এ অবস্থায় আর পাঁচটা ছেলে অন্য মেয়ে নেয়, কিংবা ক্ষমাঘেন্না করে আগেরটাকেই বিয়ে করে। এ হয়ে গেল মনমরা। সমস্ত দিন ছন্নের মতো ঘুরে বেড়ায়, কারও সঙ্গে কথাবার্তা কয় না, আমাদের পীড়াপিড়িতেও বিয়ার খেতে আসে না। মেয়েটা নাকি একাধিকবার তার পায়ে ধরে কেঁদেছে। সে কিছু বলে না।
ছোট গাঁ, বোঝ অবস্থাটা। গিঞ্জেয়, রাস্তায়, মুদির দোকানে প্রতিদিন আমাদের একে অন্যের সঙ্গে যে কতবার দেখা হয় ঠিক-ঠিকানা নেই। মেয়েটা করুণ নয়নে তাকায়, ছেলেটা ঘাড় ফিরিয়ে নেয়। আমরা যারা তখন সামনে পড়ি, বোঝ আমাদের অবস্থাটা। ছেলেটা সামনে পড়লে আমাদের মুখ গম্ভীর, মেয়েটা সামনে পড়লে অন্যদিকে তাকাই, আর দু জনা সামনে পড়লে তো চরম। ছেলেটা যখন মুরুব্বি, পুরনো দিনের ইয়ার-বক্সি ইস্তেক পাদ্রি সায়েব কারও কথায় কান দিলে না, তখন মেয়েটাকে বলা হল সে যেন অন্য একটা বেছে নেয়। যদিও বরের অভাব তবু সুন্দর এবং পয়সাওয়ালার মেয়ে বলে পেয়েও যেতে পারে। দেখা গেল, সে-ও নারাজ।
নাসপাতিওলা রাস্তায় থেমে বললে, এই যে বাড়ি পৌঁছে গিয়েছি। চল ভিতরে।
আমি বললুম, না ভাই, মাফ কর।
তবে ফেরার সময় খবর নিও। বাড়ি চেনা রইল।
আমি বললুম, নিশ্চয়। কিন্তু ওদের কী হল?
কাদের? হ্যাঁ, ওই দুটোর। একদিন ওই হোথাকার (আঙুল তুলে দেখালে) ডোবায় পাওয়া গেল লাশ।
আমি শুধালুম, ছেলেটার?
না, মেয়েটার।
আর ছেলেটা?
এখনও ছন্নের মতো ঘুরে বেড়ায়। এক্ষুনি আসবে। থাকো না– আলাপ করিয়ে দেব। আমি পা চালিয়ে মনে মনে বললুম, এ গ্রাম বিষবৎ পরিত্যাজ্য।
.
০৫.
সিনেমার কল্যাণে আজকাল বহু নৈসর্গিক দৃশ্য, শহর-বাড়ি, পশুপক্ষী বিনা মেহন্নতে দেখা যায়। এমনকি বাস্তবের চেয়েও অনেক সময় সিনেমা ভালো। বাস্তবে বেলকনি থেকে রানিকে আর কতখানি দেখতে পেলুম?–সিনেমায় তার আংটি, জুতোবকলস, হ্যাঁটের সিল্কটি পর্যন্ত বাদ গেল না। আলীপুরে গিয়ে বাঘ-সিঙি না দেখে সিনেমাতে দেখাই ভালো– ক্যামেরাম্যান যতখানি প্রাণ হাতে করে ক্লোজ-আপ নেয় অতখানি ঝুঁকি নিতে আপনি-আমি নারাজ।
বিলিতি ছবির মারফতে তাই ওদের শহর, বার, রেস্টুরেন্ট, নাচ, রাস্তা-বাড়ি, দালানকোঠা আমাদের বিস্তর দেখা হয়ে গিয়েছে কিন্তু গ্রামের ছবি এরা দেখায় অল্পই। গ্রামের বৈচিত্র্যই-বা কী, সেখানে রোমান্সই-বা কোথায়? অন্তত সিনেমাওলাদের চোখে সেটা ধরা পড়ে না ধরা পড়ে এখনও আর্টিস্টদের কাছে। ইউরোপীয় গ্রাম্যজীবনের ছবি এখনও তারা একে যাচ্ছেন আর পুরনো দিনের মিইয়ে, ভান গখের তো কথাই নেই।
