তখন আবার বুঝলুম রবীন্দ্রনাথের সেই কথাই আপ্তবাক্য। অল্প-বয়স্করা কল্পনা দিয়েই সবকিছু পুষিয়ে নেয়। তদুপরি এদের প্রাণশক্তি অফুরন্ত। এরা পেট ভরে খেতে পায়। জামা-কাপড়ে এদের মধ্যেও কিছু দামি সস্তা ছিল বটে কিন্তু ছেঁড়া জামা-জুতো কারওই নয়। আট বছর হতে না হতে ওরা ক্ষেত-খামারের কাজে ঢোকে না। কোথায় এদের গ্রামের কাচ্চা-বাচ্চারা আর কোথায় আমার গ্রামের কাচ্চা-বাচ্চারা! এই বাচ্চাদের হাসিখুশি দেখে এদের যে-কোনও একটির মাথায় হাত রেখে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করা যায় :
তুমি একটি ফুলের মতো মণি
এমনই মিষ্টি এমনই সুন্দর
মুখের পানে তাকাই যখনি
ব্যথায় যেন কাদায় অন্তর!
শিরে তোমার হস্ত দুটি রাখি
পড়ি এই আশিস মন্তর,
বিধি তোরে রাখুন চিরকাল
এমনই মিষ্টি এমনই সুন্দর!
ডু বিস্ট ভি আইনে ব্লুমে
জো হোল্ট, উট শ্যোন উট রাইন;
ইষ শাও ডিষ আন, উন্ট ভেমুট।
শ্লাই মির ইস্ হের্তস্ হিনাইন।
মির ইস্ট আলস্ অপ ইষ ডি হ্যানডে
আউফস হাউণ্ট ডির লেগেন জলট,
বেটেন্ড, ডাস্ গট এরহাল্টে
জো রাইন উনট শ্যোন উ্নট হোল্ট।
এই গ্রামের পাশের বন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাইনরিষ হাইনে যার ছোট্ট কবিতার বইটি, বুক ড্যার লিডার পকেটে নিয়ে বন্ থেকে বেরিয়েছি। এই কবিতাটি তার থেকে নেওয়া।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পরম বিস্ময় বোধহয় এই কথা স্মরণ করে যে তিনিই প্রথম বাঙলাতে অনুবাদ করেন এবং খুব সম্ভব ভারতের সব ভাষা নিলে বাঙলাতেই প্রথম– হাইনের কবিতা। এবং তা-ও হাইনের মৃত্যুর পর চল্লিশ বছর যেতে যেতেই এবং মূল জর্মন থেকে–ইংরিজি অনুবাদ মারফতে নয়। পরবর্তী কবিদের অধিকাংশই অনুবাদ করেছেন ইংরেজি থেকে। মাত্র সত্যেন দত্ত ও যতীন্দ্র বাগচীরই অনুবাদ রবীন্দ্রনাথের অনুবাদের কিছুটা কাছে আসতে পারে। রবীন্দ্রনাথই প্রথম হাইনের বাঙলা অনুবাদ করেছিলেন সেদিকে হালে শ্ৰীযুক্ত অরুণ সরকার আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ধন্যবাদভাজন হয়েছেন, কারণ বরীন্দ্রনাথের চলিত-অচলিত কোনও রচনাবলিতেই এ অনুবাদের উল্লেখ পর্যন্ত নেই।
হাইনের সঙ্গে চণ্ডীদাসের তুলনা করা যায়। দু জনাই হৃদয়-বেদনা নিবেদন করেছেন অতি সরল ভাষায়। দরদি বাঙালি তাই সহজেই এর সঙ্গে একান্ত অনুভব করে।
গ্যোটে যে সংস্কৃতের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তার অন্যতম কারণ সংস্কৃত এবং গ্যোটের দেশ ও জাতের ভাষা দুটোই আর্য ভাষা। কিন্তু হাইনে জাতে ইহুদি। আর্য-সভ্যতা এবং ইহুদিদের সেমিতি সভ্যতা আলাদা। তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন নিছক ভারতবর্ষের নৈসর্গিক দৃশ্যের বর্ণনা পড়ে এবং শুনে।
তার যে শুরু ফন শ্লেগেল তাঁর মাথায় সর্বপ্রথম কবির মুকুট পরিয়ে দেন তিনি ছিলেন বন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক।
.
