হস্তী কর্তৃক বিতাড়িত হলেও শৈব মন্দিরে (বা শৈবের গৃহে) প্রবেশ করে না। তা হলে ছন্দপতন হয় না, অর্থও তদ্বৎ শুধু জৈনের পরিবর্তে শৈবের কুৎসা করা হয়। বিদ্বেষপ্রসূত এসব প্রবাদের কোনও সত্যমূল্য নেই।
আকবর রাজনৈতিক কারণে, নিজ স্বার্থে, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের বিবরণ শোনার পর স্বয়ং একটি নবীন ধর্ম প্রচার করতে চেয়েছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, ইসলামের হজরত নবী ছিলেন নিরক্ষর আমিও নিরক্ষর। তদুপরি আমার হাতে রাজদণ্ড। আমা দ্বারা এ কর্ম সফল হবে না কেন? সে যা-ই হোক, তিনি তুলনাত্মক ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ সন্ধানীজন নন। তবে একথা অতি সত্য যে তিনি সর্বধর্মের সবগুরুকে বাদশাহি নিমন্ত্রণ জানিয়ে রাজদরবারে আসন দেওয়ার ফলে ধর্ম বাবদে মোগল রাজসভা অনেকখানি সঙ্কীর্ণতামুক্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তীকালে সর্বধর্ম জিজ্ঞাসার পন্থাটি সুখগম্য করে তোলে।
জাহাঙ্গির সর্ব বিষয়েই ছিলেন উদাসীন–যা অত্যধিক মদ্যাসক্তজনের প্রায়শ হয়ে থাকে।
শাহজাহানের মতিগতি বোঝা কঠিন। সুবৃহৎ লালকেল্লাতে কত না রঙমহল, কত না হাম্মাম, সম্পূর্ণ একটি হট্ট, কত না নিষ্কর্মা এমারৎ, নহবৎখানা, বন্দিশালা, এবং দুই বিরাট সভাগৃহ। অথচ বেবাক ভুলে গেলেন (?) দুর্গবাসীদের পাঁচ বেলা নামাজ পড়ার জন্য একটি ছোটাসে ছোটা মসজিদ বানাতে! দিল্লির দারুণ গ্রীষ্ম এবং নাকেমুখে আঁধির ধুলো খেতে খেতে তাদের দ্বিপ্রহরে যেতে হত জামি মসজিদে। দিল্লির কাঠ-ফাটা শীতের রাত্রে এশার নামাজ পড়তে।
তা সে যাই হোক, তিনি অদ্ভুত একটা একত্সপেরিমেন্ট করেছিলেন তাঁর চার পুত্রের শিক্ষাব্যবস্থায়। এক পুত্রকে স্পেশালাইজ করালেন রণকৌশলে, অন্যকে সঙ্গীতাদি
চারুকলায়, কনিষ্ঠ ঔরঙ্গজেবকে ছেড়ে দিলেন কট্টর মোল্লাদের হাতে এবং তার সর্বাধিক প্রিয় জ্যেষ্ঠ দারা শিকুহকে শেখালেন সর্বধর্ম সর্ব সম্প্রদায়ের জ্ঞানবিজ্ঞান দর্শন।
***
সর্বধর্ম চর্চা করার জন্য মোল্লাদের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও আকবর যে পথ সুগম করে দিয়ে সর্বধর্মগুরুকে রাজসভায় ডেকে এনে বসিয়েছিলেন, সেই সুপ্রশস্ত রাজবক্স দুই পুরুষ ধরে ছিল অনাবৃত অবহেলিত। দারা স্বয়ং সে পথ দিয়ে যাত্রারম্ভ করলেন। এবং শুধু তাই নয়, আকবরের কালে মৌলভি সাহেব সভাস্থলে প্রচার করতেন ইসলাম, হিন্দু পণ্ডিত প্রচার করতেন হিন্দুধর্ম, যে যার আপন ধর্ম— দারা সম্মুখে আদর্শ করলেন সর্বশাস্ত্র মূল ভাষাতে অধ্যয়ন করে, ব্রাহ্মণসন্তান যেরকম সংস্কৃত অধ্যয়ন করে, মুসলিম-সন্তান যেরকম আরবি ভাষা আয়ত্তে আনে তিনি একাই যেন সর্বধর্মের মুখপাত্র হতে পারেন। কিন্তু এস্থলে