এ কী?
এত যে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রান্নাঘরের বর্ণনা দিলুম, ঘড়িটা গিয়েছি বিলকুল ভুলে। লক্ষই করিনি। পর্যবেক্ষণ শক্তি আমার বিলক্ষণ অক্ষম বলে ছেলেবেলায়ই আমার গুরুমশাই আমাকে রান্ধ, দিবান্ধ ইত্যাদি উত্তম উত্তম খেতাবে বিভূষিত করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, আমাদ্বারা আর যা হোক সাহিত্যিক হওয়া হবে না। আমার দোষের মধ্যে লাটসায়েবের কুকুরের যে একটা ঠ্যাঙ নেই, সেটা আমি লক্ষ করিনি! এবার সেটা পুনরায় সপ্রমাণ হল। অবশ্য আমার একমাত্র সান্ত্বনা, মারিয়ানা আমার চেয়ে একমাথা খাটো বলে দেয়াল ঘড়িটা ঠিক আই-লেভেলে ঝোলানো হয়নি।
এসব ঘড়ি সস্তা হলেও এ দেশে বড় একটা আসে না। ছোট্ট একটি বাক্সের উপর ডায়েল লাগানো কিন্তু কাঁচের আবরণ নেই। বাক্সের উপর ছোট্ট একটি কুটিরের মডেল– ব্ল্যাক ফরেস্ট (ওয়ার্স ভাল্ট-কালো বন) অঞ্চল যেরকম সচরাচর হয়ে থাকে, এবং কুটিরটি দেখা যাচ্ছে যেন তার পাশ থেকে, কারণ কোনও দরজা সেখানে নেই, আছে একটি হলদে রঙের জানালা-কুটিরটি সবুজ রঙের। প্রতি ঘন্টায় ফটাস করে জানালার দুটি পাট খুলে যায় আর ভিতর থেকে লাফ দিয়ে তার চৌকাঠে বসে একটি ছোট্ট পাখি মাথা দোলাতে দোলাতে কু-কু করে জানিয়ে দেয় কটা বেজেছে। তার পর সে ভিতরে ডুব মারে আর সঙ্গে সঙ্গে জানালার দুটি পাট কটা করে বন্ধ হয়ে যায়।
ব্ল্যাক ফরেস্টের কুটিরশিল্প। এ দেশে রপ্তানি হতে শুনিনি। হলেও বেকার হবে। এতটুকু কাঁচের আবরণ যে ঘড়ির কোথাও নেই সে ঘড়ি এই ধুলো-বালির দেশে দু দিনেই ধূলিশয্যা গ্রহণ করবে।
আমি চমকে উঠে বললুম, সর্বনাশ! তিনটে বেজে গেছে। আমাকে যে এগুতে হবে।
আমাদের তখন সবেমাত্র সুপ পর্ব সমাধান হয়েছে। ঠাকুরমা সুপ শেষ করে চুপচাপ বসে আছেন।
মারিয়ানা বললে, এগুতে হবে মানে? খাবার শেষ করে তো যাবে! আজ যে রোববারের লাঞ্চ–তার ওপর রয়েছে রে রাও।
রাগু কথাটা ফরাসি। অর্থাৎ কোফতা-কাটা মাংস। আর রে মানে হরিণ।
তার সঙ্গে টুকরো টুকরো করে কাটা থাকে ব্যাঙের ছাতা (এদেশে মেদিনীপুর বাঁকুড়ার লোক এর তত্ত্ব কিছু কিছু জানে, কাশ্মিরিরা ভালো করেই জানে এবং টিনে করে রপ্তানি আরম্ভ হয়ে গিয়েছে), প্যাজ আর ট্রাফল অবশ্য যদি এই শেষোক্ত বস্তুটি পাওয়া যায়। রীতিমতো রাজভোগ!
আমি শুধালুম, হরিণের মাংস পেলে কোথায়?
