এ স্থলে আমার পাঠকদের বলে রাখা ভালো যে, এ-কাহিনীতে অনেক কিছু কাট-ছাঁট বাদ-সাদ দিয়েই আমি লিখছি। কারণ ভারতবর্ষ কত বড় দেশ, পাহাড়-নদী আছে কি না, লোকে কী খায়, মেয়েদের বিয়ে কবছর বয়সে হয়, এসব জানবার কৌতূহল বাঙালি পাঠকের হওয়ার কথা নয়, আর হলেও জর্মনির গ্রামাঞ্চলে হাইকিঙের বর্ণনায় সেগুলো নিশ্চয়ই অবান্তর ঠেকবে। অথচ জর্মনরা ওইসব প্রশ্নই বার বার জিগ্যেস করে বলে কথাবার্তার বারো আনা পরিমাণই ভারতবর্ষ নিয়ে। তাই পাঠক ভাববেন না, জর্মন জনপদবাসী আমার সামনে আপন দেশ নিয়েই বড়ফাটাই করেছে, আর-কিছু শুনতে চায়নি।
আমি বললুম, দেখো মারিয়ানা, তুমি যে বললে, আমাকে তোমার ভালো লাগে, সেটা নিছক মুখের কথা। আমাকে খাইয়েছ বলে আমাকে দিয়ে বাসন মাজিয়ে নিতে চাও না– কারণ তা হলে খাওয়ানোটা মজুরি হয়ে দাঁড়ায়। এসব হিসাব লোকে করে, যে-জন আপন নয়, তার সঙ্গে। আপনজনকে মানুষ সব কর্ম-অকর্মের অংশীদার করে। এইটুকু বলে, রাস্তায় নাসপাতিওলা যে আমাকে শেষ পর্যন্ত তার গাড়ি ঠেলতে দিয়েছিল সে-কথাও বললুম।
এ-কথাটা বলা হয়তো আমার উচিত হয়নি। টম-বয় হোক, আর হল্টারওয়ালিই হোক, মেয়েছেলে তো মেয়েছেলে। দেখি, মারিয়ানার চোখ টলমল করছে। আমাদের দেশে মানুষের নীল চোখ হয় না, আকাশের হয়। তাই রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন জল ভরেছে ঐ গগনের নীল-নয়নের কোণে। দেশে যে জিনিস আকাশে দেখেছি, এখানে সেটা মানুষের চোখে দেখলুম। অবশ্য এদেশের আকাশ কিন্তু আমাদের আকাশের মতো ঘন নীল, ফিরোজা নীল হয় না।
আমি তাড়াতাড়ি এই সজল সংকট কাটাবার জন্যে ঝাড়ন নিয়ে মারিয়ানার পাশে দাঁড়ালুম। সে কিছু না বলে একখানা প্লেট আমার দিকে এগিয়ে দিলে।
আমি সংকটের সম্পূর্ণ অবসান করার জন্য মাজার গুঁড়ো একটা হাঁড়ির উপর ছড়াতে ছড়াতে শুধালুম, ঠাকুরমা দুপুরবেলা ঘুমোয় না?
ওই চেয়ারেই। দিন-রাতের আঠারো ঘণ্টা ওরই উপর কাটায়, রাত্রেও অনেক বলে-কয়ে তাকে শোবার ঘরে নিয়ে যাই। মাঝে মাঝে কার্ল অবশ্য ওঁকে বেড়াতে নিয়ে যায়।
আমি শুধালুম, কার্ল? কুকুরটা? তুমি নিয়ে যাও না?
ঠাকুরমা কার্লের সঙ্গে যেতেই পছন্দ করে। লিশে ঢিল পড়লেই ঠাকুরমা থেমে যায়, টান পড়তেই আস্তে আস্তে এগোয়। ঠাকুরমা বলে, ওতেই নাকি তার সুবিধে বেশি। জানো, লোকে আমার কথা বিশ্বাস করে না, যখন বলি, কার্ল ঠিক বুঝতে পারে কখন বৃষ্টি নামবে। তার সম্ভাবনা দেখতে পেলেই সে ঠাকুরমাকে বাড়ি ফেরত নিয়ে আসে।
হঠাৎ কার্লের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললে, ঠাকুরমাকে বেড়াতে নিয়ে যাবিনে?
