আমি নিজে কখনও খানদানি বাউণ্ডুলে বনে বাড়ি থেকে বেরোইনি। তবে হেঁটে, সাইক্রে, আঁধা-বোটে অর্থাৎ কোনও প্রকারের রাহা খরচা না করে হাই কিং করেছি বিস্তর।
আমি তখন রাইন নদীর পারে বন্ শহরে বাস করি। রাইনের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখবার জন্য পৃথিবীর লোক সেখানে প্লেজার স্টিমারে করে উজান-ভাটা করে। আমিও একবার করার পর আমার মনে বাসনা জাগল ওই অঞ্চলেই হাই করে রাইন তো দেখব দেখবই, সঙ্গে সঙ্গে ওই এলাকার গিরি-পর্বত, উপত্যকার ক্ষেত-খামার, গ্রামাঞ্চলের বাড়ি-ঘরদোর, নিরিবিলি গ্রাম্যজীবন সব-কিছুই দেখে নেব। আর যদি রাইন অঞ্চল ভালো না লাগে তবে চলে যাব যেদিকে খুশি।
আমার ল্যান্ডলেডিই আমাকে রাস্তা-দুরস্ত করে দিলে। মাথায় প্রকাণ্ড ঘেরের ছাতা-হ্যাট। পশমের পুরু শার্টের উপর চামড়ার কোট। চামড়ার শার্ট। সাইক্লোমোজা। ভারী বুটজুতো।
শব্দার্থে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা একটি হেভার-স্যাক। তার ভিতরে রান্নার সরঞ্জাম, অর্থাৎ অতি, অতি হাল্কা এবং পাতলা কিন্তু বেশ শক্ত এলুমিনিয়ামের সসপেন জাতীয় বস্তু, প্লেট, চামচে ছুরি-কাটা নিইনি– স্পিরিট স্টোভ এবং অত্যন্ত ছোট সাইজের বলে দু বার মাত্র হাঁড়ি চড়ানো যায় কয়েক গোলা চর্বি, কিঞ্চিৎ মাখন, নুন-লঙ্কা আর একটি রবারের বালিশ ফুঁ দিয়ে ফোলানো যায়।
আর বিশেষ কিছু ছিল বলে মনে পড়ছে না। এসবে আমার খরচা হয়েছিল অতি সামান্যই, বাড়ির একাধিক লোক এসব বস্তু একাধিকবার ব্যবহার করেছেন। এস্তেক কোট পাতলুনে একাধিক চামড়ার তালি! ল্যান্ড-লেডি বুঝিয়ে বললে, উকিলের গাউনের মতো এসব বস্তু যত পুরনো হয় ততই সে খানদানি ট্রাম্প!
পকেটে হাইনের বুখ ড্যার লিডার–কবিতার বই। কবি হাইনে বন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় এ বইয়ের কবিতাগুলো লিখেছিলেন। এতে রাইন নদী বার বার আত্মপ্রকাশ করেছে।
রবির অতি ভোরে গির্জার প্রথম ম্যাসে হাজিরা দিয়ে রাস্তায় নামলুম।
.
০৩.
একটা কোঁৎকা ছাড়া হাইকিঙে বেরোতে নেই। অবশ্য সর্বক্ষণ সদর রাস্তার উপর দিয়ে চলতে তার বড় প্রয়োজন হয় না, কিন্তু সদর রাস্তার দুপাশে আলুক্ষেত, আপেল বাগান থাকে না, লোকজন যারা থাকে তারাও ট্রাম্প ভিখিরি পছন্দ করে না। পিঠের ব্যাগটা খালি হয়ে গেলে সেটা বিন্-খরচায় ভরে নিতে হলে অজ পাড়াগাঁই প্রশস্ততম।
কিন্তু যত প্রচণ্ড শিক্ষিত দেশই হোক না কেন, পাড়াগাঁয়ে দু-একটা বদ-মেজাজি কুকুর থাকবে এবং তারা পয়লা নম্বরের মব। ছিমছাম ফিটফাট সুট পরে গটগট করে চলে যান কিছুটি বলবে না। কিন্তু আপনি বেরিয়েছেন হাইকিঙে যতই ফিটফাট হয়ে বাড়ি থেকে বেরোন না কেন, লজঝড় কাক বক তাড়ানোর স্কেয়ারক্রো বনে যেতে আপনার দু দিনও লাগবে না। দু দিন কেন, গাছতলায় একরাত কাটানোর পর সকালবেলাই সুটমুটের যে চেহারা হয় তার মিল অনেকটা ভ্যাগাবন্ড চার্লিরই মতো, এবং ওই সব কুকুরগুলো তখন ভাবে, আপনাকে ভগবান নির্মাণ করেছেন নিছক তাদের ডিনার-লাঞ্চের মাংস যোগাবার জন্য সিঙিকে যেমন হরিণ দিয়েছেন, বাঘকে যেরকম শুয়ার দিয়েছেন। পেছনে থেকে হঠাৎ কামড় মেরে আপনার পায়ের ডিম কী করে সরানো যায় সেই তাদের একমাত্র উচ্চাভিলাষ। ওটাতে আপনারও যে কোনও প্রয়োজন থাকতে পারে সে বিষয়ে ওরা সম্পূর্ণ উদাসীন।
