শুধালে, আর তামাকের কী হল? তার স্বাদ তো আদপেই পাচ্ছিনে।
সাক্ষাৎ মা দুগগা! দশ হাতে একসঙ্গে পাঁচ ছিলিম গাঁজা সেজে–কুলোকে বলে নিতান্ত ওই গাঁজার স্টেডি সাপ্লয়ের জন্যই শিব দশভুজাকে বিয়ে করেছিলেন–বাবার হাতে তুলে দেবার পূর্বে মা নিশ্চয়ই তার বখরার পূর্ব-প্রসাদ নিয়ে নিতেন! এ মেয়ে শিব পাবার পূর্বেই নেশাটা মকসো করে রেখেছে– বেঁচে থাকলে শিবতুল্য বর হবে।
আমি বললুম, তামাক কর্পূর- মায় নিকোটিন। সময় সময় স্পষ্ট শোনা গেল গির্জার ঘড়িতে ঢং ঢং করে বাজল দুটো। সঙ্গে সঙ্গে এদের সকলের মুখ গেল শুকিয়ে। কী ব্যাপার? দুটোর সময় সব্বায়ের বাড়ি ফেরার হুকুম! মধ্যাহ্নভোজন।
জর্মনি কড়া আইন, ডিসিপ্লিনের দেশ। বাচ্চাদের ডিসিপ্লিন আরম্ভ হয়, জন্মের প্রথম দিন থেকেই সে-কথা আরেকদিন হবে। সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারলুম, বিপদে পড়েছে আমাকে নিয়ে। ছেলেমানুষ হোক আর যাই হোক, একটা লোককে হুট করে বিদায় দেয় কী করে? ওদিকে আমিও যে এগোতে পারলে বাঁচি সেটা বোঝাতে গেলে ওরা যদি কষ্ট পায়।
গোবেচারি মনে হয়েছিল বটে, কিন্তু এখন দেখলুম, যার দলপতি সাজবার কথা সে ছেলেটা অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা করে। শুধালে, তুমি লাঞ্চ খেয়েছ? আমার সত্য ধর্ম ছিল মিথ্যা বলার, অর্থাৎ হা, কিন্তু আমার ভিতরকার শয়তান আমাকে বিপদে ফেলার জন্য হামেহাল তৈরি। সে-ই সত্যভাষণ করে বললে, না, কিন্তু–।
কয়েকজন ছেলেমেয়ে একসঙ্গে চেঁচিয়ে বললে, আমার বাড়ি চল।
মেলা হট্টগোল। আমি বললুম, অনেক ধন্যবাদ, বাছারা, কিন্তু তোমাদের বাপ-মা একটা ট্রাম্পকে
মারিয়ানা মেয়েটা একদিন জর্মনির রানি হবে যদি না কৈলাস থেকে হুলিয়া বেরোয়। বলা-নেই-কওয়া-নেই খপ করে তার ছোট্ট হাত দিয়ে আমার হাতখানা ধরে বললে, চলো আমার বাড়ি। আমাতে ঠাকুমাতে থাকি। কেউ কিছু বলবে না। ঠাকুমা আমায় বড় ভালোবাসে। তার পর ফিসফিস্ করে কানে কানে বললে– যদিও আমার বিশ্বাস সবাই শুনতে পেলে– ঠাকুরমা চোখে দেখতে পায় না।
ইস্কুল থেকে বেরিয়ে বিস্তর হ্যান্ডশেক, বিস্তর চকলেট বদলাবদলি হল। মারিয়ানা বললে, চল। আমাদের বাড়ি গ্রামের সর্বশেষে। তুমি যেদিকে চলছিলে সেই দিকেই। খামোকা উল্টো পথে যেতে হবে না।
আজ স্বীকার করছি, তখনও আমি উজবুক ছিলুম। কাকে কী জিগ্যেস করতে হয়, না হয়, জানতুম না। কিংবা হয়তো, কিছুদিন পূর্বেই কাবুলে ছিলুম বলে সেখানকার রেওয়াজের জের টানছিলুম– সেখানে অনেকক্ষণ ধরে ইনিয়ে-বিনিয়ে হরেকরকমের ব্যক্তিগত প্রশ্ন শোধানো হল ভদ্রতার প্রথম চিহ্ন। জিগ্যেস করে বসেছি, তোমার বাপ-মা?
