মুসলমান বাদশারা কতখানি সাহায্য করেছিলেন? আমার বিশ্বাস, অল্পই। যেখানে শুধুমাত্র অস্ত্রবলে বিধর্মী এসে রাজ্য স্থাপন করে পূর্বে যেখানে বিজয়ীর আপন ধর্মীয় কেউ ছিল ণা– সে সেখানে যদি প্রজার ধর্মে হস্তক্ষেপ করে তবে তাকে বেশিদিন রাজত্ব করতে হয়। পূর্ব বাঙলায় পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। রাজারা পূর্ব-দীক্ষিত মুসলমানদের সুখ-সুবিধা দিয়ে প্রতিবেশী হিন্দুকে আকৃষ্ট করতে পারতেন।
কু দ্য পালে (রাজপ্রাসাদে হঠাৎ রাজাকে সরানো), কু দেতা (দেশে হঠাৎ সশস্ত্র বা বেআইনি রাষ্ট্র পরিবর্তন) এ ফরাসি কথাগুলো আমাদের কাছে এখন সুপরিচিত। বিশেষ করে সুয়েজ থেকে আরম্ভ করে চীন পর্যন্ত এ ঘটনা এখন নিত্য নিত্য হচ্ছে।
বখতিয়ার খিলজি অষ্টাদশ অশ্বারোহী নিয়ে করেছিলেন, কু দ্য পালে। সেটা কিছু অসম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন, পরদিনই রাজার সৈন্যরা এসে লড়াই দিল না কেন?
তবে কি জনসাধারণ, সৈন্যদল রাজার আচরণে অসন্তুষ্ট ছিল? কোনও কোনও ঐতিহাসিক সে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর দৃষ্টান্তও আছে। আরবের মুষ্টিমেয় প্রথম সৈন্যবাহিনী যখন মরুভূমি অতিক্রম করে মহাপরাক্রান্ত ইরান-রাজকে আক্রমণ করল তখন সেই বিরাট শক্তিশালী রাজবাহিনী অতিশয় অনিচ্ছায় যুদ্ধে নামল। আরবরা বিজয়ী হল। ইয়োরোপীয় ঐতিহাসিকরা বলছেন, ইরানে তার পূর্বেই খবর রটে গিয়েছে, হজরত মুহম্মদ নামীয় এক আরব মহাপুরুষ হ্যাভনট, নিঃস্বদের জন্য নতুন আশার বাণী নিয়ে এসেছেন। এরা সে ধর্মে বিশ্বাসী।
আমার প্রশ্ন, তবে কি পুব বাঙলার মুসলমান তখন অসন্তুষ্ট জনসাধারণের মধ্যে হজরতের বাণী হোক আর না-ই হোক, খিলজিকে পরিত্রাণকর্তারূপে, কিংবা যে-কোনও মুসলমান অভিযানকারীকে ওইরূপে অঙ্কিত করে এমনই আবহাওয়ার সৃষ্টি করে রেখেছিল যে খিলজি তার কু দ্য পালেকে পরে কু দেতাতে পরিবর্তন করতে পেরেছিলেন? ॥
বাঙলা দেশ
কতকগুলি প্রশ্ন আমাকে ছেলেবেলা থেকেই চিন্তান্বিত করেছে, এগুলোর সদুত্তর আমি বহু জায়গায় অনুসন্ধান করে কয়েকটি মীমাংসায় পৌঁছেছি বটে কিন্তু যতখানি দলিল-দস্তাবেজ থাকলে এগুলো প্রমাণরূপে পেশ করা যায় ততখানি করে উঠতে পারিনি। তার প্রধান কারণ আমার আলসেমি নয়– দস্তাবেজের অপ্রাচুর্যই তার আসল কারণ। অনেকদিন ধরে তাই ভেবেছি, আমার যা বলবার তা বলে ফেলি– দলিল থাক আর না-ই থাক– যারা এ-সব লাইনে কাজ করেন, হয়তো তাদের উপকারে লেগে যেতে পারে। দেশ সম্পাদকও এই মত পোষণ করেন– বস্তুত তারই অনুরোধে আমি আমার সমস্যা ও মীমাংসাগুলো পাঠকদের সামনে পেশ করছি; কিন্তু আবার সাবধান করে দিচ্ছি, যথেষ্ট প্রমাণপঞ্জি আমার হাতে নেই।
