এইবারে ঠাকুমার ঠোঁট খুললেন। বললেন, বেশ হয়েছে।
মারিয়ানা মুখ আবার লাল করে বললে, দ্যৎ! সিনেমাতে দেখেছি। উইলহেলম বুশের আঁকা ছবিতে দেখেছি।*[*জর্মনদের সুকুমার রায়। ওরই মতো নিজের কবিতার ছবি নিজেই আঁকতেন। তবে সুকুমারের মতো প্যোর ননসেন্স লেখেননি। ওঁর বেশিরভাগই ইলাসট্রেটেড গল্প।] তা সে যাকগে, আমার কথা শোনো। ওইসব বিয়ের প্রস্তাব, বিয়ের পর পয়লা ঝগড়া, ঠাকুরদা যখন লড়াইয়ে চলে গেল তখনকার কথা, এসব কথা জিগ্যেস করলে হঠাৎ ঠাকুরমার স্মৃতিশক্তি একদম লোপ পায়। আমাদের ওই কার্ল কুকুরটা যেরকম পূর্ণচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে ডুকরে ডুকরে আতাঁরব ছাড়ে ঠিক সেই গলায় ককিয়ে ককিয়ে বলে– সেই এক কথা–এস ইস্ট সো লাঙে হের, সে কত প্রাচীন দিনের কথা, সেসব কি আর আমার মনে আছে। ধমকের বেলা সব মনে থাকে তখন আর লাঙে হের, লাঙে হের নয়।
আমি বললুম, আলবাৎ, আলবাৎ।
তার থেকে অবশ্য বোঝা গেল না আমি কোন পক্ষ নিলুম। পরে বিপদে পড়লে যেদিকে খুশি ঘুরিয়ে নেব। অবশ্য আমি কালো, কৃষ্ণপক্ষ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের পক্ষেই থাকার চেষ্টা করি।
ইতোমধ্যে আমি মারিয়ানার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘরটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিয়েছি।
ঘরের উত্তর-পূর্ব কোণে দুই দেয়ালের সঙ্গে মিলে সিক– জর্মনে বলে শপ্যুলস্টাইন।
দেয়ালে গাঁথা ওয়াশস্টেন্ডের মতো, ছোট্ট চৌবাচ্চা-পানা দেয়ালে গাঁথা বলে যেন হাওয়ায় দুলছে– মাটি পর্যন্ত নেবে আসেনি। সেখানে ট্যাপে বাসন-কোসন মাজা হয়, মাছ-মাংস ধোয়া হয়। তাই রান্নাঘরে, কিংবা দাওয়ায় (অবশ্য এই শীতের দেশে দাওয়া জিনিসটাই নেই) ঘড়া ঘড়া জল রাখতে হয় না। খাওয়া-দাওয়ার পর তাবৎ বাসন-বর্তন, হাঁড়ি-কুড়ি ওইটেতে রেখে সেটাকে জলভর্তি করা হয়। তারই উপরে বাঁ দিকের দেয়ালে কয়েকটা হুকে ঝুলছে কুঁদুলের জালের পরিবর্তে ওয়েস্ট কটন, অতি সূক্ষ্ম তারের জালের স্পঞ্জ, খান দুই ঋড়ন। আর তার নিচে দেয়ালে গাঁথা শেলফের উপর ভিমজাতীয় (ওদের বোধ হয় পের্জিল) খুঁড়োর চোঙা, সাবান, আর দু-একটা টুকিটাকি যেগুলো আমি চিনিনে। আমি তো আর জর্মন রান্নাঘরে ছেলেবেলা কাটাইনি। ডান দিকের দেয়ালে গাঁথা, কিংবা ঝোলানো একটা বেশ বড় খোলা শেলফ। সিকে হয়তো দু-চার কালি গরম জলও ঢেলে দেওয়া হয়েছে– রান্না শেষ হওয়ার পর যেটুকু আগুন বেঁচে থাকে, সেটা যাতে করে খামকা নষ্ট না হয়, তাই তখন তার উপর কালি চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং সেই