আমি বললুম, তোমরা তো খৃস্টান; তোমাদের না রোববারে কাজ করা মানা।
লোকটা উত্তর না দিয়ে হকচকিয়ে শুধোলে, তুমি খৃস্টান নও?
না।
তবে কী?
হিদেন।
আমি জানতুম, পৃথিবীর খৃস্টানদের নিরানব্বই নয়া পয়সা বিশ্বাস করে, অখৃস্টান মাত্রই। হিদেন। তা সে মুসলমান হোক আর বই হোক। নিতান্ত ইহুদিদের বেলা হয়তো কিঞ্চিৎ ব্যত্যয়, অবশ্য সেটা পুষিয়ে নেয় তাদের বেধড়ক ঠেঙিয়ে। তাই ইচ্ছে করেই বললুম, হিদেন।
লোকটা অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা করে বললে, আমি গত যুদ্ধে ঈশ্বরকে হারিয়েছি। তবে কি আমিও হিদেন? নিজের মনে যেন নিজেকেই শুধোলে।
আমি বললুম, আমি তো পরমেশ্বরে বিশ্বাস করি।
এবারে সে স্তম্ভিত। এবং শব্দার্থে। কারণ গাড়ি ঠেলা বন্ধ করে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকালে। শেষটায় বললে, এটা কিন্তু আমাকে সোজা করে নিতে হবে। আমাদের পাদ্রি তো বলে, তোমরা নাকি গাছ, জল এইসব পুজো করো। পাথরের সামনে মানুষ বলি দাও।
আমি বললুম, কোনও কোনও হিদেন দেয়, আমরা দিইনে। আমি বিশ্বাস করি, ঈশ্বরকে ভক্তি দিলেই যথেষ্ট।
বোকার মতো তাকিয়ে বললে, তবে তো তুমি খৃস্টান! আমাকে সব-কিছু বুঝিয়ে বল।
আমি বললুম, থাক। ফেরার সময় দেখা হলে হবে।
তাড়াতাড়ি বললে, সরি, সরি। তুমি বোধহয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছ। ওই তো সামনে গ্রাম। আমার বাড়িতে একটু জিরিয়ে যাবে?
আমি টেরমেরের স্মরণে শুধালুম, তোমার বউ বুঝি টেরমেরের বউয়ের মতো খাণ্ডার নয়?
সে তো অবাক। শুধোলে ওকে তুমি চিনলে কী করে? সবকিছু খুলে বললুম। ভারি ফুর্তি অনুভব করে বললে, টেরমের একটু দিলদরিয়া গোছ লোক আর তার বউ একটু হিসেবি– এই যা। আর এসব ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করলেই চিন্তা বাড়ে। যুদ্ধের সময়, আমার এক জর্মনের সঙ্গে আলাপ হয়– সে বুলগেরিয়াতে, বিয়ে করে বসবাস করছিল। তিন বছর সুখে কাটাবার পর একদিন তার স্ত্রীর এক বান্ধবী তাকে নির্জনে পেয়ে শুধোলে, তুমি তোমার বউকে ভালোবাসো না কেন– অমনি লক্ষ্মী মেয়ে। সে তো অবাক, শুধোলে, কে বললে? কী করে জানলে? বান্ধবী বললে, তোমার বউ বলেছে, তুমি তাকে তিন বছরের ভিতর একদিনও ঠ্যাঙাওনি! শোনো কথা!
আমি অবাক হয়ে শুধালুম, আমিও তো বুঝতে পারছিনে।
সে বললে, আমিও বুঝতে পারিনি, প্রথমটায় ওই জর্মন স্বামীও বুঝতে পারেনি। পরে জানা গেল, মেয়েটা বলতে চায়, এই তিন বছর নিশ্চয়ই সে কোনও না কোনও পরপুরুষের সঙ্গে দু-একটি হাসিঠাট্টা করেছে, স্বামী দেখেছে, কিন্তু পরে ঠ্যাঙায়নি। তার অর্থ, স্বামী তাকে কোনও মূল্যই দেয় না। সে যদি কাল কোনও পর-পুরুষের সঙ্গে পালিয়ে যায়, তবে স্বামী কোনও শোক করবে না, নিশ্চিন্ত মনে আরেকটা নয়া শাদি করবে। ভালোবাসলে ওকে হারাবার ভয়ে নিশ্চয়ই ওকে ঠেঙিয়ে সোজা রাখত।
আমি বললুম, এ তো বড় অদ্ভুত যুক্তি!
