কিন্তু ভগ্নদূতের মতো নতমস্তকে বার বার স্বীকার করছি ওই স্যালাড মেশানোর বিদ্যেটা আমি আজও রপ্ত করে উঠতে পারিনি। অথচ বন্ধু মহলে– বোম্বায়ের শচীন চৌধুরী থেকে আরম্ভ করে কলকাতার ডাক্তার ঘোষ পর্যন্ত স্যালাড মেশানো ব্যাপারে আমার রীতিমতো খ্যাতি আছে। তারা যখন আমার তৈরি স্যালাড খেয়ে আ মরি আ মরি করেন, আমি তখন ঠাকুরমার সেই স্যালাডের স্মরণে জানালা দিয়ে হঠাৎ কখনও-বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিরীক্ষণ করতে থাকি, কখনও-বা মাথা নিচু করে বসে থাকি।
বাঙলা কথায় তুলনা দিয়ে বলতে হলে শুধাই, তেলমুড়ি আপনি মাখাতে পারেন, আমো পারি, কিন্তু পারেন ঠাকুরমার মতো? ধনে পাতার চাটনিতে কীই-বা এমন কেরানি! কিন্তু পারেন পদি পিসি পারা পিষতে?
***
গুটন আপেটিট– গুড এপিটাইট।
এর ঠিক বাঙলা নেই। উপাসনার পর একে অন্যের দিকে তাকিয়ে সবাই বলে, আশা করি তোমার যেন বেশ ক্ষুধার উদ্রেক হয়, আর তুমি তৃপ্তির সঙ্গে খেতে পারো। ইংরেজির মতো জমনেও হাঙার (হুঙার) ও এপিটাইট (আপেটিট) দুটো শব্দ আছে। এপিটাইটের ঠিক বাঙলা প্রতিশব্দ নেই। খাওয়ার রুচি, বাসনা অনেক কিছু দিয়ে মোটামুটি বোঝানো চলে কিন্তু ঠিক অর্ধটি বেরোয় না। যেমন ইংরেজিতে বলা চলে আই এম হাঙরি বাট হ্যাভ নো এপিটাইট–আমার ক্ষুধা আছে কিন্তু খাবার প্রবৃত্তি নেই, কিংবা মুখে রুচছে না। আবার পেটুক ছেলে যখন খাই খাই করে তখন অনেকেই বলে, দি বয় হ্যাঁজ এপিটাইট বাট হি ইজ নট হাঙরি এট অল। এস্থলে এপিটাইট তা হলে দাঁড়ায় চোখের ক্ষিধে। আমার অবশ্য, দুই-ই ছিল।
আইনানুযায়ী আমার মাঝখানে বসার কথা, কিন্তু আমি একরকম জোর করে মারিয়ানাকে মাঝখানে বসিয়ে দিলুম। ঠাকুরমার কখন কী দরকার হয় আমি তো জানিনে। মারিয়ানা কাছে থাকলে ওঁকে সাহায্য করতে পারবে।
বিরাট গোল এক চামচ দিয়ে সুপের বড় বোল থেকে আমার গভীর সুপ-প্লেটে মারিয়ানা চালান করতে লাগল লিটার লিটার সুপ। আমি যতই বাধা দিই, কোনও কথা শোনে না। শুধু মাঝে মাঝে পাকা গিন্নির মতো বলে, মান্ জল অর্ডন লিস্ এসে ভালো করে খেতে হয়, ভালো করে খেতে হয়।
ঠাকুরমা দেখি তখনও কী যেন বিড়বিড় করছেন। হয়তো নিত্য মন্ত্রের ওপর তার কোনও ইস্টমন্ত্র আছে, সেইটেই জপ করছেন।
