এরা গ্র্যুসগট হয়তো জীবনে কখনও শোনেইনি। এদের জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। তাই গুটেন্ মার্গেন বলার পূর্বে প্রথম ছাড়লুম একখানা মৃদু হাস্য– একান ওকান ছোঁয়া। আমার মুখখানাও বোম্বাই সাইজের। কলাটা আড়াআড়ি খেতে পারি। স্যান্ডউইচ খাবার সময় রুটির মাখন আকছারই দু কানের ড্যালায় লেগে যায়।
ইতোমধ্যে মেয়েটি অতিশয় বিশুদ্ধ ব্যাকরণে আমাকে যা শুধাল তার যদি শব্দে শব্দে অনুবাদ করা হয় তবে সেটা বাইবেলের ভাষার মতোই শোনাবে। আপনি ইচ্ছে করলে বললে হয়তো বলতেও পারেন এখন কটা বেজেছে। পশ্চিম ইউরোপীয় ভাষাগুলোকে সবজনক্টিভ মুড তথা কন্ডিশনাল প্রচুরতম মেকদারে লাগালে প্রভূততম ভদ্রতা দেখানো হয়। বাঙলায় আমরা অতীতকাল লাগিয়ে ভদ্রতা দেখাই। শ্বশুরমশাই যখন শুধোন বাবাজি তা হলে আবার কবে আসছ? আমরা বলি, আজ্ঞে আমি তো ভেবেছিলুম অর্থাৎ আমি যা ভেবেছিলুম কথাটা আপনার সম্মতি পাবে না বলে প্রায় নাকচ করে বসে আছি। তবু আপনি নিতান্ত জিগ্যেস করলেন বলে বললুম।
তা সে যাকগে। মেয়েটি তো দুনিয়ার কুল্লে সৰ্বজনক্টিভ একেবারে কপিবুক স্টাইলে, ক্লাস-টিচারকে খুশি করার মতো ডবল হেলপিং দিয়ে প্রশ্নটি শুধোলে। আমিও কটা সজক্টিভ লাগাব মনে মনে যখন চিন্তা করছি এমন সময় গির্জার ঘড়িতে ঢং করে বাজল একটা। আমার মাথায় দুষ্টবুদ্ধি খেলল। কোনও কথা না বলে ডান হাত কানের পেছনে রেখে যেদিক থেকে শব্দ আসছিল সেইদিকে কান পাতলুম।
ইতোমধ্যে দু চারটে ছোঁড়া রাস্তা ক্রস করে মেয়েটার চতুর্দিকে দাঁড়িয়েছে। সে আস্তে আস্তে ফিসফিস করে ওদের বললে, বোধহয় জর্মন বোঝেন, কিন্তু বলতে পারেন না।
আমি বললুম, বোধহয় তুমি জর্মন বলতে পার, কিন্তু শুনতে পাও না।
অবাক হয়ে শুধোলে, কীরকম?
আমি বললুম, গির্জার ঘড়িতে ঢং করে বাজল একটা–বদ্ধ কালাও শুনতে পায়। আবার তুমি আমায় শুধোলে কটা বেজেছে। গির্জার ঘণ্টা যে শুনতে পায় না, সে আমার গলা শুনতে পাবে কী করে? তাই তো উত্তর দিইনি। তার পর ছোঁড়াগুলোর দিকে তাকিয়ে বললুম, কী বলো, ভাইরা সব! ও নিশ্চয়ই লড়াইয়ে গিয়েছিল। সেখানে শেলশকে কালা হয়ে গিয়েছে– আহা বেচারি।
সবাই তো হেসে লুটোপুটি। ইস্তেক মেয়েটি নিজে। একাধিক কণ্ঠস্বর শোনা গেল; মেয়েছেলে আবার লড়াইয়ে যায় নাকি। তা-ও এইটুকু মেয়ে! আমি গোবেচারির মতো মুখ করে বললুম, তা কী করে জানব ভাই। আমি তো বিদেশি। কোন দেশে কী কায়দা, কী করে জানব, বল। এই তো তোমরা যখন ঠাহর করতে চাইলে, আমি জর্মন জানি কি না, তখন পাঠালে মেয়েটাকে। আমাদের দেশ হলে, মেয়েটা বুদ্ধি যোগাত, কোনও একটা ছেলে ঠেলা সামলাবার জন্য এগোত।
একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন, আপনার দেশ কোথায় যাবেন কোথায়? ইত্যাদি।
আমার মাথায় তখন কলি ঢুকেছে। সংস্কৃতে বললুম, অহং বৈদেশিকঃ। মম কোহপি নিবাসো নাস্তি। সর্বদা পরিভ্রমণের করোমি।
কী উল্লাস! কী আনন্দ তাদের!