গরম জলে বাসন কোসনের চর্বি গলাবার জন্যে সিকে ঢেলে দেওয়া হয়, আর ইতোমধ্যে কেউ কফি বা চা খেতে চাইলে তো কথাই নেই। সিনকের সামনে দেয়ালমুখো হয়ে দাঁড়িয়ে উপর থেকে ভিন্, স্পঞ্জ পেড়ে নিয়ে এক-একটা করে হাঁড়ি মাজবে, ঝাড়ন দিয়ে সেটা শুকোবে, তার পর ডান দিকের শেলফে রাখবে। ভালো হয় যদি একজন মাজে আর অন্য জন ঝাড়ন দিয়ে পৌঁছে।
সিকের ডান দিকে পুবের দেয়ালের সঙ্গে গা-ঘেঁষে একটি প্রমাণ সাইজের মোক্ষম টেবিল। উপরের তক্তাখানা অন্তত দু-ইঞ্চি পুরু হবে। এর উপরেই মাছমাংস-তরকারি কাটাকুটি হয়। তাই তার সর্ব-পৃষ্ঠে ক্রি-ক্রসূ ছোট-বড় সবরকম কাটার দাগ। পোয়া ইঞ্চি পরিমাণ জায়গা বেরুবে না যেখানে কোনও দাগ নেই। টেবিলের একপাশে মাংস কোতা করার জন্য একটা কল লাগানো আছে। টেবিলের সামনে একটি টুল কিন্তু জর্মন মেয়েরা দাঁড়িয়েই রান্নার কাজ করতে ভালোবাসে।
সিনকের বাঁ দিকে উত্তরের দেয়ালের সঙ্গে গা ঘেঁষে হার্থ, উনুন, যা খুশি বলতে পারেন। প্রায় টেবিল সাইজের একটা লোহার বাক্স। উপরে চারটে উনুনের মুখ। নিচের দরজা খুলে কয়লা পোরা হয়। ভাঙা টুকরো টুকরো পাথুরে কয়লা ছাড়া এরা ব্যবহার করে ব্রিকেট। কয়লা গুঁড়ো করে ইটের (ব্রি) সাইজে বানানো হয় বলে এগুলোর নাম ব্রিকেট। হাত ময়লা না করে সাঁড়াশি দিয়ে তোলা যায়, আগুনও ধরে খুব তাড়াতাড়ি আর ধুয়োও দেয় অত্যল্প। উনুনের পাশে একটা বালতিতে কয়লা, অন্য বালতিতে চিমটেসুদ্ধ একগাদা ব্রিকেট। উনুন থেকে ধুয়ে নিকাশের চোঙা বেরিয়ে যেখানে দেয়ালে গিয়ে ঢুকেছে তারই ডান পাশের দেয়ালে গাঁথা আরেকটা শেলফ। তাতে বড় বড় জার। কোনওটাতে লেখা মেল– ময়দা, কোনওটাতে ৎসুকার–চিঠি, কোনওটাতে জাৎস্নু ন। তামচিনির (স্টোন-ওয়েয়ার) জারগুলো পোড়াবার আগেই কথাগুলো লেখা হয়েছিল বলে কখনও মুছে যাবে না। তার পর বোতল বোতল তেল, সিরকা ইত্যাদি তরল পদার্থ। সর্বশেষে মার্শরিন, মাখন আরও কী সব।
ঘরের মাঝখানে খাবার টেবিল।
ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে– অর্থাৎ সিকের তির্যক কোণে একখানা পুরনো নিচু আর্ম-চেয়ার। দক্ষিণ থেকে ঘরে ঢুকতেই বাঁ-দিকে পড়ে। এ-চেয়ারে ঠাকুরমা বসে বসে ঢেলেন। সামনের ছোট ফুটল বা পাদপীঠের উপর পা রেখে।
এদের ড্রইং-রুম-ক-ডাইনিং রুম আছে। কিন্তু তার ব্যবহার বড় একটা হয় না। সেটা যেন বড় পোশাকি। বসে সুখ পাওয়া যায় না, কথাবার্তা কেমন যেন জমে না। বন্ধ ঘরের কেমন যেন একটা ভ্যাপসা গন্ধ।
আর এ-ঘরে কেমন যেন একটা হৃদ্যতা, খোলাখুলি ভাব। কেউ যেন কারও পর নয়।
.
০৯.
কুকু-কুকু, কুকু-কুকু, কুকু-কুকু!
