এস্থলে স্থির করলুম, অপরিচিতকেও নমস্কার জানানো যখন এ-দেশে রেওয়াজ তবে এবার থেকে আমিই করব।
আধঘন্টাটাক পরে দেখি এগিয়ে আসছে একজন। বয়সে আমার চেয়ে বড়ও বটে। ও মোকা পাবার পূর্বেই আমি বেশ চেঁচিয়ে বললুম, ঞ্যসৃগট।
এ স্থলে নব জর্মন শিক্ষার্থীদের বলে রাখি, জর্মনভাষী জর্মন এবং সুইস সচরাচর গুটেন টাখ গুডে, শুভদিবস ইত্যাদি বলে থাকে, কারণ এরা বড় সেকুলারাইজড (ধর্মনিরপেক্ষ) হয়ে গিয়েছে। পক্ষান্তরে অস্ট্রিয়াবাসী জর্মনভাষীগণের অনেকেই এখনও সগট ভগবানের আশীর্বাদ বলে থাকে। এদেশের মুসলমানরা আল্লাকে স্মরণ করেই সালাম বলেন, হিন্দুরা রাম রাম এবং বিদায় নেবার বেলা গুজরাতে জয় জয়! জয় শিব, জয় শঙ্কর।
স্পষ্ট বোঝা গেল লোকটা গ্রুসগটের জন্য আদপেই তৈরি ছিল না। গুটেনটাখ, গুটেনটাখ বলে শেষটায় বার কয়েক গ্রুগ বলে সামনে দাঁড়াল। শুধালে, কোথায় যাচ্ছ?
ইংলন্ডে গ্রামাঞ্চলের এটিকেট জানিনে। সেখানেও বোধহয় শহুরেদের কড়াকড়ি নেই।
বললুম, বিশেষ কোথাও যাচ্ছিনে। ওই সামনের গ্রামটায় দুপুরবেলা একটু জিরোব। রাতটা কাটাব, তার পরে কোনও একটা গ্রামে, কিংবা গাছতলায়।
বললে, আমি যাচ্ছি শহরে! তার পর বললে, চল না, ওই গাছতলায় একটু জিরোন যাক। আমি বললুম, বিলক্ষণ। ভবঘুরেমির ওই একটা ডাঙর সুবিধে। না হয় কেটেই গেল ওই গাছতলাটায় ঘণ্টা কয়েক– যদিও ওটা তেঁতুলগাছ নয় এবং নজন সুজন তো এখনও দেখতে পাচ্ছিনে।
চতুর্দিক নির্জন নিস্তব্ধ। ইয়োরোপেও মধ্যদিন আসন্ন হলে পাখি গান বন্ধ করে। শুধু দূর অতি দূর থেকে গির্জার ঘণ্টা অনেকক্ষণ ধরে বেজে যাচ্ছে। রবির দুপুরের ওই শেষ আরতি– হাই ম্যাস– তাই অনেকক্ষণ ধরে ঘণ্টা বেজেই চলেছে। ওই ভেসে আসা শব্দের সঙ্গে আমার মনও ভেসে চলেছে দূর-দূরান্তে– ওই বহুদূরে যেখানে দেখা যাচ্ছে ভিনাস পাহাড়ের চুড়োর উপর গাছের ডগাগুলো।
বললে, আসলে পাইপটা অনেকক্ষণ টানিনি; তাই এই জিরোনো। তার পর শুধালে, তোমার দেশ কোথায়? আমি বললুম, আমি ইন্ডার (ভারতীয়)। এমনি চমক খেল যে তার হ্যাটটা তিন ইঞ্চি কাত হয়ে গেল। তোতলালে ইন্ডিয়ানার?