০৬.
গোল বাঁধল শান্তির পাইপ খাওয়া নিয়ে। এটা বোধহয় ড্রেস রিহার্সেল। তাই এই প্রথম সত্যকার পাইপে করে সত্যকার তামাক খাওয়া হবে। যে-ছেলেটি রেড ইন্ডিয়ানদের দলপতি সে বোধহয় একটু অতিরিক্ত মাত্রায় গোবেচারি নিতান্ত দিক-ধেড়েঙ্গে ঢ্যাঙা বলে তাকে দলপতি বানানো হয়েছে এবং জীবনে কখনও রান্নাঘরের পিছনে, ওদের ভাষায় চিলেকোঠায় (অ্যাটিকে) কিংবা খড়-রাখার ঘরে গোপনে আধ-পোড়া সিগরেটও টেনে দেখেনি। না হলে আগে-ভাগেই জানা থাকত ভসভ করে পাইপ ফোকা চাট্টিখানি কথা নয়।
দিয়েছে আবার ব্রহ্ম-টান। মাটির ছিলিম হলে ফাটার কথা।
ভিরমি যায় যায়। হৈহৈ রৈরৈ কাণ্ড। একটা ছোট ছেলে তো ভ্যাক করে কেঁদেই ফেললে। ওদিকে আমিই ওদের মধ্যে মুরুব্বি। আমাকে কিছু একটা করতে হয়। একজনকে ছুটে গিয়ে মিনরেল-ওয়াটার আনতে বললুম ও জিনিস এ অঞ্চলে পাওয়া যায় সহজেই–টাই-কলার খুলে দিয়ে শিরদাঁড়া ঘষতে লাগলুম। এসব মুষ্টিযোগে কিছু হয় কি না জানিনে– শুনেছি মৃত্যুর দু-একদিন পূর্বে রবীন্দ্রনাথের হিক্কা থামাবার জন্য ময়ূরের পালক-পোড়া না কী যেন খাওয়ানো হয়েছিল– তবে সাইকলজিক্যাল কিছু-একটা হবে নিশ্চয়ই। আমি যখন রেড-ইন্ডিয়ান তখন ওদের পাইপের পাপ কী করে ঠেকাতে হয় আমারই জানার কথা।
ফাঁড়া কেটে যাওয়ার পর দুর্ভাবনা জাগল, শোর দিনে পাইপ টানা হবে কী প্রকারে? হায়, হায়, এতসব বখেড়া পোওয়াবার পর, এমনকি জলজ্যান্ত রেড-ইন্ডিয়ান পাওয়ার পর তীরে এসে ভরাডুবি?
আমি বললুম, কুচ পরোয়া নেই। সব ঠিক হো জায়েগা। কয়েক ফোঁটা ইউকেলিপটাস তেল নিয়ে এস–অজ পাড়াগাঁ হলে কী হয়, এ যে জর্মনি।
তারই কয়েক ফোঁটা তামাকে ফেলে আগুন ধরাতেই প্রথমটায় ধপ করে জ্বলে উঠল। সেটা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে ফের ধরালুম। তার পর ভভস্ করে কয়েক টান দিয়ে বললুম, এইবারে তোমরা খাও। কাশি, নাকের জল, বমি কিছুই হবে না। কেউ সাহস করে না। শেষটায় ওই মারিয়ানা, ফিয়ারলেস্ নাদিয়াই দিলে দম! সঙ্গে সঙ্গে খুশিতে মুখচোখ ভরে নিয়ে বললে, খাসা! মনে হচ্ছে ইউকেলিপটাসের ধুয়োয় নাক-গলা ভর্তি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কেমন যেন শুকনো শুকনো।
আমি বললুম, মাদাম কুরিকে হার মানালি। ধরেছিস ঠিকই। শুকনো শুকনো ভাব বলে খুবই ভিজে সর্দি হলে ডাক্তাররা এই প্রক্রিয়ায় ইউকেলিপটাস ব্যবহার করতে বলে।
