স্থলপথে আরবরা, ইরান আফগানিস্তান জয় করে। জলপথে সিন্ধুদেশ। এছাড়া সমুদ্রপথে যারা বাণিজ্য করতে ছড়িয়ে পড়ল তাদের নিয়েই আজ আমার আলোচনা। এরা প্রথমে সোকোত্রা (সংস্কৃত দ্বীপ সুখদ্বার–এডেনের কাছেই) তার পর মালদ্বীপ লাক্ষাদ্বীপে ইসলাম প্রচার করে। দক্ষিণ ভারতে পারেনি, (পুব বাঙলার কথা পরে হবে), বর্ষায় পারেনি, মালয় ও ইন্দোনেশিয়ায় পেরেছিল।
হিন্দুদের সমুদ্রযাত্রা কেন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল আমি ঠিক জানিনে, তবে যারা বৌদ্ধদের পরাস্ত করে হিন্দুধর্ম পূনর্জীবিত করেছিলেন তারা হয়তো চাননি যে সাগরপারের বৌদ্ধদের সঙ্গে আমাদের কোনও যোগসূত্র থাক–যার ফলে আবার একদিন বৌদ্ধধর্ম মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।
তা সে যাই হোক, অষ্টম নবম শতাব্দীতে পুব বাঙলার মাল্লা-মাঝি, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ীদের দুরবস্থা চরমে। আজও যে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, সিলেটের মাঝি-মাল্লারা দুনিয়ার সর্বত্র ঘুরে বেড়ায় (আজ তারা আবার ইংলন্ডে বসতি স্থাপন করতে আরম্ভ করেছে, প্লেন চার্টার করে পুব বাঙলায় বেড়াতে আসে) এটা কিছু নতুন নয়। হিন্দু বৌদ্ধ যুগে এরাই বাঙলার তাবৎ এবং পুব ভারতের প্রচুর মাল আমদানি-রপ্তানি করেছে, নৌ-নির্মাণ ও নৌবহর চালিয়েছিল বটেই।
সমুদ্রযাত্রা নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে প্রধানত এরাই হল অন্নহীন।
আরব ভৌগোলিক (ও ঐতিহাসিকরা) বলেন, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতেই (অর্থাৎ বখতিয়ার খিলজির বহু পূর্বেই) আরবরা চট্টগ্রামে উপনিবেশ স্থাপন করেছে ও এ বন্দরেই সবকিছু সংগ্রহ করে (হিন্দুরা তো যাবে না) দক্ষিণ-পুবেও ছড়িয়ে পড়ত।
আরবি ভাষাতে চ ও গ অক্ষর নেই। ট ত-তেও পার্থক্য নেই। সেই হয়েছে বিপদ। তদুপরি নকলনবিশদের ভুল-ত্রুটি তো আছেই। কাজেই যদি-বা চট্টগ্রাম শব্দটি বোঝা যায়, তবু পরবর্তী যুগে এরা সপ্তগ্রাম ও সোনার গাঁ-র সঙ্গেও এটা ঘুলিয়ে গিয়েছে। তারও পরবর্তী যুগের পর্তুগিজরা তাই চট্টগ্রামের উল্লেখ করতে পোর্টে গ্রান্ডে (বড় বন্দর) ও সপ্তগ্রামকে পোর্টে পিক্কোনে (ছোট বন্দর) বলে। [ এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে বর্তমান ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের সমুদ্রতটেই আরবরা বসতি স্থাপন করেন সিলেটের সঙ্গে জলপথের যাতায়াত আরও সহজ ছিল। এরাই মিশনারি এবং বণিক একাধারে। এরাই অষ্টম নবম শতাব্দীতে, একদা যারা মাঝি-মাল্লা ছিল, সেইসব হিন্দুদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করতে আরম্ভ করে। এ তত্ত্বটা মেনে নিলে অষ্টাদশ অশ্বারোহী বঙ্গ জয় অন্য দৃষ্টিতে দেখা যায়। কিন্তু তার জন্য নতুন অধ্যায় প্রয়োজন।
বাচুভাই শুক্ল
বরোদা-আহমদাবাদ-বোম্বাই করছি, আর বার বার মনে পড়ছে, স্বৰ্গত বাচুভাই শুল্কের কথা। ইনি রবীন্দ্রনাথের অতি প্রিয় শিষ্য ছিলেন।