ইন্ডার অর্থাৎ ইন্ডিয়ান আর ইন্ডিয়ানার অর্থ রেড ইন্ডিয়ান। দেহাতীদের কথা বাদ দিন, শহরে অর্ধ-শিক্ষিতেরাও এ দুটোতে আকছারই ঘুলিয়ে ফেলে। অনেকরকম করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করলুম, আমি কোন দেশের লোক। শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পেরেছিল কি না জানিনে তবে তার বিস্ময় চরমে পৌঁছেছিল সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
আর বার বার শুধু মাথা নাড়ে আর বলে, বিপদে ফেললে, বড় বিপদে ফেললে।
আমি শুধালুম, কিসের বিপদ?
কত ভবঘুরে, বাউণ্ডুলে কত দেশ-দেশান্তরে যাচ্ছে আমার তাতে কী। কিন্তু তুমি অত দূর দেশের লোক, আমার গায়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছ, আমার সঙ্গে আলাপ হল আর তোমাকে আমার বাড়ি নিয়ে যেতে পারলুম না– এতে দুঃখ হয় না আমার?
তার পর মরিয়া হয়ে বললে, আসলে কী জানো, আমার স্ত্রী একটি আঁকিল। দুনিয়ার লোকের হাড় গুঁড়িয়ে দেওয়াই ওঁর স্বভাব। না হলে তোমাকে বলতুম, আমার বাড়িতে বিকেল অবধি জিরিয়ে নিতে আমিও ফিরে আসতুম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, কত লোক ইয়ার-দোস্তকে দাওয়াত করে খাওয়ায়, গাল-গল্প করে, আমার কপালে সেটি নেই।
আমি তাকে অনেক সান্ত্বনা দিয়ে বললুম তার সহৃদয়তাই আমাকে যথেষ্ট মুগ্ধ করেছে, যদি সম্ভব হয় তবে ফেরার মুখে তার খবর নেব।
পুনরায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, কিছু মনে কর না, কিন্তু ভবঘুরেদের কি আর কথা রাখবার উপায় আছে? আমার নামটা কিন্তু মনে রেখ– টেরমের!
আমি বললুম, সে কী! আমি তো ফের বন শহরে ফিরে যাব। এই নাও আমার ঠিকানা। সেখানে আমার খবর নিও। দু জনাতে ফুর্তি করা যাবে।
খুশি হয়ে উঠল। বললে, বড্ডই জরুরি কাজ তাই উকিল বসে আছে, এই রোববারেও, আমার জন্যে, টাকাটা না দিলে সোমবার দিন কিস্তি খেলাপ হবে।
আমি বললুম, ভগবান তোমার সঙ্গে থাকুন। বললে, যতদিন না আবার দেখা হয়।
দশ পা এগিয়েছি কি না, এমন সময় শুনি পিছন থেকে চেঁচিয়ে বলছে, ওই সামনের মোড় নিতেই দেখতে পাবে ডানদিকে এক-পাল ভেড়া চরছে। ওখানে কিন্তু দাড়িও না। ভেড়াগুলোকে সামলায় এক দজ্জাল আলসেশিয়ান কুকুর। ওর মনে যদি সন্দেহ হয়, তোমার কোনও কুমতলব আছে তবে বড় বিপদ হবে।
কথাটা আমার জানা ছিল, কিন্তু স্মরণ ছিল না। বললুম, অনেক ধন্যবাদ।
.
০৪.
