[* ১. বিলাতের কোনও এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোজনগৃহে এই মন্ত্রপাঠ করার সময় জনৈক ভারতীয় ভোজনালয় ত্যাগ করেন। দেশে ফিরে এসে তিনি সেটি ফলাও করে তার ভ্রমণ কাহিনীতে বর্ণনা দেন। নাস্তিকের এই সৎসাহসের কর্মটি তিনি যদি ইনকুইজিশন যুগে করতেন তবু না হয় তার অর্থ বোঝা যেত। কিন্তু তার এই আচরণ থেকে ধরে নিতে হবে, হয় ভারতীয়রা পরধর্ম সম্বন্ধে অসহিষ্ণু, অথবা ওই লেখক ভারতীয় নন। জানি, একজন ভারতীয়ের আচরণ থেকে তাবৎ ভারতীয় সম্বন্ধে কোনও অভিমত নির্মাণ করা অযৌক্তিক কিন্তু দেশ-বিদেশে সর্বত্রই তাই করা হয়। পক্ষান্তরে খাঁটি নাস্তিক আনাতোল ফ্ৰাস যখন একবার শুনতে পান, ফরাসি সরকার যে-পুস্তকে ভগবানের নাম উল্লেখ থাকে সে-পুস্তক স্কুল-লাইব্রেরির জন্য কিনতে দেয় না, তখন তিনি ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলেছিলেন, তা হলে ফরাসি বিদ্রোহ এত রক্তপাত করে পেলুম আমরা কী সে স্বাধীনতা–যে স্বাধীনতা আস্তিককে তার ধর্মবিশ্বাস প্রচার করতে দেয় না?]
মুসলমানদের উপাসনাটিও ক্ষুদ্র : আমি সেই খুদার নামে আরম্ভ করি যিনি দয়াময়, করুণাময়।
এদের এই মন্ত্রপাঠে একটি আচার আমার বড় ভালো লাগে; পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ যে সবে আধো আধো মন্ত্রোচ্চারণ করতে শিখেছে তাকেই সর্বজ্যেষ্ঠ আদেশ দেন, উপাসনা আরম্ভ করতে।
ঠাকুরমা আদেশ করলেন, মারিয়ানা, ফ্যাঙেমাল আন– আরম্ভ কর।
প্রাগৌক্ত শুদ্ধ-বৃদ্ধ-বিবেকমণ্ডিত নাস্তিক ভ্রমণকাহিনী লেখক আমি নই। (ভ্রমণকাহিনী যদিও লিখেছি তবু তাঁর মতো খ্যাতিলাভ করতে পারিনি। তাই আমি হস্তী দ্বারা তাড্যমানের ন্যায় খৃস্টানের গৃহ ত্যাগ করলুম না।
মারিয়ানার কিন্তু তখনও খাবার সাজানো হয়নি রোববারের বাসন-কোসন বের করতে একটু সময় লেগেছে বইকি, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। সুপ স্যালাড আনতে আনতেই, সেই সদা-প্রসন্ন তরুণ মুখটিতে কণামাত্র গাম্ভীর্য না এনে সহজ সরল কণ্ঠে বলে উঠল,
ধন্য হে জননী মেরি, তুমি মা
করুণাময়।–
বাচ্চাদের উপাসনা আমার সবসময়েই বড় ভালো লাগে। বড়দের কথায় বিশ্বাস করে তারা সরল চিত্তে ধরে নিয়েছে ভগবান সামনেই রয়েছে। ফলে তাদের মন্ত্রোচ্চারণের সময় মনে হয় তারা যেন তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা কইছে যেন ঠাকুরমার সঙ্গে কথা না বলে ভগবানের সঙ্গে কথা বলছে। আর আমরা, বয়স্করা কখনও উপরের দিকে, কখনও মাথা নিচু করে উপাসনা করি– তাঁর সঙ্গে কথা বলিনে।
গ্রামের লোক হাতি-ঘোড়া খায় না। শহুরেদের মতো আটপদী নিরতিশয় ব্যালানসড ফুড ফলে স্বভাবতই আন-ব্যালান্সড়!– খায় না বলেই শুনেছি তাদের নাকি থ্রম্বোসিস কম হয়।
সুপ।
আপনারা সায়েবি রেস্তোরাঁয় যে আড়াই ফোঁটা পোশাকি সুপ খেয়ে ন্যাপকিন দিয়ে তার দেড় ফোঁটা ঠোঁট থেকে ব্লট করেন এ সে বস্তু নয়। তার থাকে তনু, এর আছে বপু।
