আমার দৃঢ়বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথ যদি সেদিন মারিয়ানার মুখচ্ছবি দেখতেন তবে তিনি এ-কবিতাটি তার কাব্য থেকে সরিয়ে ফেলতেন, এবং আমাদের ওপর হুকুম করতেন, আমরা যেন কখনও আর এটি আবৃত্তি না করি।
ভেজা চোখে মারিয়ানা শুধাল, তোমার নিশ্চয়ই মা আছে, আর তুমি তাকে খুব ভালোবাস?
আমি আশ্চর্য হয়ে শুধালুম, তুমি কী করে জানলে?
বললে এ কবিতাটি তারই হৃদয় খুব স্পর্শ করার যার মা নেই, আর যে মাকে খুব ভালোবাসে। আর আমার মনে হচ্ছিল, তোমার মা না থাকলে তুমি এ কবিতাটি আমাকে শোনাতে না।
আমি বিস্ময়ে হতবাক। এইটুকু মেয়ে কী করে এতখানি বুঝল। এতখানি হৃদয় দিয়ে বুঝতে পারল। তখন আবার নতুন করে আমি সচেতন হলুম, ছোটদের আমরা যতখানি ছোট মনে করি ওরা অতখানি ছোট নয়। বিশেষ করে অনুভূতির ক্ষেত্রে। এবং সেখানেও যদি বাচ্চাটি মা-হারা হয় তবে তার বেদনা-কাতরতা এতই বৃদ্ধি পায় যে তার সঙ্গে কথা কইতে হয় বেশ ভেবে-চিন্তে।
এবারে শুধাল শেষ মোক্ষম প্রশ্ন : তুমি যে এতদূর বিদেশে চলে এসেছ তাই নিয়ে তোমার মা কিছু বললে না? এই যে ঠাকুরমা সমস্ত দিনরাত ওই দোরের পাশে চেয়ারটায় বসে থাকতে চায় কেন জানো? বাবা ঠিক সেটারই পাশের দরজা দিয়ে সবসময় বাড়ি ঢুকত–সদর দরজা দিয়ে নয়–অবশ্য আমার শোনা কথা। বাবা যেন সর্বপ্রথম ঠাকুরমাকে দেখতে পায়, ঠাকুরমাই যেন বাবাকে দেখতে পায়। লড়াইয়ের সময়ই সেটা আরম্ভ হল। বাবা যে কখন ছুটি পাবে, কখন বাড়ি পৌঁছবে তার ঠিক-ঠিকানা ছিল না বলে ঠাকুরমা দিবারাত্তির ওই চেয়ারটার উপর কাটাত। এখনও সে অভ্যাস ছাড়তে পারে না।
আমি মিনতি করে বললুম, আর থাক, মারিয়ানা।
কান্না-হাসি হেসে বললে, আচ্ছা, তবে এ দিকটা থাক। এখন আমার কথার উত্তর দাও? তোমার মা কী বলে?
আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললুম, মাকে ফেলে দূরে চলে আসাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ। কিন্তু কী করব বল। ইংরেজদের সঙ্গে ঝগড়া করেছি, তার ইস্কুল-কলেজে পড়ব না– অবশ্য গাঁধীর আদেশে। বিদেশে না গিয়ে উপায় কী? কিন্তু মা কি সেটা বোঝে?
এবারে মারিয়ানা হেসে উঠল। বললে, তুমি ভারি বোকা। মা-রা সব বোঝে, সব মাফ করে দেয়।
এর কথাই ঠিক। এ তো একদিন মা হবে।
আবার বললে, তোমার কিচ্ছুটি ভাববার নেই। দাঁড়াও, তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। এই হল শেষ প্লেট। এটা পুঁছে নিয়ে বেশ করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নাও। এই যে বোতলে তরল সাবান আছে তাতে নেবুর খুশবাই মাখানো আছে। তোমাকে একটা কবিতা পড়ে শোনাব– তুমি তোমারটা শোনালে না?