ইউরোপ তখনও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর বর্ণনা সে মহাদেশের কবি, চিত্রকার, বস্তুত চিন্তাশীল তথা দরদি ব্যক্তি মাত্রেরই দেওয়া সত্ত্বেও বলতে হয়, না দেখলে তার আংশিক জ্ঞানও হয় না। তুলনা দিয়ে এদেশের ভাষায় বলা যেতে পারে, বন্যা ও ভূমিকম্পের মার যারা দেখেছেন তারাই জানেন এর জের দেশকে কতদিন ধরে টানতে হয়।
মোড় নিতেই দেখি, বাঁ দিকের ক্ষেতের ভিতর দিয়ে নাসপাতিভর্তি ঠেলাগাড়ি ঠেলতে ঠেলতে রাজ-আল ধরে আসছে একটি বয়স্ক লোক। সর্বপ্রথমই চোখে পড়ল, তার ডান হাতখানা কনুই অবধি নেই। হাতের আস্তিন ভাঁজ করে ঘাড়ের সঙ্গে পিন করা। বড় রাস্তায় সে উঠল ঠিক আমি যেখানে পৌঁছেছি সেখানেই। আমি প্রথমটায় ঞ্যসগট বলে তার অনুমতির অপেক্ষা না করেই গাড়িটায় এক হাত দিয়ে ঠেলতে লাগলুম। এ অভিবাদনে লোকটি প্রথম চাষার মতো মোটেই হকচকালো না, এবং প্রত্যুত্তর গ্রুগট বলে আর পাঁচজনেরই মতো গুটেন টাখ–সুদিবস জানালে। তার পর বললে, ও গাড়ি আমি একাই ঠেলতে পারি। নাসপাতিগুলোর প্রতি তোমার যদি লোভ হয়ে থাকে তবে অত হ্যাঁঙ্গামা পোহাতে হবে না–যত ইচ্ছে তুলে নাও। আমি এই অন্যায় অপবাদে চটিনি– পেলুম গভীর লজ্জা। কী যে বলব ঠিক করার পূর্বেই সে বললে, হাত না দিলেও দিতুম।আমি তখন মোকা পেয়ে বললুম, নাসপাতি খেতে আমি ভালোবাসি নিশ্চয়ই, এবং তোমারগুলো যে অসাধারণ সরেস সে বিষয়েও কোনও সন্দেহ নেই কিন্তু ঠেলা দেবার সময় আমার মনে কোনও মতলব ছিল না, এবং তুমিও যে স্বচ্ছন্দে ছোট রাস্তা থেকে বড় রাস্তার উঁচুতে গাড়িটাকে ঠেলে তুললে সেও আমি লক্ষ করেছি। আমি হাত দিয়েছিলুম এমনি। পাশাপাশি যাচ্ছি কথা বলতে বলতে যাব, তখন দু জনাই যে একই কাজ করতে করতে যাব সেই তো স্বাভাবিক– এতে সাহায্য লোভ কোনও কিছুরই কথা ওঠে না। চাষা হেসে বললে, তোমার রসবোধ নেই। আর তুমি জানো না, এবারে নাসপাতি এত অজস্র একইসঙ্গে পেকেছে যে এখন বাজারে এর দর অতি অল্পই। এই সামনের গ্রামগুলোর ভিতর দিয়ে যখন যাবে তখন দেখতে পাবে গাছতলায় নাসপাতি পড়ে আছে– কুড়িয়ে নিয়ে যাবার লোক নেই। যত ইচ্ছে খাও, কেউ কিছু বলবে না। আমি বললুম, আমাদের দেশেও এই রেওয়াজ। কোথায়, কোন দেশ, ইন্ডিয়ান আর রেড-ইন্ডিয়ানে পুনরায় সেই গুবলেট, তার পর আশ-কথা পাশ-কথা সেরে সর্বশেষে নিজেই বললে, তার হাতখানা গেছে গত যুদ্ধে। হেসে বললে, লোকে বলে, তারা করুণার পাত্র হতে চায় না; আমার কিন্তু তাতে কোনও আপত্তি নেই। হাত গিয়ে কত সুবিধে হয়েছে বলব। গেরস্তালির কোনও কিছু করতে গেলে বউ বেটি হা হা করে ঠেকায়, যদিও আমি এক হাত দিয়েই দুনিয়ার চোদ্দ আনা কাজ করতে পারি। চাষ-বাস, ফলের ব্যবসা, বাড়ি মেরামতি সবই তো করে যাচ্ছি– যদিও মেয়ে-জামাই ঠ্যাকাবার চেষ্টা করেছিল এবং শেষটায় করতে দিলে, হয়তো এই ভেবে যে কিছু না করতে পেরে আমি হন্যে হয়ে যাব।