আমি ইন্ডিয়ান, আমি রেড ইন্ডিয়ান, আমি চীনেম্যান এমনকি আমি নিগ্রো ইস্তেক। যে-যার মতো বলে গেল একইসঙ্গে চিৎকার করে।
আমি আশ্চর্য হলুম, কেউ একবারের তরেও শুধোলে না, আমি কোন ভাষায় কী বললুম সেটা অনুবাদ করে দিতে। তখন মনে পড়ল, রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, তাঁর বাল্য বয়সে শিশুসাহিত্য নামক কোনও জিনিস প্রায় ছিল না বলে তিনি বয়স্কদের জন্য লেখা বই পড়ে যেতেন এবং বলেছেন, তাতে সবকিছু যে বুঝতে পারতেন তা নয়। কিন্তু নিতান্ত আবছায়া গোছের কী একটা মনের মধ্যে তৈরি করে সেই আপন মনের নানা রঙের ছিন্ন সূত্রে গ্রন্থি বেঁধে তাতে ছবিগুলো গেথেছিলেন–বইখানাতে অনেকগুলো ছবি ছিল বলে তিনি নিজেই না বোঝার অভাবটা পুষিয়ে নিয়েছিলেন। কথাটা খুব খাঁটি। বাচ্চারা যে কতখানি কল্পনাশক্তি দিয়ে না-বোঝর ফাঁকা অংশগুলো ভরে নিতে জানে, তা যারা বাচ্চাদের পড়িয়েছেন তাঁদের কাছেই সুস্পষ্ট। অনেক স্থলেই হয়তো ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছয় কিন্তু তাতে কী এসে যায়। আমি চীনেম্যান না নিগ্রো তাতে কার ক্ষতি-বৃদ্ধি। তারা বিদেশি, অজানা নতুন কিছু একটা পেয়েই খুশি। আর আমি খুশি যে বিনা মেহন্নত বিনাকসরত আমি এতগুলো বাচ্চাকে খুশি করতে পেরেছি– কারণ আমি বিলক্ষণ জানি, আমি সোনার মোহরটি নই যে দেখামাত্রই সবাই উদ্ধাহু হয়ে উল্লাসে উল্লম্ফন দেবে।
তা সে যাই হোক, শেষ পর্যন্ত স্থির হল আমি রেড ইন্ডিয়ান। তার কারণটা একটু পরেই আমার কাছে পরিষ্কার হল। এরা কয়েকদিন পর ইস্কুলের শো-তে একটা রেড ইন্ডিয়ান নাচ, তীর ছোঁড়া এবং শান্তির পাইপ খাবার অভিনয় করবে– আমি যখন স্বয়ং রেড় ইন্ডিয়ান উপস্থিত, তখন আমি রিহার্সেলটি তদারক করে দিলে পাশের গ্রামের ছেলেমেয়েরা একেবারে থ মেরে যাবে। ওঃ! তাদের কী সৌভাগ্য।
আমি নৃতত্ত্বের কিছুই জানিনে। রেড-ইন্ডিয়ানদের সম্বন্ধে আমার জ্ঞান নির্জলা নিল। তাদের শান্তির পাইপ কী, সে সম্বন্ধে আমার কণামাত্র জ্ঞান নেই। বুশ-মেনের বেশ-পোশাক আর রেড-ইন্ডিয়ানের এই বস্তুতে কী তফাত তা-ও বলতে পারব না।
অথচ ওদের নিরাশ করি কী প্রকারে?
যাক। দেখেই নি ওরা কতদূর এগিয়েছে।
তখন দেখি, ইয়াল্লা, এরা জানে আমার চেয়েও কম। ছোট্ট ইস্কুলবাড়ির একটা ঘর থেকে বেঞ্চি ডেস্ক সরিয়ে সেখানে রিহার্সেল আরম্ভ হল। রেড-ইন্ডিয়ান মাথায় পালক দিয়েছে বটে কিন্তু বাদবাকি তার সাকুল্য পোশাক কাও বয়দের মতো। আরও যে কত অনাছিষ্টি সে বলে শেষ করা যায় না।