হেন বস্তু নেই যা এ সুপে পাবেন না।
মাংস, মজ্জাসুদ্ধ হাড়, চর্বি সেদ্ধ করা আরম্ভ হয়েছে কাল সন্ধ্যা থেকে, না আজ সকাল থেকে বলতে পারব না। তার পর তাতে এসেছে, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রাসেল স্পাউটস্, দু-এক টুকরো আলু, এবং প্রচুর পরিমাণে মটরশুটি। মাংসের টুকরো তো আছেই- তার কিছুটা গলে গিয়ে ক্কাথ হয়ে গিয়েছে, বাকিটা অর্ধ-বিগলিতালিঙ্গনে তরকারির টুকরোগুলো জড়িয়ে ধরেছে। এবং সর্বোপরি হেথা-হোথা হাবুডুবু খাচ্ছে অতিশয় মোলায়েম চাক্তি চাক্তি ফ্রাঙ্কফুর্টার সসিজ। চর্বিঘন-মাংসবহুল-তরকারি সংবলিত= মজ্জামণ্ডিত এই সুপের পৌরুষ দার্টের সঙ্গে ফেনসি রেস্তোরাঁর নমনীয় কমনীয় কচিসংসদ ভোজ্য সুপ নামে পরিচিত তরল পদার্থের কোনও তুলনাই হয় না।
এর সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে এদেশের ভাষায় বলতে গেলে বলব, মা-মাসীদের ভুলিয়ে ভালিয়ে কোনও গতিকে পিকনিকে নিয়ে যেতে পারলে তারা সাড়ে বত্রিশ উপকরণ দিয়ে যে খিচুড়ি রাধেন, ধর্মে-গোত্রে এ যেন তাই। খেয়েই যাচ্ছি, খেয়েই যাচ্ছি, শুধুমাত্র খিচুড়িই খেয়ে যাচ্ছি– শেষটায় দেখি, ওমা, বেগুন ভাজা মমলেটে হাত পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
জর্মনির জনপদবাসী ঠিক সেইরকম সচরাচর ওই একটি মাত্র সুপই খায়। তার সঙ্গে কেউ কেউ রুটি পর্যন্ত খায় না।
আজ রোববার, তাই ভিন্ন ব্যবস্থা। অতএব আছে, দ্বিতীয়ত, স্যালাড।
আবার বলছি, আপনাদের সেই ফিনসি রেস্তোরাঁর উন্নাসিক সালাদ রুস, সালাদ আলা মায়োনেজ, সালাদ ভারিয়ে-ও-পোয়াসে ও-সব মাল বেবাক ভুলে যান।
সুপে যেমন ছিল দুনিয়ার সাকুল্যে সর্বকিছু, সালাডে ঠিক তার উল্টোটি। আছে মাত্র তিনটি বস্তু : লেটিসের পাতা, টমাটোর টুকরো, প্যাজের চাক্তি ব্যস!
এগুলো মেশানো হয়েছে আরও তিনটি বস্তু দিয়ে। ভিনিগার, অলিভ ওয়েল এবং জলে-মিশিয়ে-নেওয়া শর্ষেবাটা। অবশ্য নুন আছে এবং গোলমরিচের গুড়ো থাকলে থাকতেও পারে। কিন্তু ওই যে সিরকা, তেল, শর্ষে সেই তিন বস্তুর কতটা কতখানি দিতে হবে, কতক্ষণ মাখতে হবে বেশি মাখলে স্যালাড জবুথবু হয়ে নেতিয়ে যাবে, কম মাখলে সর্বাঙ্গে সর্ব জিনিসের পরশন শিহরণ জাগবে না–সেই হল গিয়ে স্যালাডের তমসাবৃত, সৃষ্টির নিগূঢ় রহস্য।
দম্ভভরে বলছি, আমি শঙ্কর কপিল পড়েছি, কান্ট হেগেল আমার কাছে অজানা নন। অলঙ্কার নব্যন্যায় খুঁচিয়ে দেখেছি, ভয় পাইনি। উপনিষদ, সুফিতত্ত্বও আমার কাছে বিভীষিকা নয়। আমার পরীক্ষা নিয়ে সত্যেন বোসের এক সহকর্মী আমাকে বলেছিলেন, তিন বছরে তিনি আমার রিলেটিভিটি কলকাতার দুগ্ধবত্তরল করে দিতে পারবেন। পুনরপি দম্ভভরে বলছি, জ্ঞানবিজ্ঞানের হেন বস্তু নেই যার সামনে দাঁড়িয়ে হকচকিয়ে বলেছি, এ জিনিস? না এ জিনিস আমাদ্বারা কখনও হবে না। আপ্রাণ চেষ্টা করলেও হবে না।
