এবার তিনি মুখ খুলে বললেন, মারিয়ানা না বলল তুমি পায়ে হেঁটে হাইকিঙে বেরিয়েছ, তবে তোমার তাড়া কিসের? এ গ্রাম যা, সামনের গ্রামও তা। গ্রামে গ্রামে তফাত কোথায়? শহরে শহরে থাকে। কারণ ভগবান বানিয়েছে গ্রাম, আর মানুষ বানিয়েছে শহর।
এক লম্ফে চেয়ার ছেড়ে মারিয়ানা ঠাকুরমার কাছে গিয়ে দু হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে গালে ঝপাঝপ গণ্ডা তিনেক চুমো খেলে। আর সঙ্গে সঙ্গে ও! তুমি কী লক্ষ্মীটি ঠাকুরমা। তোমার মতো মেয়ে হয় না ঠাকুরমা। আমার কথা শুনতে যাবে কেন ওই ভবঘুরেটা। দেখা হয়েছে অবধি শুধু পালাই পালাই করছে।
ঠাকুরমা ব্যতিব্যস্ত না হয়ে বললেন, হয়েছে, হয়েছে। তুই খাওয়া শেষ কর।
রে রাগুর সঙ্গে নোনা জলে সেদ্ধ আলু আর জাওয়ার ক্রাউট।
ঠাকুরমা ব্যতিব্যস্ত না হয়ে বললেন, ক্রাউট খেতে ভালোবাসো? আমি তো শুনেছি, বিদেশিরা ও জিনিসটা বড় একটা পছন্দ করে না।
আমি বললুম, জিনিসটা যে বাঁধাকপির টক আচার। সত্যি বলতে কী, প্রথম দিন আমার ভালো লাগেনি। এখন সপ্তাহে নিদেন তিন দিন আমার চাই-ই চাই। জানেন, ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী পিয়েল লাভাল যখন একবার বার্লিনে আসেন তখন তাঁর দেশবাসী কে যেন তাঁকে বলেছিল জর্মনদের মতো জাওয়ার ক্রাউট কেউ বানাতে পারে না। সেকথা তাঁর মনে পড়ল যেদিন ভোরে তিনি চলে যাবেন তার আগের রাত্রে আড়াইটার সময়। রেস্তোরাঁ তখন বন্ধ; হলে কী হয় ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী, তিনি খাবেন জাওয়ার ক্রাউট– যোগাড় করতেই হয়।
সেই রাত সাড়ে চৌদ্দটার সময় ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সোল্লাসে খেলেন জাওয়ার ক্রাউট।
আমি যে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা পছন্দ করি না তার প্রধান কারণ ওই খাদ্যটি সম্বন্ধে তিনি অচেতন।
***
জাওয়ার ক্রাউট নিয়ে বড্ড বেশি বাগাড়ম্বর করার বাসনা নেই। আমাদের কাসুন্দোর মতো ওতে বড় বায়নাক্কার খুটিনাটি। তার কারণ সমস্যা দুজনারই এক। তেল, নুন, সিরকা, চিনি এসব কোনও সংরক্ষণকারী বস্তু অর্থাৎ প্রিজারভেটিভ ব্যবহার না করে কিংবা যতদূর সম্ভব অল্প ব্যবহার করে কী প্রকারে খাদ্যবস্তু বহুকাল ধরে আহারোপযোগী করে রাখা যায়, কান্দো ও জাওয়ার ক্রাউটের এই নিয়ে একই শিরঃপীড়া। সেই কারণেই বোধহয় কাসুন্দো বানাবার আস্য পুব বাঙালার বেশি পরিবারে নেই। মুসলমানরা আদপেই কাসুন্দা বানাতে পারে না বলে কাসুন্দো বানাবার সময় অক্ষয় তৃতীয়ায় হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি বড় বেড়ে যায়। বানাবার আস্য না থাকলেও সহাস্য বদনে খাবার আস সকলেরই আছে।