আমি হাত ধুয়ে ঠাকুরমার মুখোমুখি দেয়ালের চেয়ারে এসে বসলুম।
রবারের এপ্রন্ খুলতে খুলতে মারিয়ানা বললে, কই, দাও তোমার বইখানা। ওই যাতে হাইনের কবিতা আছে। আশ্চর্য এই যোগাযোগ। মাত্র কয়েক দিন আগে আমার ক্লাসে কবিতাটি পড়েছি।
এক ঝটকায় কবিতাটি বের করে বেশ সুন্দর গলায়, সুস্পষ্ট উচ্চারণে পড়তে আরম্ভ করল,
আন্ মাইনে মুটার- মাতার উদ্দেশে
ইষ বিনস্ গেভোন্ট—
সমস্ত কবিতাটি পড়ে শেষের কয়েকটি লাইন আবৃত্তি করলে একাধিকবার :
আজ ফিরিয়াছে মন ভবনে আপন,
যেথা মা গো, তুমি মোরে ডাকিছ সদাই।
আজ দেখিলাম যাহা দৃষ্টিতে তোমার,
সেই তো মমতা, চির আরাধ্য আমার।*
[*১. সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অনুবাদ। পূর্বোল্লিখিত হাইনের শ্রেষ্ঠ কবিতা, পৃ. ১৬ দ্রষ্টব্য। জর্মন ভাষায় নবীন সাধকদের এস্থলে একটু সাবধান করে দি। ১৭ পৃষ্ঠায় মূল জর্মনে পঞ্চম ছত্র হবে চতুর্থ ছত্র, চতুর্থ ছত্র হবে পঞ্চম ছত্র।]
আমি অস্বীকার করব না, কবিতাটি আমার মনে অপূর্ব শান্তি এনে দিল। অন্য পরিবেশে হয়তো কবিতাটি আমার হৃদয়ের এতটা গভীরে প্রবেশ করত না। বিশেষ করে ছাপাতে পড়া এক জিনিস আর একটি বারো-তেরো বছরের মেয়ে অবশ্য তার কবিতা পাঠ, তার রসবোধ দেখে তার হৃদয়-মনের বয়েস ষোল-সতেরো বছর বলতে কোনও আপত্তি নেই– তার মায়ের উদ্দেশে কবিতা সুন্দর উচ্চারণে দরদ দিয়ে পড়ে শোনাচ্ছে, সে একেবারে ভিন্ন জিনিস।
ঠাকুরমার গলা শোনা গেল। ক্ষীণ কণ্ঠে আমার উদ্দেশে বলছেন, তুমি কোনও চিন্তা করো না। তুমি তো কোনও অন্যায় করনি। আর অন্যায় করলেও মা সবসময়েই মাফ করে দেয়। ছেলের অন্যায় করার শক্তি যতখানি, মায়ের মাফ করার শক্তি তার চেয়ে অনেক বেশি। আর তুমি তোমার মাকে ভালোবাস সেইটেই সবচেয়ে বড় কথা। কাছ থেকে না-ভালোবাসার চেয়ে কি দূরে থেকে ভালোবাসা বেশি কাম্য নয়? এই যে মারিয়ানার বাপ আমার আগে চলে গেল। আমার একটিমাত্র ছেলে। কিন্তু আমি জানি, সে মা-মেরির চরণতলে আশ্রয় পেয়েও এই মায়ের জন্য প্রতীক্ষা করছে। আমিও অনেক আগেই চলে যেতুম, কিন্তু এই তো রয়েছে আমার মারিয়ানা। আমি কি তার ঠাকুরমা? আমি তার মা। এ প্রথম মা হোক, তার পর আমি হেসে হেসে চলে যাব। তুমি কোনও চিন্তা কোরো না। আপন কর্তব্য করে যাও। ঠাকুরমা কথাগুলো বললেন অতিশয় ক্ষীণ কণ্ঠে কিন্তু তার বাক্যে বিশ্বাসের কী কঠিন দার্ট।
আমি উঠে গিয়ে ঠাকুরমার হাত দুটিতে চুমো খেলুম। ফিরে এসে মারিয়ানার মস্তকাঘ্রাণ করলুম।
বিদায় নেওয়াটা খুব সহজ হয়নি। অল্পক্ষণের পরিচয়ের বন্ধু আর বহুকালের পরিচিত বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নেবার ভিতর পার্থক্য আছে সত্য, কিন্তু অনেক সময় অল্প পরিচয়ের লোকও সেই স্বল্প-সময়ের মধ্যেই এতখানি মোহাচ্ছন্ন করে দেয় যে, তার কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় মনে ক্ষোভ থেকে যায় যে, এর সঙ্গে দীর্ঘতর পরিচয় হলে কত না নতুন নতুন বাঁকে বাঁকে নতুন নতুন ভুবন দেখতে পেতুম।