অত্যন্ত সহজ কণ্ঠে উত্তর দিলে, বাবা? তাকে আমি কখনও দেখিনি। আমার জন্মের পূর্বেই লড়াইয়ে মারা যায়। আর মা? তাকেও দেখিনি। দেখেছি নিশ্চয়, কিন্তু কোনও স্মরণ নেই। সে গেল, আমার যখন বয়েস একমাস।
ইচ্ছে করে এরকম প্রশ্ন শুধিয়ে বিপদে পড়া আহাম্মকিই। লড়াই, লড়াই, লড়াই! হে ভগবান! তুমি সব পার, শুধু এইটে বন্ধ করতে পার না?
ভাবলুম, কোন ব্যামোতে মা মারা গেল সেইটে শুধালে হয়তো আলাপটা অন্য মোড় নেবে। শুধালাম, মা গেল কিসে?
বারো, জোর তেরো বছরের মেয়ে। কিন্তু যা উত্তর দিল তাতে আমি বুঝলুম, আহাম্মকের মতো এক প্রশ্ন শুধিয়ে বিপদ এড়াবার জন্য অন্য প্রশ্ন শুধোতে নেই। বললে, আমাদের গায়ে ডাক্তার নেই। বন্ শহরের ডাক্তার বলে, মা গেছে হার্টে। ঠাকুরমা বলে অন্য হার্টে। মা নাকি বাবাকে বড় ভালোবাসত। সবে নাকি তাদের বিয়ে হয়েছিল।
***
নির্জন পথ চিত্রিতবৎ সাড়া নেই সারা দেশে
রাজার দুয়ারে দুইটি প্রহরী ঢুলিছে নিদ্রাবেশে ॥
তার বদলে একটি সিঁড়ির উপর পাশাপাশি বসে দুটি বুড়ি তুলছে।
আর খোলা জানালা দিয়ে আসছে ক্যানারি পাখির গিটকিরিওলা হুইসেলের মিষ্টি মধুর সঙ্গীত। মারিয়ানা বললে, দুই দুই বুড়ির ওই এক সঙ্গী– পাখিটি।
.
০৭.
গ্রামের ওই একটিমাত্র সদর-রাস্তা পেরিয়ে যাওয়ার পর দু দিকের বাড়িগুলো রাস্তা থেকে বেশ একটুখানি দূরে অর্থাৎ গেট খুলে বাগান পেরিয়ে গিয়ে ঘরে উঠতে হয়।
বাগান বললুম বটে, কিন্তু সেটাকে ঠিক কী নাম দিলে পাঠকের চোখের সামনে ছবিটি ফুটে উঠবে, ভেবে পাচ্ছিনে।
ঢুকতেই কম্পাউন্ডের বাঁ দিকে একটা ডোবাতে অনেকগুলি রাজহাঁস প্যাক প্যাক করছে। টলটল স্বচ্ছ সরোবর তরতর করে রাজহাঁস মরাল-সন্তরণে ভেসে যাওয়ার শৌখিন ছবি নয়– এ নিছক ডোবা, এদিকে-ওদিকে ভাঙা, ধসে-যাওয়া পাড়, জল ঘোলা এবং কিছু কিছু শুকনো পাতা এদিক-ওদিক ভাসছে। সোজা বাঙলায়, এখানে রাজহাঁসের চাষ হচ্ছে, বাগানের নয়নাভিরাম দৃশ্য হিসেবে এটাকে তৈরি করা হয়নি।
মারিয়ানার গন্ধ পেয়েই রাজহাঁসগুলো একজোটে ডোবা ছেড়ে তার চতুর্দিকে জড়ো হল। আমি লাফ দিয়ে একপাশে সরে দাঁড়ালুম। রাজহাঁস, ময়ূর, এরা মোটেই নিরীহ প্রাণী নয়– যে যাই বলুন। মারিয়ানাও ব্যাপারটা বুঝতে পেরে শুধু বললে, বাপরে বাপ, জানোয়ারগুলোর কী খাই! এই সকালবেলা উঠেই গাদাগুচ্ছের খাইয়ে গিয়েছি, ডোবাতেও এতক্ষণ এটা-সেটা খেয়েছে, আবার দেখো, কীরকম লেগেছে। এদের পুষে যে কী লাভ, ভগবান জানেন।