সঙ্গে সঙ্গে কার্ল পাশের ঘরে গিয়ে তার কলার লিশ মুখে করে নিয়ে এসে ঠাকুরমার কোলে রাখল। তিনি চমকে উঠে বললেন– হয়তো-বা ইতোমধ্যে তার তন্দ্রা এসে গিয়েছিল– আমি এখন বেড়াতে যাব কী করে?
মারিয়ানা হেসে বললে, না ঠাকুরমা, আমি শুধু ওকে দেখাচ্ছিলুম কার্ল কীরকম চালাক। তার পর কার্লকে বললে, যাও কার্ল! আজ ঠাকুরমা বেরুবে না। স্পষ্ট বোঝা গেল, কার্ল সাতিশয় ক্ষুণ্ণ মনে লিশ কলার মুখে তুলে নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। এবং খুব সম্ভব, অভিমান করে ফিরে এল না।
আমি শুধালুম, ঠাকুরমা কারও বাড়িতে যায়?
মারিয়ানা বললে, রোববার দিন গিঞ্জেয়। অন্যদিন হলে পাদ্রিসায়েবের বাড়ি। আর মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে গোরস্তানে যায়। আমার কিন্তু খুব ভালো লাগে না। বাবা তো সেখানে নেই, শুধু মা আছে। তাকেও চিনিনে।
ওর বলার ধরনটা এমনই সরল আর স্বাভাবিক যে আমার চোখে জল এসে গেছে। পাছে সে সেটা দেখে ফেলে তাই শেলফটার কাছে গিয়ে শুকনো বাসনগুলো একপাশে সরাতে লাগলুম। তাতেও দেখলুম, কোনও কাজ হয় না। তখন বুঝলুম, এ বোঝা নামিয়ে ফেলাই ভালো।
ফের মারিয়ানার কাছে এসে বললুম, আমাদের দেশের কবির একটি কবিতা শুনবে?
উৎসাহের সঙ্গে বললে, নিশ্চয়ই।
আমি বললুম, অনুবাদে কিন্তু অনেকখানি রস মারা যায়। তবু শোন :
মনে পড়া মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু কখন খেলতে গিয়ে
হঠাৎ অকারণে
একটা কী সুর গুনগুনিয়ে
কানে আমার বাজে,
মায়ের কথা মিলায় যেন
আমার খেলার মাঝে।
মা বুঝি গান গাইত, আমার
দোলনা ঠেলে ঠেলে;
মা গিয়েছে যেতে যেতে
গানটি গেছে ফেলে।
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন বসি গিয়ে।
শোবার ঘরের কোণে,
জানলা থেকে তাকাই দূরে।
নীল আকাশের দিকে
মনে হয়, মা আমার পানে
চাইছে অনিমিখে।
কোলের পরে ধরে কবে
দেখতো আমায় চেয়ে
সেই চাউনি যে গেছে।
সারা আকাশ ছেয়ে!!
এ কবিতার অনুবাদ যত কাঁচা জৰ্মনে যে কেউ করুক-না কেন, মা-হারা কচি হৃদয়কে নাড়া দেবেই দেবে। হয়তো এ কবিতাটি মারিয়ানাকে শোনানো আমার উচিত হয়নি, কিন্তু ইয়োরোপীয় সাহিত্যে মাকে নিয়ে কবিতা এত কম, এবং আমার দেশের কবির এত সুন্দর একটি কবিতা- এ প্রলোভন আমি সংবরণ করতে পারিনি বললে ভুল বলা হবে– আমি কেমন যেন আপন অজানাতেই কবিতাটি আবৃত্তি করে ফেলেছি।
রবীন্দ্রনাথ পলাতকা লেখার পর প্রায় চার বছর কোনও কবিতাই লেখেননি কিংবা অতি অল্পই লিখেছিলেন। তার পর কয়েক দিনের ভিতর অনেকগুলি কবিতা লিখে আমাদের ডেকে পাঠিয়ে সেগুলো পড়ে শোনালেন। মাকে আমার পড়ে না মনে তারই একটি। এ কবিতাটি শুনে আমরা সবাই যেন অবশ হয়ে গিয়েছিলুম। শেষটায় কে একজন যেন গুরুদেবকে শুধালে, ঠিক এই ধরনের কবিতা তিনি আরও রচনা করেন না কেন? তিনি বললেন, মা-হারা শিশু তার কাছে এমনই ট্র্যাজেডি বলে মনে হয় যে, ওই নিয়ে কবিতা লিখতে তার মন যায় না।
