তোমরা ওঁর গায়ে হাত দিও না।
কতখানি বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর যুক্তিবাদের ফলে, কতখানি তার সৌম্য দর্শন শান্ত বচনের ফলে মারমুখো সন্ন্যাসীরা ঠাণ্ডা হল বলা কঠিন।
বাঁড়ুয্যে সে যাত্রায় বেঁচে গেল।
দু-তিন স্টেশন পরই সন্ন্যাসীরা নেমে গেল ওই বৃদ্ধ ছাড়া।
তখন তিনি বাড়জ্যেকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, বাবুজি এ যাত্রায় ভগবানের দয়ায় বেঁচে গেছ, ভবিষ্যতে সাবধান হয়ো।
***
সেই থেকে ওই বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর সন্ধান আমি প্রতি তীর্থেই করি। উনি যদি একবার আমার গৃহিণীকে বুঝিয়ে দেন, আমিও একটা অবধূত-টবধূত তা হলে ওর খাই-বায়নাক্কা-নথ ঝামটা থেকে নিষ্কৃতি পাই। দশটা মারমুখো সন্ন্যাসীকে ঠাণ্ডা করতে পারলেন আর ওকে পারবেন না? কী জানি!
***
ভবঘুরে সব দেশেই আছে কিন্তু শীত এলেই ইয়োরোপের ভবঘুরেদের সর্বনাশ। ওই জমাট বরফের শীতে বাইরে শোওয়া অসম্ভব। যদি-বা কেউ পার্কের বেঞ্চের উপরে খবর কাগজ পেতে (এই খবরের কাগজ সত্যি শরীরটাকে খুব গরম রাখে; হিমালয়ের চটিতে যদি দু খানা কম্বলেও শীত না ভাঙে তবে কম্বলের উপর পা থেকে মাথা পর্যন্ত কয়েকখানা খবরের কাগজের শিট সন্তর্পণে বিছিয়ে নেবেন। আমি কোনও কোনও খানদানি ট্রাম্পকে বুকে-পিঠে খবরের কাগজ জড়িয়ে তার উপর ভেঁড়া শার্ট পরতে দেখেছি) শোবার চেষ্টা করে তবে বেদরদ পুলিশ এসে লাগায় হুনো। প্যারিসে তখন কেউ কেউ আশ্রয় নেয় নদীর কোনও একটা ব্রিজের তলায় শুকনো ডাঙায়। সেখানেও সকালবেলা পুলিশ আবিষ্কার করে শীতে জমে গিয়ে মরা ট্রাম্প। পাশে দু-একটা মরা চড়ই। গরমের আশায় মানুষের শরীরের কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। গর্কি না কার যেন লেখাতে পড়েছি, এক ট্রাম্প ছোকরাকে সমস্ত রাত জড়িয়ে ধরে একটি ট্রাম্প মেয়ে সমস্ত রাত কাটিয়ে যে যার পথে কিংবা বিপথেও বলতে পারেন– চলে গেল। (এদেশে বর্ষাকালে তাই বুদ্ধদেবও সন্ন্যাসীর সঙ্গে আশ্রয় নিতে আদেশ দিয়ে গেছেন)।
এই বিপথে কথাটার ওপর আমি জোর দিতে চাই। গ্লোব-ট্রটার জীবটি আদপেই ভবঘুরে নয়– যদিও একটা শব্দ যেন আরেকটা শব্দের অনুবাদ। গ্লোবট্রটার সমুখ পানে এগিয়ে চলে, তার নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থল আছে। ভবঘুরে যেখানে খুশি দু-চারদিন এমনকি দু-চার মাসও স্বচ্ছন্দে কাটায়। এমনকি কোনও দয়াশীলের আশ্রয়ে সুখেও কাটায়। কিন্তু হঠাৎ একদিন বলা-নেই-কওয়া-নেই, হুট করে নেবে যায় রাস্তায়। কেন? কেউ জানে না। ওরা নিজেরাই জানে না। শুধু এইটুকু বলা যায়, সুখের নীড় তাদের বেশিদিন সয় না–নামে দুঃখের পথে; আবার দুঃখের পথে চলতে চলতে সন্ধান করে একটু সুখের আশ্রয়। দুটোই তার চাই, আর কোনওটাই তার চাইনে। এ বড় সৃষ্টিছাড়া দ্বন্দ্ব সৃষ্টিছাড়াদের।
যাদের ভিতরে গোপনে চুরি করার রোগ ঘাপটি মেরে বসে আছে ওটাকে সত্যই দৈহিক রোগের মতো মানসিক রোগ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে বলে এটার নাম ক্লেপ্টোমেনিয়া– তাদের জন্য আমাদের শাস্ত্রকাররা বৎসরে একদিন চুরি করার– তা-ও ফলমূল মাত্র– অনুমতি দিয়েছেন। ওটা যেন একজস্ট পাইপ। ঠিক তেমনি হোলির দিন একটুখানি বেএক্তেয়ার হওয়ার অনুমতি কর্তারা আমাদের দিয়েছে। এটাও অন্য আরেক ধরনের এক্সস্ট পাইপ।