আমার প্রথম প্রশ্ন, দিল্লি আগ্রা পাঠান-মোঘলদের রাজধানী ছিল। সেখানে মুসলমানের সংখ্যা অত কম কেন? যুক্ত প্রদেশ, বিহার, পশ্চিম বাঙলার দিকে যতই এগোই, দেখি মুসলমানের সংখ্যা কমে আসছে– সেইটেই স্বাভাবিক কিন্তু হঠাৎ পুব বাঙলায় এসে এদের সংখ্যাধিক্য কেন? দিল্লির বাদশা দিল্লি, এলাহাবাদ ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ পুব বাঙলায়ই তলোয়ার চালিয়ে জনসাধারণকে মুসলমান করলেন কেন? উত্তরে কেউ কেউ বলেন, দিল্লির বাদশারা তলোয়ার চালাননি, চালিয়েছিল বাঙলার স্বাধীন পাঠান বাদশারা। তাই যদি হবে, তবে সে যুগে বিহার, বিজাপুর, আহমদাবাদেও স্বাধীন পাঠান রাজারা ছিলেন। তাঁরাই তলোয়ার চালালেন না কেন? কেউ কেউ বলেন, বাঙলা দেশ বৌদ্ধপ্রধান স্থান ছিল– তারা ভালো করে পুনরায় হিন্দুধর্মে ফিরে যাবার পূর্বেই মুসলমান ধর্ম বাঙলা দেশে আসে বলে এদের অনেকেই মুসলমান হয়ে যায়। এর উত্তরে আমার নিবেদন- রাজগির, বুদ্ধগয়া, পাটলিপুত্র, নালন্দা, বিক্রমশিলা সবই বিহার প্রদেশে–এ তো আরও বৌদ্ধপ্রধান ছিল। তবে তারাই-বা মুসলমান হল না কেন?
সর্বশেষে আরও সামান্য একটি বক্তব্য আছে। বহুকাল পূর্বে (শ্রাবণ, ১৩৫৮, বসুমতী) আমি স্বামী বিবেকানন্দের একটি উদ্ধৃতিতে পড়ি,
ভারতবর্ষের দরিদ্রগণের মধ্যে মুসলমানের অত সংখ্যাধিক্য কেন? একথা বলা মূর্খতা যে তরবারির সাহায্যে তাহাদিগকে ধর্মান্তর গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছিল।…
বস্তুত জমিদার ও পুরুতবর্গের হস্ত হইতে নিষ্কৃতি লাভের জন্য ইহারা ধর্মান্তর গ্রহণ করিয়াছিল। আর সেইজন্য বাঙলা দেশে সেখানে জমিদারের বিশেষ সংখ্যাধিক্য সেখানে কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে হিন্দু অপেক্ষা মুসলমানের সংখ্যা বেশি।*[* এ উদ্ধৃতিতে যে কয়েকটি ফুটকি আছে, সেগুলো প্রবন্ধের সঙ্কলন কর্তাই দিয়েছিলেন। মূল সম্পূর্ণ লেখাটি পেলে আমাদের আলোচনার সুবিধে হয়।]
আমার মূল বক্তব্যের সঙ্গে স্বামীজির কথা কিছুটা মিলে। পরে তার দীর্ঘতর আলোচনা হবে। উপস্থিত তরবারির সাহায্যে যে ব্যাপকভাবে ধর্ম প্রচার করা যায় না, সেই সিদ্ধান্তটি মেনে নিয়ে এগোচ্ছি।
আরবভূমি যদিও মরুময়, তবু তার তিন দিকে সমুদ্র। নৌযাত্রায় আরবরা তাই কখনও পরাজুখ ছিল না। বিশেষত হজরত মুহম্মদের সময় তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে নৌপথে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে দু খানা উত্তম গ্রন্থ এলাহাবাদ একাডেমি থেকে উর্দু ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে– আরবোঁকী জাহাজরাণী (আরব নৌবিদ্যা) ও হিন্দ ও আরবকী তালুকাৎ (ভারত ও আরবের যোগসূত্র)। অতদূর না গিয়ে যারা আরব্যোপন্যাসের সিন্দবাদকে স্মরণে আনতে পারবেন তারাই বলতে পারবেন এক বিশেষ যুগে আরবজাতি কী দুর্দান্ত সমুদ্রাভিযানই করেছে।*[* আরব্যোপন্যাসের প্রথম গল্পটি জাতক থেকে নেওয়া। সতীদাহ ও কোনার্ক মন্দিরের প্রতিচ্ছবিও ওই পুস্তকে পাওয়া যায়।] ওই মৌসুমি (শব্দটি আসলে আরবি ও ইংরিজি মনসুনও তার থেকে) বাতাস আবিষ্কার করে ও ফলে উপকূল ধরে ধরে না এসে এডেনসোকোত্রা থেকে সোজা সিংহল-ভারত আসা সুগম ও দ্রুততর হয়ে যায়।