আমার মা বলত, আমাকে দেখলে যতটা বোকা বলে মনে হয়, আমি ততটা বোকা নই; আর বড়দা বলত, আমাকে দেখলে যতটা বুদ্ধিমান বলে মনে হয়, আমি ততটা বুদ্ধিমান নই। কোনটা ঠিক জানিনে, তবে আমার স্মৃতিশক্তিটি ভালো সে-কথাটা উভয়েই স্বীকার করতেন। আমার মনে পড়ে গেল, আমার শহুরে বন্ধু পাউল একবার আমাকে উপাসনার অত্যাচারের কথা শুনিয়েছিল। সমস্ত দিন খেটে খিদেয় হন্যে হয়ে চাষারা তাকিয়ে আছে সুপপ্লেটের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়বে তার উপর আর পাদ্রিসায়েব, তিনি সমস্ত দিন প্রভুকে স্মরণ করছেন বলে তাঁর হাঙার এপিটাইট কিছুই নেই– পাদ্রিসায়েবের উপাসনার আর অন্ত নেই।
আমি অনুমান করলুম, আমি বিদেশি বলে হয়তো মারিয়ানা মন্ত্রোচ্চারণে কিছু কিছু কাট-ছাঁট করেছে। ফিসফিস করে সে-কথা শোধাতে তার সর্বমুখ শুধু নয়, যেন ব্লন্ড চুলের গোড়াগুলো পর্যন্ত লাল হয়ে গেল। অপরাধ স্বীকার করে বললে, খাওয়ার পরের উপাসনা পুরোপুরি করে দেবে।
ঠাকুরমার প্লেটে মারিয়ানা সুপ ঢেলেছিল অল্পই। তিনি প্রথম চামচ মুখে দেওয়ার পর আমরাও খেতে আরম্ভ করলুম। সঙ্গে সঙ্গে মারিয়ানা আমার দিকে তাকিয়ে শুধোলে, শে এস? অর্থাৎ খেতে ভালো লাগছে তো? এটা হল এদেশের দু-নম্বরের টেবিল এটিকেট। আমি বললুম, ধন্যবাদ! অপূর্ব! রাজসিক! জর্মনে কথাটা হারলিষ–তার বাঙলা রাজকীয় রাজসিক।
আমি বললুম, ঠাকুরমা, আপনাদের এই রবিবারের সেটটি ভারি চমঙ্কার।
ঠাকুমা বললেন, এ বাড়িতে কিন্তু মোটেই খাপ খায় না। তা কী করব বল। আমার মামা কাজ করতেন এক পর্সেলিন কারখানায়। তিনি আমাকে এটা দেন। সে কতকালের কথা– এস ইস সো লাঙে হের।
মারিয়ানা বললে, চেপে যেও না, ঠাকুমা! তোমার বিয়ের সময় উপহার পেয়েছিলে সেটা বললে কোনও অপরাধ হবে না। ফের এস্ ইস সো লাঙে হের বলে আরম্ভ কর না।
আমি শুধালম, এস ইসট সো লাঙে হের– সে আবার কী?
উৎসাহের সঙ্গে মারিয়ানা বললে, বুঝিয়ে বলছি, শোনো। ঠাকুমা যখনই আমাকে ধমক দিতে চায়, তখন হঠাৎ তার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর হয়ে ওঠে। তোর বাপ এ-পরবের সময় এরকম ধারা করত না, তুই কেন করছিস? তোর মা তার সাংবৎসরিক পরবের দিনে (নামেন্টাখ) ভোরবেলা চার্চে গিয়েছিল, আর তুই নটা অবধি ভভস্ করে নাক ডাকালি। কে কবে হেসেছিল, কে কবে কেশেছিল টায়-টায় মনে গাঁথা আছে। আবার দেখো শীতকালে যখন দিনভর রাতভর দিনের পর দিন বরফ পড়ে, বাড়ি থেকে বেরুনো যায় না, তখন যদি সময় কাটাবার জন্য ঠাকুরমাকে জিগ্যেস করি, হ্যাঁ, ঠাকুমা, বল তো ভাই, লক্ষ্মীটি, ঠাকুরদা কীভাবে তোমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পেড়েছিল। এক হাঁটু গেড়ে আরেক হাঁটু মুড়ে, ফুলের তোড়া বাঁ হাতে নিয়ে এগিয়ে দিয়ে, ডান হাত বুকের উপর চেপে নিয়ে–
আমি বাধা দিয়ে বললুম, অবাক করলি! তুই এসব শিখলি কোথায়? তোর কাছে কেউ বিয়ের প্রস্তাব পেড়েছিল নাকি?