জর্মন জাতটা একটু চিন্তাশীল। তারা স্থির করলে এই বাউণ্ডুলেপনা যাদের রক্তে ঘাপটি মেরে বসে আছে এদের নাম ভান্ডার-ফ্যোগোল অর্থাৎ ওয়ান্ডারিং বার্ডস অর্থাৎ উড়ন্ধু পাখি– তাদের জন্য জায়গায় জায়গায় অতিশয় সস্তায় রেস্ট হাউস করে দাও, সেখানে তারা নিজে বেঁধে খেতে পারবে, যদি অতি সস্তায় তৈয়ারি খানা খায় তবে বাসন বর্তন মেজে দিতে হবে, যদি ফ্রি বালিশের ওয়াড় বিছানার চাদর চায় তবে সেগুলো কিংবা আগের রাত্রে অন্য কারওর ব্যবহার করা বাসি ওয়াড়-চাদর কেচে দিতে হবে যাতে করে, ইচ্ছে করলে, সে অতি ভোরেই ফের রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে পারে। ওদের রান্নাঘরে নিজের আলমালু সেদ্ধ করে খেলে আর চাদর ওয়াড় না চাইলে রাত্রি-বাস একদম ফ্রি।
উড়ুক্কু পাখিরা অনেক সময় দল বেঁধে বেরোয়; সঙ্গে রান্নাবান্নার জিনিস এবং বিশেষ করে বাজনার যন্ত্র–ৎসি হারমনিকা (হাত অর্গিন) ব্যাঞ্জো, মান্ডলিন। ওই সব রেস্ট হাউসের কমন রুমে তারা গাওয়া-বাজনা নাচানাচি করে সমস্ত রাত কাটাত। অনেকেই শনির দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোমের সকালে বাড়ি ফিরত। কেউ কেউ পুরো গরমের ছুটি, কেউ কেউ দীর্ঘতর অনির্দিষ্টকাল।
এ-সব আমার শোনা কথা। নিজের অভিজ্ঞতা পরে বলব।
রাস্তায় ট্রাম্পকে অনেকেই লিফ্ট দেয়। জোড়া পাখি যদি হয় তবে লিফট পাওয়া আরও সোজা, একটু কৌশল করলেই। ছেলেটা দাঁড়ায় গাছের আড়ালে। মেয়েটা ফ্রক হাঁটু পর্যন্ত তুলে গার্টার ফিট করার ভান করে সুডৌল পা-টি দেখায়। রসিক নটবর গাড়ি থামিয়ে মধুর হেসে দরজা খোলেন। ছোকরা তখন আড়াল থেকে আস্তে আস্তে এসে পিছনে দাঁড়ায়, নটবর তখন ব্যাক-আউট করেন কী করে? করলেও দৈবাৎ। যে উড়ন্ধু পক্ষিণী আমাকে গল্পটি বলেছিল তার পা-টি ছিল সত্যই সুন্দর। তা সে যাকগে।
অনেকেই আবার লিফট দিতে ডরায়। তাদের বিরুদ্ধে নিম্নের গল্পটি প্রচলিত :
কুখ্যাত ডার্টমুর জেলের সামনে সদ্য খালাসপ্রাপ্ত দু জন কয়েদি লিফটের জন্য হাত তুলছে। যে ভদ্রলোক মোটর দাঁড় করালেন তিনি কাছে এসে যখন বুঝতে পারলেন এরা কয়েদি তখন গড়িমসি করতে লাগলেন। তারা অনেক কাকুতি-মিনতি করে বোঝালে তারা সামান্য চোর– খুনিটুনি নয়। সামনে টাউনে পৌঁছে দিলেই বাস ধরে রাতারাতি বাড়ি পৌঁছতে পারবে। ভদ্রলোক অনেকটা অনিচ্ছায়ই রাজি হলেন। পরের টাউনে ভদ্রলোকেরও বাড়ি। পরের টাউনে পৌঁছতেই লাইটিং টাইম হয়ে গিয়েছে। ওদিকে ওঁর হেডলাইট ছিল খারাপ। পড়লেন ধরা। পুলিশ ফুটবোর্ডে পা রেখে নম্বর টুকে হিপ পকেটে নোটবুকখানা রেখে দিয়ে চলে গেল। ভদ্রলোক আপসোস করে বললেন, তোমাদের সঙ্গে কথা কইতে যে তিন মিনিট বাজে খরচা হল সেটা না করলে এতক্ষণ আমি বাড়ি পৌঁছে যেতুম। এখন পুলিশ কোর্টে আমার জেরবার হয়ে যাবে। লোকে কি আর সাধে বলে কারও উপকার করতে নেই। দুই খালাস পাওয়া কয়েদি হাসতে হাসতে গাড়ি থেকে নামার সময় বললে, আপনার কিছু ভয় নেই, হুজুর, আপনার নামে কোনও সমন আসবে না। এই নিন সেই পুলিশের নোটবুক যাতে আপনার গাড়ির নম্বর টোকা ছিল। আমরা পুলিশের পকেট তখনই পিক করেছি। আসলে পকেট মেরেই ধরা পড়াতে আমাদের জেল হয়েছিল। আপনি আমাদের উপকার করতে গিয়ে বিপদে পড়বেন, এটা আমরা দাঁড়িয়ে দেখি কী প্রকারে বলুন।