আমার ল্যান্ড-লেডি হাতে লাঠি তুলে দিতে দিতে বললে, এক জর্মন গিয়েছে ঘোর শীতে স্পেনে। স্পেনের গ্রামাঞ্চল যে বিশ্বসারমেয়ের ইউনাইটেড নেশন সেটা ভদ্রলোক জানতেন না। তারই গণ্ডা তিনেক তাঁকে দিয়েছে হুড়ো। ভদ্রলোক আর কিছু না পেয়ে রাস্তা থেকে পাথর কুড়োতে গিয়ে দেখেন সেগুলো জমিতে জোর সেঁটে রয়েছে– আসলে হয়েছে কী, শীতে জল জমে বরফের ভিতর সেগুলো মোক্ষম আটকে গেছে। ভদ্রলোক খাঁটি গ্লোব-ট্রটারের মতো আত্মচিন্তা করলেন, অদ্ভুত দেশ! কুকুরগুলোকে এরা রাস্তায় ছেড়ে দেয়, আর পাথরগুলোকে চেন দিয়ে বেঁধে রাখে।
ল্যান্ড-লেডিকে বলতে হল না– আমি বিলক্ষণ জানতুম, তদুপরি আমার শ্যাম-মনোহর বর্ণটি অষ্টাচক্র স্কন্ধ-কটি দ্রাভদ্র যে-কোনও সারমেয় সন্তানই এই ভিনদেশি চিজটিকে তাড়া লাগানো একাধারে কর্তব্যকর্ম সম্পাদন এবং আয়বর্ধন রূপে ধরে নেবে– লক্ষ করেননি চীনেম্যান আমাদের গাঁয়ে ঢুকলে কী হয়?
কোঁৎকাটা ঠুকতে ঠুকতে শহর ছেড়ে মেঠো পথে নামলুম।
খৃস্টান দেশে রোববারে ক্ষেতখামারের কাজও ক্ষান্ত থাকে। পথের দু ধারের ফসল ক্ষেতে জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই। রাস্তায়ও মাত্র দু-একটি লোকের সঙ্গে অনেকক্ষণ চলার পর দেখা হল। তারাও গ্রামের লোক বলে হ্যাট তুলে গুটেনটা বা গুটেন মর্গেন (শুভদিন বা শুভ দিবস) বলে আমাকে অভিবাদন জানায়। বিহার মধ্যপ্রদেশের গ্রামাঞ্চলেও ঠিক এইরকম অপরিচিত জনকেও রাম রাম বলে অভিবাদন করার পদ্ধতি আছে। কাবুলে তারও বাড়া। একবার আমি শহরের বাইরের উপত্যকায় বেড়াতে গিয়েছিলুম। রাস্তা প্রায় জনমানবহীন। বিরাট শিলওয়ার এবং বিরাটতর পাগড়ি-পরা মাত্র একটি কাবুলি ধীরে মন্থরে চলেছে–গ্রামের লোক শহুরেদের তুলনায় হাঁটে অতি মন্থরগমনে এবং তার চেয়ে মন্দ গতিতে চলে যারা একদম পাহাড়ের উপর থাকে। তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি তাকে ধরে ফেললুম। ঘাড় ফিরিয়ে অলস কৌতূহলে আমার দিকে তাকিয়ে, ভালো তো? কুশল তো? শুধিয়েই আমার দিকে একগুচ্ছ স্যালাড পাতা এগিয়ে দিলে। এস্থলে এটিকেট কী বলে জানিনে আমি একটি পাতা তুলে নিলুম। তখন এগিয়ে দিলে বাঁ হাতের পাতার ঠোঙাটি। সেটাতে দেখি হলদে-লালচে রঙের ঘন কী পদার্থ। আমি বোকার মতো তাকিয়ে আছি দেখে সে নিজে একখানা স্যালাড পাতা নিয়ে ওই তরল পদার্থে শুত্তা মেরে মুখে পুরে চিবোতে লাগল। আমিও করলুম। দেখি, জিনিসটা মধু এবং অত্যুত্তম মধু। ওই প্রথম শিখলুম, কাবুলিরা তেল-নুন-সিরকা দিয়ে স্যালাড পাতা খায় না, খায় মধু দিয়ে। কিন্তু সেটা আসল কথা নয়, মোদ্দা কথা দেহাতি কাবুলি যদি কিছু খেতে খেতে রাস্তা দিয়ে চলে তবে পরিচিত অপরিচিত সবাইকে তার হিস্যা এগিয়ে দেবেই দেবে। এবং স্ট্রিক্টলি ব্রাদারলি ডিভিজ– অর্থাৎ আমার একখানা পাতা চিবানো শেষ হতে না হতেই আরেকখানা পাতা এবং মধুভাণ্ড এগিয়ে দেয়। পরে গ্রামে ঢোকা মাত্রই সে আমাকে এক চায়ের দোকানে টেনে নিয়ে যায় এবং দাম দেবার জন্য আখেরে বিস্তর ধস্তাধস্তি করে। কিন্তু থাক সেকথা– এটা আছে কাবুলে ভবঘুরেমি অনুচ্ছেদে।