আমাদের গ্রামে সাধারণত সদর রাস্তা থাকে না। প্রত্যেক চাষা আপন খড়ের ঘরের চতুর্দিকে ঘিরে রেখেছে আম-কাঁঠাল সুপরি-জাম গাছ দিয়ে কিছুটা অবশ্য ঝড় থেকে কুঁড়েগুলোকে বাঁচাবার জন্য। এখানে সে ভাবনা নেই বলে গ্রামে সদর রাস্তা থাকে, তার দু দিকে চাষাভুষো, মুদি, দর্জি, কসাই, জুতোওলা সবাই বাড়ি বেঁধেছে। আর আছে ইস্কুল, গির্জে আর পাবৃ– জর্মনে লোকাল (অর্থাৎ স্থানীয় মিলন ভূমি)। এইটেকেই গ্রামের কেন্দ্র বললে ভুল হয় না।
রাস্তাটা যে খুব বাহারে তা বলা যায় না। শীতকালে অনেক সময় এত বরফ জমে ওঠে যে চলাফেরাও কয়েকদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে–আমাদের দেশে বর্ষাকালে যেরকম হয়। শুধু বাচ্চাদেরই দেখতে পাওয়া যায় তারই উপর লাফালাফি করছে, পেঁজা বরফের গুড়ো দিয়ে বল বানিয়ে একে অন্যকে ছুঁড়ে মারছে।
শুনেছি কট্টর প্রোটেস্টান্ট দেশে– স্কটল্যান্ড না কোথায় যেন রোববার দিন কাচ্চাবাচ্চাদেরও খেলতে দেওয়া হয় না। এখানে দেখি, ছেলে এবং মেয়েরাও রাস্তার উপর একটা নিম-চুবসে-যাওয়া ফুটবলে ধপাধপ কি লাগাচ্ছে। এদের একটা মস্ত সুবিধে যে জাতিভেদ এদের মধ্যে নেই। দর্জির ছেলে মুচির মেয়েকে বিয়ে করতে পারে, ইস্কুলমাস্টারের মেয়ে শুড়ির ছেলেকেও পারে। পাদ্রির ছেলেকেও পারত কিন্তু ক্যাথলিক পাদ্রির বিয়ে বারণ। আফগানিস্তানে যেরকম মেয়েদের মোল্লা হওয়া বারণ– দাড়ি নেই বলে।
একে ট্র্যাম্পে তায় বিদেশি, খেলা বন্ধ করে আমার দিকে যে প্যাট প্যাট করে তাকাবে তাতে আর আশ্চর্য কী। এমনকি ওদের মা-বাপরাও। এদের অনেকেই রবির সকালটা কাটায় জানালার উপর কুশন্ রেখে তাতে দুই কনুইয়ে ভর দিয়ে, বাইরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। প্রথম প্রথম আমার অস্বস্তি বোধ হত, শেষটায় অভ্যাস হয়ে গেল। সেটা অবশ্য পরের কথা।
ছবিতে দেখেছিলুম ছোঁড়াদের একজন চার্লির পিছন থেকে এসে একটানে তার ছেঁড়া শার্ট ফরফর করে একদম দু টুকরো করে দিলে সেটা অবশ্য শহরে। এবং আমার শার্টটা শক্ত চামড়ার তৈরি, ওটা ছেঁড়া ছোঁড়াদের কর্ম নয়! কিন্তু তবু দেখি গোটা পাঁচেক ছেলেমেয়ে এক-জায়গায় জটলা পাকিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে আর ফন্দি-ফিকির আঁটছে। একটি দশ-বারো বছরের মেয়েই দেখলুম ওদের হন্টরওয়ালি, ফিয়ারলেস নাদিয়া, মিস্ ফ্রন্টিয়ার মেল, ডাকুকি দিবা, জম্বুকি বেটি যা খুশি বলতে পারেন। হঠাৎ বলা নেই, কওয়া নেই সে দল ছেড়ে গটগট করে এসে প্রায় আমার রাস্তা বন্ধ করে মধুর হাসি হেসে বললে, সুপ্রভাত। সঙ্গে সঙ্গে একটি মোলায়েম কার্টসিও করলে– অর্থাৎ বাঁ পা-টি সোজা সটান পেছিয়ে দিয়ে, ডান হাঁটু, ইঞ্চি তিনেক নিচু করে দু হাতে দু পাশের স্কার্ট আলতোভাবে একটু উপরের দিকে তুলে নিয়ে বাও করলে। এই কার্টসি করাটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শহরে লোপ পেয়েছে, গ্রামাঞ্চলে তখনও ছিল, এখনও বোধকরি আছে।
