ইতোমধ্যে দেখি আরেক দল মোর্গা-মুর্গি এসে জুটেছে।
ঘরে ঢোকার আগে দেখি বাড়ির পিছনে এককোণে জালের বেড়ার ভিতর গোটাতিনেক শুয়োর।
আমি অবাক হয়ে মারিয়ানাকে শুধালুম, এই সবকিছুর দেখ-ভাল, তুমিই কর? তোমার ঠাকুরমা না?
ঠোঁট বেঁকিয়ে বললে, আমি করি কোথায় করে তো কার্ল?
আমি শুধালাম, সে আবার কে? তুমি না বললে, তোমরা মাত্র দু জনা?
ইতোমধ্যে কার্ল এসে জুটেছে। মাঝারি সাইজের এলসেশিয়ান হলেও এলসেশিয়ান তো বটে– জর্মনরা বলে শেপার্ড ডগ, অর্থাৎ রাখাল-কুকুর–কাজেই একদিকে রাজহাঁস, অন্যদিকে কুকুর, এ নিয়ে বিব্রত হওয়া বিচিত্র নয়। কিন্তু দেখলুম, কার্ল স্যানা ছেলে, আমাকে একবার শুঁকেই মনস্থির করে ফেলেছে, আমি মিত্রপক্ষ।
মারিয়ানা বললে, আমি ওদের খাওয়াই-টাওয়াই। কালই দেখা-শোনা করে। তোমার মতো ট্রাম্প কিংবা জিপসি সুযোগ পেলেই খপ করে একটা মুরগি ইস্তেক হসের গলা মটকে পকেটে পুরে হাওয়া হয়ে যাবে।
আমি বললুম, মনে রইল, এবারে সুযোগ পেলে ছাড়ব না।
ভয় পেয়ে বললে, এমন কম্মটি করতে যেয়ো না, লক্ষ্মীটি। অনেকেরই কার্লের চেয়েও বিরাট দুআঁসলা শেপার্ড ডগ রয়েছে। সেগুলো বড় বদমেজাজি হয়।
আমি অবাক হয়ে ভাবছি, এই বারো বছরের মেয়ে দু-আঁসলা, এক-আঁসলা, ক্রস ব্রিডের কী বোঝে?
মারিয়ানাই বুঝিয়ে বললে, খাঁটি আলসেশিয়ান কার্লের চেয়ে বড় সাইজের হয় না। আলসেশিয়ানকে আরও তাগড়াই করার জন্য কোনও কোনও আহাম্মুক আরও বড় কুকুরের সঙ্গে ক্রস করায়। সেগুলো সত্যিকার দু-আঁসলা, বদমেজাজি আর খায়ও কয়লার ইঞ্জিনের মতো।
এর অনেক পরে এক ডাক্তার আমায় বুঝিয়ে বলেছিলেন, গরু-ভেড়া-ছাগল-মুরগি নিয়ে গ্রামের সকলেরই কারবার বলে কাচ্চা-বাচ্চারা অল্প বয়সেই ব্রিডিং বুল, বিচির মোরগ কী বুঝে যায়। তাই শহুরেদের তুলনায় এ-বিষয়ে ওদের সুস্থ স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি জন্মায়, এবং পরিণত বয়সে যৌন-জীবনে শহুরেদের তুলনায় এদের আচরণ অনেক বেশি স্বাভাবিক ও বেহাঙ্গামা হয়।
থাক্ সেকথা। তবে এইবেলা এ কথাটি বলে রাখি, এই গ্রামাঞ্চলে ঘোরাঘুরির ফলে মানুষের জীবনধারা সম্বন্ধে যে জ্ঞান সঞ্চয় করেছি, শহরের বহু ড্রয়িংরুম, বার-রেস্তোরাঁর পাকা জউরি হয়েও তার সিকির সিকিও হয়নি।
***
ঠাকুরমা, আমি অতিথি নিয়ে এসেছি।
আমি বললুম, গ্র্যুসগট ঠাকুরমা। আমি বিদেশি।
ঠাকুরমা সেই প্রাচীন যুগের লোক। ফ্ল্যসগট বলাটাই হয়তো এখনও তার অভ্যাস। তাই বলে বসলেন, বসো। মারিয়ানাকে বললেন, এত দেরি করলি যে। খেতে বস্! আর সানডে সেট বের কর। আর শোন, চিজ, চেরি-ব্রান্ডি ভুলিসনি।
হ্যাঁ, ঠাকুরমা, নিশ্চয়ই ঠাকুরমা–বলতে বলতে আমার দিকে তাকিয়ে একটুখানি চোখ টিপে হাসলে। বিশেষ করে দেরাজের উপরের থাকের চেরি-ব্র্যান্ডির বোতল দেখিয়ে। অর্থাৎ অতিথি সৎকার হচ্ছে। সচরাচর এগুলো তোলাই থাকে।
এবং এটা বোঝা গেল, নিতান্ত ঠাকুরমা, নাতনি ছাড়া আর কেউ নেই বলে রবিবার দিনও সানডে সেটের কাপ-প্লেট বের করা হয় না।
মারিয়ানা টেবিল সাজাচ্ছে। আমি ঠাকুরমাকে শুধালুম, আপনার স্বাস্থ্য কীরকম যাচ্ছে?
