পূর্বেই বলেছি, এহেন সৃষ্টিছাড়া কর্মের জন্য সন্ন্যাসী বেশ প্রশস্ততম। হিন্দু-মুসলমান টিকিট-চেকারের কথা বাদ দিন, সে যুগের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান স্টুদে চেকার পর্যন্ত মিন টিকিটের গেরুয়াকে ট্রেন থেকে নামাত না–বিড়বিড় করতে আমিই একাধিকবার শুনেছি, গড ড্যাম হোলি ম্যান নাথিং ডুইং। অর্থাৎ ওটা খোদার খাসি, কিচ্ছুটি করার যো নেই।
আমাদের বাঁড়ুয্যে ছোকরাটি অতিশয় চৌকশ তালেবর। দুটি উইক-এন্ডের বাউণ্ডুলিপনা করতে না করতেই আবিষ্কার করে ফেললে এই হৃদয়-রঞ্জন তথ্যটি– সঙ্গে সঙ্গে তার পায়ের চক্কর দুটি টাইমপিসের ছেঁড়া স্প্রিংয়ের মতো ছিটকে তার পা দুটিকেও ছাড়িয়ে গেল। বিশেষ করে যেদিন খবর পেল, সৌরাষ্ট্রের বীরমগাম ওয়াচওয়ান থেকে আরম্ভ করে ভাওনগর দ্বারকাতীর্থ অবধি বহু ট্রেনে একটি ইম্পিশেল কামরা থাকে যার নাম মেন্ডিকেট কম্পার্টমেন্ট, গেরুয়া পরা থাকলেই সে কামরায় মিন-টিকিটে উঠতে দেয়। সেখানে নাকি সাধু-সন্ন্যাসীরা আপসে নির্বিঘ্নে আত্মচিন্তা ধর্মচিন্তা পরব্রহ্মে মনোনিবেশ করতে পারেন। তবে নেহাত বেলেল্লা নাস্তিকদের মুখে শুনেছি সেখানে নাকি বিশেষ এক ধোয়ার গন্ধ এমনই প্রচণ্ড যে কাগে বগে সেখান থেকে বাপ-বাপ করে পালায়– দুষ্টেরা আরও বাঁকা হাসি হেসে বলে আসলে নিরীহ প্যাসেঞ্জারদের ওই কৈবল্য ধূম্রের উৎপাত থেকে বাঁচানোর জন্য ওই খয়রাতি মেডিকেন্ট কম্পার্টমেন্টের উৎপত্তি। কিন্তু আমাদের বাঁড়ুয্যে তার থোড়াই পরোয়া করে– আসলে সে খাস দর্জি-পাড়ার ছেলে, বাবা-ছোকরা বয়েস থেকে বিস্তর ইটালিয়ান (অর্থাৎ হঁটের উপরে বসে) ছিলিম-ফাটানো দেখেছে, দু-চার কাচ্চা যে নাকে ঢোকেনি সে-কথাও কসম খেয়ে অস্বীকার করতে সে নারাজ। দু আ ভূ আ না করে বাঁড়ুয্যে তদ্দশ্যেই ধুতিখানি গেরুয়া রঙে ছুপিয়ে মাদ্রাজি প্যাটার্নে লুঙ্গিপানা করে পরল, বাসন্তী রঙ করাতে গিয়ে গেরুয়াতে জাতান্তরিত তার একখানি উড়ুনি আগের থেকেই ছিল। ব্যোম ভোলানাথ বলতে বলতে বাঁড়ুয্যে চাপল মেডিকেন্ট কম্পার্টমেন্টে। বাবাজি চলেছেন সোমনাথ দর্শনে।
আমাদের বাঁড়ুয্যে কিপটে নয়, মিন-টিকিটে চড়ার পরও তার ট্র্যাকে ছুঁচোর নেত্য। তাই আহারাদিতেও তাকে হাত টেনে হাত বাড়াতে হত পয়সা দিতে। তাই ওই ব্যাপারে রিট্রেঞ্চমেন্ট করতে গিয়ে সে আবিষ্কার করল আরেকটি তথ্য– পুরি তরকারি, দহি-বড়া শিঙাড়ার চেয়ে শিককাবাব ঢের সস্তা, পোস্টাইও বটে। এক পেট পরোটা-শিককাবাব খেয়ে নিলে শুবো-শাম ত্রিযামা-যামিনী নিশ্চিন্তি।
গোস্ত-রোটি কাবাব-রোটি যেই না ফেরিওয়ালা দিয়েছে হক অমনি বাঁড়ুয্যে তিন লক্ষে দরজার কাছে এসে তাকে দিল ডাক। লোকটা প্রথমে কেমন যেন হকচকিয়ে গেল।– আসতে চাইল না। বাঁড়ুয্যে ঘন ঘন ডাকে, আরে দেখতে নাহি পারতা হায়, হাম তুমকো ডাকতে ডাকতে গলা ফাটাতা হায়– সে-হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা না বলে লোষ্ট্রভাষা বলাই উচিত। এক-একটি লজো যেন হঁটের থান।