আমিও তাই বলি। কিন্তু ওই করে বুলগেরিয়া চলছে। আর এদেশে বউকে কড়া কথা বলেছ কী সে চলল ডিভোর্সের জন্য। তাই তো তোমায় বললুম, ওসব নিয়ে বড় বেশি ভাবতে নেই। লড়াইয়ে বহু দেশের জাত-বেজাতের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। অনেক দেখেছি। অনেক শিখেছি।
আমার মনে পড়ল ওই দেশবাসী রেমার্কের পশ্চিম রণাঙ্গন নিপ বইখানার কথা। সেখানে তো সব কটা সেপাই বাড়ি ফিরেছিল– অর্থাৎ যে কটা আদপেই ফিরেছিল– সর্বসত্তা তিক্ততায় নিমজ্জিত করে। আদর্শবাদ গেছে, ন্যায়-অন্যায়-বোধ গেছে; যেটুকু আছে সে শুধু যাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অহরহ মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছে তাদের জন্য। দেশের জন্য আত্মদান, জাতির উন্নতির জন্য সর্বস্ব ত্যাগ, ফ্রান্সকে পরাজিত করার জন্য জীবন-দান –এসব বললে মারমুখো হয়ে বেআইনি পিস্তল নিয়ে তাড়া লাগায়।
নাসপাতিওলাকে শুধোতে সে বললে সে বইটই পড়ে না। খবরের কাগজ পড়ে বাজার দর জানবার জন্য, আর নিতান্তই যদি কোনও রগরগে খুন কিংবা কেলেঙ্কারি কেচ্ছার বয়ান থাকে। তবে হ্যাঁ, ওর মনে পড়েছে ফিল্মটা নাকি জর্মনিতে বারণ করে দেওয়া হয়েছিল ওর মেয়ের মুখে শোনা। আমি শুধালুম, ছবিটা দেখে ছেলেছোকরাদের লড়াইয়ের প্রতি বিতৃষ্ণা হবে বলে? বললে, না, ওতে নাকি জর্মনদের বড় বর্বররূপে দেখানো হয়েছে বলে। তখন আমার মনে পড়ল, ফ্রান্সেও দেখাবার সময় যে অংশে ফরাসি নারীরা ক্ষুধার তাড়নায় জর্মন সেপাইদের কাছে রুটির জন্য দেহ বিক্রয় করার ইঙ্গিত আছে সেটা কেটে দেওয়া হয়।
অনেকক্ষণ দু জনাই চুপচাপ। নাসপাতিওলা ভাবছে। হঠাৎ বললে, পিছন পানে তাকিয়ে আর লাভ কী। যারা মরেছে তারা গেছে। যারা পাগল হয়ে গিয়েছে, যাদের মুখ এমনই বিকৃত হয়েছে দেখলে মানুষ ভয় পায়, যাদের হাত-পা গিয়ে অচল হয়ে আছে নিছক মাংসপিণ্ডবৎ, তাদের বড় বড় হাসপাতালে লুকিয়ে রাখা হয়েছে; আর আত্মীয়স্বজনদের বলা হয়েছে তারা মারা গিয়েছে এরাও নাকি ফিরে যেতে চায় না। আর আমার হাল তো দেখছই।
আমাদের গ্রামের সবকিছুই থিতিয়ে যাওয়ার পর একটা ট্র্যাজেডির দিকে সক্কলেরই নজর গেল। একটা ছেলে গ্রামে ফিরে এসে শোনে, তার অবর্তমানে তার বাগদত্তা মেয়েটি পর-পুরুষের সঙ্গে প্রণয় করেছিল। এতে আর নতুন কী? লড়াইয়ের সময় সব দেশেই হয়েছে। এবং হবে। মেয়েটা তবু পদে আছে– জারজ সন্তান জন্মায়নি। আর সেই দু দিনের প্রেমিক কবে কোথায় চলে গেছে কে জানে।