১৯২১ বিশ্বভারতীয় কলেজ-(উত্তর)-বিভাগ খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সেই সুদূর সৌরাষ্ট্র থেকে এসে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের পদপ্রান্তে আসন নেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে যে দু জন বিশ্বভারতীর শেষ পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে উপাধি লাভ করেন, ইনি তারই একজন। বিশ্বভারতীর সর্বপ্রথম সমাবর্তন উৎসব হয় ১৯২৭। বাচুভাই রবীন্দ্রনাথের হাত থেকে তার উপাধি-পত্র গ্রহণ করেন। শুনেছি স্বয়ং নন্দলাল সে উপাধি-পত্রের পরিকল্পনা ও চিত্রকর্ম করেছিলেন। পরবর্তী যুগে তিনি গুজরাতি ভাষায় রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুবাদকরূপে খ্যাতি লাভ করেন।
দাড়িগোঁফ গজাবার চিহ্নমাত্র নেই– সেই সুদূর কাঠিয়াওয়াড় থেকে এসে ছোকরাটি সিট পেল সত্য-কুটিরে। কয়েক দিন যেতে না যেতেই তার হল টাইফয়েড। বাসুদেব বিশ্বনাথ গোখলে ও আমি তাকে আমাদের কামরায় নিয়ে এলুম। সেই তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯২১ সালে। তার পর ১৯৫৭ সালে তার অকালমৃত্যুর দিন পর্যন্ত আমাদের যোগসূত্র কখনও ছিন্ন হয়নি।
তাঁর গুরু ছিলেন মার্ক কলিন্স। তাঁর কাছে বাচুভাই উপাধি লাভ করার পরও দীর্ঘ সাত বৎসর তুলনাত্মক ভাষাতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন। আমিও কলিনসের শিষ্য। তাই তার কিঞ্চিৎ পরিচয় দিই। ইনি জাতে আইরিশ, শিক্ষা লাভ করেন অক্সফোর্ড ও জনির লাইপসিগে। এই বছর দুই পূর্বে লাইৎসিগ বিশ্ববিদ্যালয় তার কোনও পরব উপলক্ষে মালমশলা যোগাড় করতে গিয়ে বিশ্বভারতাঁকে প্রশ্ন করে পাঠায়, কলিনস এখানে কী কী কাজ করে গেছেন। অর্থাৎ ছাত্র হিসেবেই তিনি সেখানে এত খ্যাতি অর্জন করেছিলেন যে পরবর্তী যুগের অধ্যাপকের তাঁর কীর্তি-কলাপের সন্ধানে এদেশেও তার খবর নিতে উদগ্রীব হয়েছিলেন। কেউ দশটা ভাষা জানে, কেউ বিশটা জানে একথা শুনলে আমি কণামাত্র বিচলিত হইনে, কারণ মার্সেই, পোর্ট সঈদ, সিঙ্গাপুরের দালাল-দোভাষীরাও দশভাষী, বিশভাষী। কিন্তু কলিন ছিলেন সত্যকার ভাষার জহুরি। এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে, তিনি আমাকে তুর্কি ভাষায় বাবুরের আত্মজীবনী অনুবাদ করে করে শুনিয়েছেন, শেলির প্রমিথিয়ুস আনবাউন্ড পড়াবার সময় ইস্কিলাসের গ্রিক প্রমিথিয়ুস থেকে মুখস্থ বলে গেছেন, আমি তাকে একখানা আরবি স্থাপত্যের বই দেখাতে তিনি তার ছবিতে কুফি-আরবিতে লেখা ইনস্ক্রিপশন অনুবাদ করে করে শুনিয়েছিলেন। তার সঙ্গে মাত্র এইটুকু যোগ করি, আমার জীবনের সেই তিন বৎসরে আমি কখনও গুরু কলিকে কোনও প্রাচীন অর্বাচীন চেনা-অচেনা ভাষার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে শুনিনি, আমি তো এ ভাষা জানিনে–অবশ্য সে-সব ভাষারই কথা হচ্ছে যার যে-কোনও একটা একজন লোকও পড়তে পারে।