ফেরিওলা কাছে এসে কাঁচুমাচু হয়ে হিন্দি গুজরাতিতে বুঝিয়ে বললে, সাধুজি এ তোমার খাওয়ার জিনিস নয়। বাঁড়ুয্যে গেল চটে। সে কি এতই অগা যে জানে না, শিক-কাবাব কোন অখাদ্য চতুষ্পদ থেকে তৈরি হয়। তেড়ে বললে, হাম ক্যা খাতা হায়, নাহি খাতা হায়, তোমার ক্যা ভেটকি-লোচন? ফেরিওলা তর্ক না করে স্পষ্ট বোঝা গেল অনিচ্ছায় কাবাব-রুটি দিয়ে পয়সাগুলো শুনেই ধামাতে ফেলে চলে গেল।
ট্রেন ছেড়েছে। বাঁড়ুয্যে কাবাব-রুটি মুখে দিতে গিয়েছে– লক্ষ করেনি, কামরার থমথমে ভাবটা। এমন সময় দশা হেঁড়ে গলায় একসঙ্গে হুঙ্কার উঠল, এই শালা, ক্যা খাতা হৈঃ।
প্রথমটায় বাঁড়ুয্যে বুঝতে পারেনি। আস্তে আস্তে তার চৈতন্যোদয় হতে লাগল সন্ন্যাসীদের প্রাণঘাতী চিল্কারের ফলে। শালা পাষণ্ড, নাস্তিক। অখ্যাদ খায়, ওদিকে ধরেছে গেরুয়া। চোর ডাকাত কিংবা খুনিও হতে পারে। ফেরার হয়ে ধরেছে ভেক। এই করেই তো সাধু-সন্ন্যাসীদের বদনাম হয়েছে, যে তাদের কেউ কেউ আসলে ফেরারি আসামি।
বাঁড়ুয্যে কী করে বলে সে জানত না, ওটা অখাদ্য। একে মাংস, তায়—ওদিকে ওরা ফেরিওলাতে-বাঁড়ুয্যেতে যে কথা কাটাকাটি হয়েছে সেটা যে ভালো করেই শুনেছে, তা-ও ওদের কথা থেকে পরিষ্কার বোঝা গেল।
ওদিকে সন্ন্যাসীরা এক বাক্যে স্থির করে ফেলেছে, এই নরপশুকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে এর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করানো হোক। দু-একটা ষণ্ডা তার দিকে তখন এগিয়ে আসছে।
বাঁড়ুয্যের মনের অবস্থা কল্পনা করুন। চেন টানার ব্যবস্থা থাকলেও সেদিকেও দুশমনদের ভিড়। সে বিকল অবশ। এরকম অবশ্য-মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছে কটা লোক?
একজন তার দু বাহুতে হাত দিয়ে ধরতেই কম্পার্টমেন্টের এককোণ থেকে হুঙ্কার এল, ঠরো। সবাই সেদিকে তাকালে। এক অতি বৃদ্ধ সন্ন্যাসী উপরের দিকে হাত তুলেছেন। ইনি এতক্ষণ এদের আলোচনায় যোগ দেননি।
বললেন, সাধুরা সব শোনো৷ এঁর গায়ে হাত তুলো না। ইনি কী ধরনের সন্ন্যাসী তোমরা জান না। উনি যে দেশ থেকে এসেছেন সেদেশের এক জাতের সন্ন্যাসীকে সব কিছু খেতে হয়, লজ্জা ঘৃণা ভয় ওঁদের ত্যাগ করতে হয়। শুধু ত্যাগ নয়, সানন্দে গ্রহণ করতে হয়। ইনি সেই শ্রেণির সন্ন্যাসী। তোমরা তো জানো না, সন্ন্যাসের গুরু বুদ্ধদেব শুয়োরের মাংস খেয়ে নির্বাণ লাভ করেছিলেন। একে একদিন ওই পর্যায়ে উঠতে হবে। মৃত্যু ভয় এর নেই। দেখলে না উনি এখন পর্যন্ত একটি শব্দ মাত্র করেননি। ঘৃণা এবং ভয় থেকে উনি মুক্ত হয়েছেন। বোধহয় একমাত্র লজ্জাজয়টি এখনও তার হয়নি। তাই এখনও পরনে লজ্জাবরণ। সে-ও তিনি একদিন জয় করবেন।