ঠাকুরমা উত্তর না দিয়ে বললেন, তুমি তো আমার মতো কথা বল, আমার নাতনির মতো বল না।
আমি শুধালুম, একটু বুঝিয়ে বলুন।
ঠাকুরমা বললেন, আমি হানোফারের মেয়ে। সেই ভাষাতেই কথা বলি। সে-ভাষা বড় মিষ্টি। আমি ছাড়ব কেন? আমার নাতনির বাপ-ঠাকুর্দা রাইন-ল্যান্ডের লোক। এরা সবাই রাইনিশ বলে। তুমি তো হানোফারের কথা বলছ।
মারিয়ানা বলে উঠল, ওঃ, কত না মিষ্টি। শিপৎসে, শটাইন বলতে পারে না; বলে স্পিৎসে, স্টাইন।
(অর্থাৎ শ, স-এ তফাত করতে পারে না; আমরা যেরকম সাম-বাজারের সসিবাবুর সসা খেতে খেতে সগারোন নিয়ে ঠাট্টা করি।)
ঠাকুরমা কণামাত্র বিচলিত না হয়ে বললেন, আবার তোরা তো কিশে, কির্ষেতে তফাত করতে পারিসনে।
(এ দুটো উচ্চারণের পার্থক্য বাঙলা হরফ দিয়ে বোঝানো অসম্ভব। তবে এক উচ্চারণ করলে ফলে দাঁড়ায় আমি গির্জেটা (কির্ষে) খেলুম (!) এবং তার পর চেরি ফলে (কিশে) ঢুকলুম(!) যেখানে উচ্চারণে ঠিক ঠিক পার্থক্য করলে সত্যকার বক্তব্য প্রকাশ হবে, আমি চেরিফল খেয়ে গির্জেয় ঢুকলুম।)।
আমি বাঙাল-ঘটি যে-রকম উচ্চারণ নিয়ে তর্ক করে, সে ধরনের কাজিয়ার বাড়াবাড়ি থামাবার জন্য বললুম, আমার গুরু ছিলেন হানোফারের লোক।
.
০৮.
ধন্য হে জননী মেরি, তুমি মা করুণাময়ী। তুমি প্রভুর সান্নিধ্য লাভ করেছ। রমণীজাতির মধ্যে তুমিই ধন্য, আর ধন্য তোমার দেহজাত সন্তান যিশু। মহিমাময়ী মা মেরি, এই পাপীতাপীদের তুমি দয়া কর, আর দয়া কর যেদিন মরণের ছায়া আমাদের চতুর্দিকে ঘনিয়ে আসবে।
এই আভে মারিয়া বা মেরি-আবাহন-মন্ত্র উচ্চারণ না করে সাধারণত ক্যাথলিকরা খেতে বসে না– আর গ্রামাঞ্চলে তো কথাই নেই। অনেকটা হিন্দুদের গপুষের মতো। আর প্রটেস্টান্টরা সাধারণত হে আমাদের লোকের পিতা (পাতের নস্তের) মন্ত্র পাঠ করে। কোনও কোনও পরিবারে উপাসনাটা অতি ক্ষুদ্র :
এস হে যিশু!
আমাদের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করো।
আমাদের যা দিয়েছ তার উপর
তোমার আশীর্বাদ রাখো।
কমে য়েজু, জাই উনজের গাস্ট।
উন্টু জোনে ভাস ডু!
উন্ট বেশেরট হাস্ট।*
