ঠাকুরমা ঢুলতে ঢুলতে হঠাৎ জেগে উঠলেন। জানিনে, বোধহয় লাঙে হেরের ফাড়াকাটাবার জন্য মারিয়াকে শুধোলেন, কাল হের হানসের সঙ্গে কী কথাবার্তা হল?
মারিয়ানা আমার দিকে তাকিয়ে দুষ্ট হাসি হেসে বললে, দেখলে? তা সে যাক্। কিন্তু জানো, হাস্ কাকা বড় মজার লোক। যতসব অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প বলে– কোনটা যে সত্যি, কোনটা যে তার বানানো কিচ্ছুটি বোঝার উপায় নেই। কাল বলছিল, একবার হান্স কাকা আর বাবা নাকি লড়াইয়ের ছুটি পেয়ে দু জনা শিকারে গেছে তখন লড়াইয়ের সময় বলে বন্দুকের লাইসেন্স নিয়ে বড় কড়াকড়ি। হঠাৎ একটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়েছে। পুলিশ, দেখতে চেয়েছে লাইসেন্স। পুলিশকে যেই না দেখা অমনি হাস্ কাকা বাবাকে ফেলে দিয়ে চো চো ছুট। পুলিশও ধরবে বলে ছুটেছে পিছনে। ওদিকে হা কাকা মোটা-সোটা গালা-গোলা মানুষ। আধ মাইল যেতে না যেতেই পুলিশ তাকে ধরে ফেলেছে। কাকা বললে, পুলিশ নাকি হুঙ্কার দিয়ে লাইসেন্স চাইলে। কাকাও নাকি ভালো মানুষের মতো গোবেচারি মুখ করে পকেট থেকে লাইসেন্স বের করে দেখালে।
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, লাইসেন্স ছিল তবে ওরকম পাগলের মতো ছুটল কেন? মারিয়ানা বললে, আহ্ শোননই না। তোমার কিছুতেই সবুর সয় না। পুলিশও তোমার মতো বেকুব বনে ওই প্রশ্নই শুধালে। তখন হাস্ কাকা নাকি হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিয়ে বললে, আমার লাইসেন্স আছে, কিন্তু আমার বন্ধুর নেই। সে এতক্ষণে হাওয়া হয়ে গিয়েছে। পুলিশ নাকি প্রায় তাকে মারতে তাড়া করেছিল।
আমি হাসতে হাসতে বললুম, খাসা গল্প। পুলিশের তখনকার মুখের ভাবটা দেখবার আমার বড় ইচ্ছে হচ্ছে। জানো আমাকেও একবার পুলিশ তাড়া করেছিল। ওরে বাপ রে বাপ! সে কী ছুট, কী ছুট, কিন্তু ধরতে পারেনি।
মারিয়ানার কচি মুখ ভয়ে শুকিয়ে গিয়েছে। হোঁচট খেতে খেতে শুধোলে, কেন, কী হয়েছিল?
আমি বললুম, কী আর হবে, যা আকছারই হয়ে থাকে। পুলিশে স্টুডেন্টে পাল্লা।
মারিয়ানা নির্বাক ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি শুধালাম, কী হল? আমার মাথার পিছনে ভূত এসে দাঁড়িয়েছে নাকি?
তোতলাতে তোতলাতে শুধোলে, তুমি য়ুনিভার্সিটির স্টুডেন্ট!
আমার তখনও জানা ছিল না, এ দেশের গ্রামাঞ্চলের লোক বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় একটা যায় না, কাজেই এখানে তাদের বড় সম্মান, রীতিমতো সমীহ করে চলা হয়। তাই আমি আমার সফরের শেষের দিকে কথাটা বেবাক চেপে যেতুম। আমি ট্রাম্প, ট্রাম্পই সই। কী হবে ভদ্রলোক সেজে।
মারিয়ানা বললে, তাই বল। আমি ভাবছি, ট্রাম্পই যদি হবে তবে নখের ভিতর দু ইঞ্চি ময়লা নেই কেন? ট্রাম্পই যদি হবে তবে গোগ্রাসে গিলছে না কেন? খেতে খেতে অন্তত বার তিনেক ছুরিটা মুখে পুরলে না কেন?