বললে, দাঁড়াও, রাগুটা নিয়ে আসি।
আমার আর মারিয়ানার সুপ প্লেটের নিচে আগের থেকেই মারিয়ানা প্রধান খাদ্যের প্লেট সাজিয়ে রেখেছিল। এখন শুধু সুপ প্লেটই উপর থেকে সরাতে হল। শুনেছি রাতে চার পদের লাঞ্চ ডিনার হলে এরকম ধারা চারখানা প্লেট একটার উপর আরেকটা সাজানো হয়। যেমন এক এক পদ খাওয়া শেষ হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে সেই প্লেট সরানো হয় প্রতিবারে নতুন করে পরের পদের জন্যে প্লেট সাজাতে হয় না–একথা আমি শুনেছি, কারণ একাধিক রাশানের বাড়িতে আমি খেয়েছি বলশি এবং জারিস্ট দুই সম্প্রদায়েরই, কিন্তু এ-ব্যবস্থা দেখিনি। একখানা প্লেটের উপর সুপ প্লেট রাখলে উচ্চতার বিশেষ কিছু হেরফের হয় না, কিন্তু চারখানা প্লেটের উপর সুপ প্লেট রাখলে সে তো নাকের ডগায় পৌঁছে যাবে।
আভন খুলে মারিয়ানা রে রাণ্ড নিয়ে এল।
আমি ঠাকুরমার দিকে তাকিয়ে মারিয়ানাকে চোখের ইশারা করলুম।
মারিয়ানা বললে, ঠাকুরমা এক সুপ ভিন্ন অন্য কিছু খায় না। আমিও না। কিন্তু ওই জিগ্যেস করলে হরিণের মাংস কোথায় পেলুম? আমাদের গ্রাম থেকে বেরুলে দূরে দক্ষিণে দেখতে পাবে আরেকটা গ্রাম– তার নাম মুফেন-ড। তার পর পুরো একটা ক্ষেত পেরিয়ে রুঙ-ড। তার শেষে নামকরা হোটেল ড্রেজেন রাইনের পাড়ে। সেখানে কিন্তু ওপারে যাবার খেয়া নেই। তাই কিছুটা দক্ষিণে গিয়ে মেলে খেয়াঘাট। ওপারে ক্যোনিগ্সভিন্টার। সেটা সিবেন-গেবির্গের (সপ্তকুলাচলের) অংশ। তার আরও অনেক দক্ষিণে গিয়ে লরেলাই। ওই যে তোমার পকেটে রয়েছে হাইনের কবিতার বই তাতে আছে লরেলাই সম্বন্ধে কবিতা।*[* অধুনা প্রকাশিত হাইনের শ্রেষ্ঠ কবিতা (দীপায়ন প্রকাশনা। দেশ ১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৮ সংখ্যা, পৃ. ৪১৮ দ্র.) পুস্তিকার ৮৬ ও ৮৭ পৃ. পশ্য।]
মারিয়ানা ইস্কুলমাস্টারের মতো আমাকে বেশকিছু ভূগোল জ্ঞান দান করে বললে, হা, হরিণের মাংসের কথা হচ্ছিল। ওই যে মুফেন ডর্ফ (ড= গ্রাম) সেটা এমনি অজ যে আমরা ওটাকে ডাকি মুফ্রিকা আফ্রিকার মতো সভ্যতা থেকে অনেক দূরে আছে বলে আফ্রিকার ফ্রিকাটি জুড়ে নিয়ে। আর আফ্রিকাবাসীকে যেমন জর্ষনে বলা হয় আফ্রিকানার ঠিক তেমনি ওদের আমরা ডাকি মুফ্রিকানার।
আমি হেসে বললুম, তোমাদের রসবোধ আছে।
মারিয়ানা বললে, ওই মুফ্রিকার কাকা হাস্ বাবার বন্ধু। আসলে অবশ্য বাবার বন্ধু বলেই ওঁকে ডাকি অঙ্কল হান্স। দু জনাতে প্রতি শনিবারে শিকারে যেত ৷ যতদিন বাবা বেঁচে ছিল। এখন একা যায়। যেদিন ভালো শিকার জোটে সেদিন মাংসের খানিকটে আমায় দিয়ে যায়। ব্যাঙের ছাতা আমি নিজে বন থেকে কুড়িয়ে নিয়ে আসি আর পঁাজ তো ঘরে আছেই।
আমি বললুম, মারিয়ানা, লক্ষ্মী মেয়ে, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
ঠাকুরমার সুপপ্লেট সরানোর পর তিনি হাত দুটি একজোড় করে অতি শান্তভাবে আমাদের কথাবার্তা শুনে যাচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে অল্প মৃদু হাস্য করলে গাল দুটি টুকটুকে লাল হয়ে যাচ্ছিল। যেন সর্ব শরীরের রক্ত ছুটে লাল গাল দুটিতে আশ্রয় নিচ্ছিল–হ্যায়, বুড়িদের গায়ে কফোঁটা রক্তই থাকে!