একটি বিষয়ে আমাদের মনে যেন কোনও দ্বন্দ্ব না থাকে, দারা কোনও নবধর্ম প্রবর্তনের উদ্দেশ্য নিয়ে অধ্যয়ন, গবেষণা তথা অনুবাদকর্মে লিপ্ত হননি। আকবর যে পদ্ধতিতে অগ্রসর হয়েছিলেন সেটা দারার মনঃপূত হয়নি। আকবর ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের বিবরণ শোনার পর প্রত্যেক ধর্মের কতকগুলি সিদ্ধান্ত, যেগুলো ওই ধর্মের প্রত্যেককে বিনা যুক্তিতর্কে মেনে নিতে হয় অর্থাৎ ডকট্রিন, শিবলেথ এবং ওই ধর্মের অবশ্য করণীয় আচার-অনুষ্ঠান রিচুয়াল এ দুটি অঙ্গের ওপর দিলেন প্রধান জোর; ডকট্রিন এবং রিচুয়াল। অতঃপর আকবর সর্বপ্রধান প্রধান ধর্মের সর্ব ডকট্রিন ও রিচুয়াল সংগ্রহ করে বিচার করে দেখলেন এর কোন-কোনগুলো এ দেশের জনসাধারণে প্রচলিত ও সর্বজনগ্রাহ্য হয়েই আছে, কোন-কোনগুলো আপন ধর্মে না থাকা সত্ত্বেও সে ধর্মের লোক ওইগুলো আপত্তিজনক বলে মনে করে না এবং কোন-কোনগুলো ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিদ্বেষ, কলহ এমনকি রক্তপাত পর্যন্ত ঘটিয়েছে। বিচার-বিবেচনার পর তিনি তাঁর নবীন ধর্মের এমন সব ডকট্রিন ও রিচুয়াল নিলেন যেগুলো সর্বধর্মগ্রাহ্য হয়েই আছে এবং যেগুলো হওয়ার সম্ভাবনা ধরে।
দারা এ পথ নিলেন না। তিনি বিচার করে দেখলেন, প্রত্যেক ধর্মের অন্তত কয়েকজন গুণী আপন আপন ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন এবং অল্প-সংখ্যক ধর্মানুরক্তজনের ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকলেও সেগুলো প্রাণবন্ত, ডায়নেমিক। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি মুগ্ধ হলেন হিন্দুর উপনিষদের গভীরে প্রবেশ করে। তসওউফ বা সুফিতত্ত্বকে তিনি ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে দৃঢ়বিশ্বাস রাখতেন– ইসলামের সর্বশাস্ত্র অধ্যয়ন করার পর। এবং নিশ্চয়ই বিস্মিত হয়েছিলেন যে, দুই সাধনার ধারাই সম্মিলিত হয়েছে একই সিন্ধুতে। তাই তার উপনিষদ-সাধনা পুস্তকের নামকরণ করেছিলেন– দ্বিসিন্ধু মিলন– মুজম্ উল্ বরেন্। সে যুগে দুই ভিন্ন ধর্মের সাধক একান্তে বসে ধর্মালোচনা করতেন না– বস্তুত আপন ধর্মের তত্ত্বজ্ঞানের যে বিশেষ ভাষা হয় সেটা অন্যজনের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অবোধ্য।
দারার আশা ছিল, উপনিষদ সযত্নে ফারসি ভাষাতে অনুবাদ করলে মুসলিম তত্ত্বজ্ঞানী সুফি উল্লাসে ইউরেকা শব্দ দ্বারা আপন আবিষ্কারজনিত হর্ষপ্রকাশ করবেন।
দারার বিশ্বাস ছিল, যদিও আপাতদৃষ্টিতে হিন্দুর পুরোহিত তথা মুসলমানের মোল্লা যথাক্রমে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করেন, তথাপি তাঁদের মূল উৎস দুই ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদের অধিকারী যারা তারাই।
