্রকারের সারপ্রাইজ এলিমেন্ট না রেখে পাসে মারা ধূসর মারকা প্লট-বিবর্জিত গল্প লেখা (এদের বক্তব্য : বাস্তব জীবনে সারপ্রাইজ নেই– আছে একঘেয়েমির ধূসরিমা, পান্তাভাতের পানসেমি, মরা ইঁদুরে পাঙাশ-মারা পেট)–এটা আমি রপতো করতে পারব না … আমার যেটা মূল বক্তব্য সেটাতে আসি সর্বশেষে।
এই মাস, অর্থাৎ সেপ্টেম্বর ১৯৩৮, আজকের ঠিক ২০ বছর পূর্বে শ্রীযুক্ত চেম্বারলেন ও ফরাসি প্রধানমন্ত্রী দালাদিয়ে, দুজনাতে, গণতন্ত্রের প্রতিভূ হিসেবে চেকোশ্লোভাকিয়াকে হিটলারের করকমলে সমর্পণ করেন।
গুণ্ডামি আরম্ভ হয় সেই সময় থেকে। ক ক তার শেষ।
আজ আবার এরা গণতন্ত্র দেশের লক্ষ্মীছাড়া সব পলিটিশানরা চেকোশ্লোভাকদের তাতাচ্ছে।
অথচ, পাঠক, দেখো, চেকোশ্লোভাকদের সাহায্য করার রত্তিভর ক্ষ্যাতা ওদের নেই।
তাই তারা জর্মনির দুই লক্ষ সৈন্যকে তিন লক্ষ, না পাঁচ লক্ষে ওঠবার অনুমতি দিয়েছেন।
একদা যে রকম গণতন্ত্রের মুনিব চেম্বারলেন-দালাদিয়ে চেকোশ্লোভাকদের হিটলারের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন, আজ ঠিক তেমনি তাদের বংশধররা, চেকোশ্লোভাকদের তাড়িয়ে দিয়ে, রুশদের হাতে ছেড়ে দেবেন।
আবার শুরু হবে ক ক।
গ্যাস চেম্বার!
শা-লা!
———–
১. মূল গল্পের ধারা অনেক ক্ষেত্রে ফুটনোটের আধিক্যবশত বাধা পায়। অধম কিন্তু ফুটনোট শাস্ত্রসম্মত পদ্ধতিতে দেয়– অর্থাৎ কোনও পাঠক যদি ফুটনোট আদৌ না পড়েন তবে তিনি মূল গল্পের (টেক্সটের) কোনও প্রকারের সারবস্তু থেকে বঞ্চিত হবেন না। ফুটনোটে থাকবার কথা মূল গল্পের বক্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত নানাপ্রকারের আশ-কথা পাশ-কথা, যেগুলো অত্যধিক কৌতূহলী পাঠক পড়েন যাতে করে কিঞ্চিৎ ফালতো জ্ঞান সঞ্চয় হয় কিংবা এবং যারা বইখানা পয়সা দিয়ে কিনেছেন বলে বিজ্ঞাপনত বাদ দেয় না। অন্যদের জন্য মিষ্টান্নই যথেষ্ট- অর্থাৎ আটপৌরে পাঠক টেক্সট পড়েই সন্তুষ্ট। ফুটনোটে এমন কিছু দেওয়া যেটা না পড়লে মূল কাহিনী বুঝতে অসুবিধা হয় লেখকের পক্ষে অমার্জনীয় অপরাধ।
২. ভ্রাতৃহত্যার চিহ্নস্বরূপ সদাপ্রভু কাইনের কপালে একটি লাঞ্ছনা এঁকে দেন। লেখকের প্রেম অনুবাদ দ্রষ্টব্য।
৩. হিটলারের খাস ভালে ছিলেন লিঙে। তিনি এতই বিশ্বাসী ভৃত্য ছিলেন যে হিটলার-প্রিয়া (পরস্ত্রী) এফা ব্রাউনের বিছানা পর্যন্ত করে দিতেন। যুদ্ধশেষে দশ বছর রুশদেশে বন্দিজীবন কাটিয়ে জমনি ফিরে হিটলার সম্বন্ধে একখানি চটিবই লেখেন। হিটলারের প্রেম ও হিটলারের শেষ দশ দিবস (পুস্তকাকারে প্রকাশিত) প্রবন্ধে এর পূর্ণ পরিচয় দেওয়া হয়েছে। লিঙেকে যখন পরবর্তীকালে শুধানো হয় ইহুদিনিধন সম্বন্ধে বহু জর্মন কিছুই জানত না কেন, তিনি বলেন, হিটলার-হিমলার বহুবার সম্পূর্ণ একলা একলা গোপন সলাপরামর্শ করতেন। সে সময়ে সেখানে লিঙের চা-কফি নিয়ে যাওয়াও মানা ছিল।