আমি অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে বললুম, ভুলগুলো মেরামত করে নেব।
ধ্যৎ! ওগুলো নোংরামি। শিখতে হয় নাকি?
আমি বললুম, কোথায় স্টুডেন্ট বলে পরিচয় দিলে লাভ, আর কোথায় ট্রাম্প সাজলে লাভ এখনও ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারিনি। যখন যেটা কাজে লাগে সেইটে করতে হবে তো। এই তো যেমন তুমি। মনে হচ্ছে ট্রাম্পের কদরই তোমার কাছে বেশি।
এইটুকু মেয়ে। কী-বা জানে, কীই-বা বোঝে। তবু তার মুখে বেদনার ছায়া পড়ল। বড় বড় দুই চোখ মেলে নিঃসঙ্কোচে আমার দিকে তাকিয়ে বললে, তোমাকে আমার ভালো লাগে, তা তুমি ট্রাম্পই হও, আর স্টুডেন্টই হও।
পঞ্চদশীর স্মরণে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, অকারণ বেদনার ছায়া ঘনায় মনের দিগন্তে, ছল ছল জল এনে দেয় নয়নপাতে। এ মেয়ে একদিন বড় হবে। ভালোবাসতে শিখবে। সেইদিনের আগমনী আজকের দিনের এই কুচিৎ জাগরিত বিহঙ্গ-কাকলিতে।
.
১০
এবারে কিন্তু মারিয়ানা সেয়ানা। আহারান্তে উপাসনা আরম্ভ করলে, তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানাই, হে প্রভু সর্বশক্তিমান দিয়ে এবং শেষ করল পরলোকগত খৃস্টাত্মাদের স্মরণে।
এসব প্রার্থনার সুন্দর অনুবাদ করা প্রায় অসম্ভব। সর্ব ভাষায় সর্ব প্রার্থনার বেলায়ই তাই। প্রণব কিংবা রুদ্র যত্তে দক্ষিণ মুখ তেন মাহপাহি নিত্যম-এর বাঙলা অনুবাদ হয় না। আমি বহু বৎসর ধরে মুসলমানের প্রধান উপাসনা, ফাতিহা অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। আজ পর্যন্ত কোনও অনুবাদই মনকে প্রসন্ন করতে পারেনি। আভে মারিয়া মন্ত্রটি অতি ক্ষুদ্র। ট্রামে-বাসে ঘরে-বাইরে বার বার মনে মনে একটি অনুবাদ করেছি– আঠারো বছর ধরে, এবং এখনও করছি কোনওটাই মনঃপূত হয় না। দেশের ট্রেনে আমার পরিচিত এক ক্যাথলিক পাদ্রিসাহেবের সঙ্গে আমার অনেকক্ষণ ধরে ওই আভে মারিয়ার দুটি শব্দ নিয়ে আলোচনা হয়। ওই মন্ত্রে মা-মেরির বিশেষণে লাতিনে আছে, গ্রাসিয়া প্লেন, ইংরেজিতে ফুল অব গ্রেস, জর্মানে ফল ডের গ্লাডে! আমি বাঙলা করেছিলুম করুণাময়ী। পাদ্রিসায়েবের সেটা জানা ছিল। শব্দটা আমার মনঃপূত হয়নি, কিন্তু দু জনাতে বহু চেষ্টা করেও পছন্দসই শব্দ বের করতে পারলুম না।
কাজেই মারিয়ানার প্রার্থনাগুলোর বাঙলা অনুবাদ উপস্থিত মুলতুবি থাক।
মারিয়ানা বাসন-কোসন হাঁড়ি-বর্তন সিনকে ফেলেছে।
আমি উঠে গিয়ে সিনকের সামনে দাঁড়িয়ে বললুম, আমি মাজি : তুমি পোঁছো।
জুতো দিয়ে কাঠের মেঝেতে ঠোক্কর মেরে মারিয়ানা বললে, একদম অসম্ভব! তার চেয়ে তুমি ওই টুলটার উপরে বসে আমাকে ইন্ডিয়ার গল্প বল।