পশ্চিমের ওপর খুদাতালার মেহেরবানিও অত্যধিক। ওদের তরি-তরকারি ফলমূল বেবাক তৈরি হয়ে ওঠে গ্রীষ্মের শেষে। তার পরেই শীত এসে খাদ্যবস্তু সংরক্ষণে সাহায্য করে। আমাদের উত্তম উত্তম তরি-তরকারি তৈরি হয় শীতের শেষে তার পরই আসে গ্রীষ্মকাল–সংরক্ষণকর্মে প্রকৃতির কোনওই সহায়তা পাইনে। ফল পাকে গ্রীষ্মকালে তার পরই এসে যায় ভ্যাপসা বর্ষা–মসনে-ছাতি পড়ে সব-কুছ বরবাদ। পচা বর্ষার শেষের দিকে দুই নয়া পয়সার রোদ্দুর ওঠা মাত্রই গিন্নিমারা আচারের বোয়াম নিয়ে টাটু ঘোড়ার বেগে বেরোন ঘর থেকে। ফের পইন্ট জিরো ইলিশ গুঁড়ি নাবামাত্র তারা ঐয গেল গেল, ধর ধর বলে বেরোন রকেট-পারা। আর বাইবেলি ভাষায় ধন্য যাহারা সরল হৃদয়–অর্থাৎ ভোলা-মন, তাদের তো সর্বনাশ।
জানি, তেলে টইটম্বুর করে রাখলে মনে পড়ে না, কিন্তু বড় বেশি তেল চিটচিটে আচার খেয়ে সুখ নেই। তদুপরি ভেজাল তেলের ঠেলায় এ গ্রীষ্মে মোক্ষম মার খেয়ে আমি আচারের মাথায় ঘোল ঢেলে দিয়ে বিদায় দিয়েছি। এখন রইলেন শুধু জারক নেবু, আর বাজারের ওঁচা আচার!
আমি বললুম, মারিয়ানা, ঠাকুমার সেই লাঙে হের পুরনো দিনের গল্প বল না।
অপরাহ্নের ট্যারচা সোনালি রোদ এসে পড়েছে ঠাকুরমার নীল সাদা সেটের উপর আর মারিয়ানার ব্লড চুলের উপর। চেরি ব্র্যান্ডির বেগুনি রঙের সঙ্গে সে আলো মিশে গিয়ে ধরেছে এক অদ্ভুত নতুন রঙ। ডাবরের সুপের ফোঁটা ফোঁটা চর্বির উপর আলো যেন স্থান না পেয়ে ঠিকরে পড়ছে। সে রোদে ঠাকুরমার বরফের মতো সাদা চুল যেন সোনালি হয়ে উঠল। তার পিঠের কালো জামার উপর সে আলো যেন আদর করে হাত বুলোচ্ছে। জানালার পরদা যেমন যেমন হাওয়ায় দুলছে সঙ্গে সঙ্গে আলোর নাচ আরম্ভ হয় ঝকঝকে বাসন-কোসনের উপর, গেলাসের তরল দ্রব্যের উপর আর ঠাকুরমা-নাতনির চুলের উপর।
অনেককাল পর গ্রামাঞ্চলে এসেছি বলে খেতে খেতে শুনছি, রকম-বেরকম পাখির মধুর কূজন। এদের সময় ঘনিয়ে এসেছে। এরা আর বেশিদিন এখানে থাকবে না। শীত এলে দক্ষিণের দিকে পাড়ি দেবে। তখন গ্রাম-শহরের তফাত ঘুচে যাবে।
আসবার সময় এক সারি পপলার গাছের নিচু দিয়ে ছায়ায় ছায়ায় বাড়ি পৌঁছেছিলুম। রবিবারের অপরাহু বলে এখনও সমস্ত গ্রাম সুষুপ্ত– শুধু ওই চিনারের মগডালের ভিতর দিয়ে বাতাস চলার সামান্য গুঞ্জরণ ধ্বনি কানে আসছে, কিংবা কি এদেরই ডোবার পাড়ে যে নুয়ে পড়া উইপিং উইলো দেখেছি তারই ভেতর দিয়ে বাতাস ঘুরেফিরে বেরুবার পথ পাচ্ছে না? এ গাছের জলের উপর লুটিয়ে পড়া, মাথার সমস্ত চুল এলোমেলা করে দিয়ে সদ্য-বিধবার মতো গুমরে গুমরে যেন কান্নার ক্ষীণ রব ছাড়া– এগুলো আমার মনকে বড় বেদনায় ভরে দেয়। দেশের শিউলি ফুলের কথা মনে পড়ে। তার নামও কেউ কেউ ইংরেজিতে দিয়েছে সরো ফ্লাওয়ার বিষাদ-কুসুম।
