আশ্চর্য হলে বলি বাঃ, পরিতৃপ্ত হলে আহ্। ম্যাজিকে বাব্বাবাব্বা আর্টে, আহাহা!
হ্যাঁ-কে না করা, না-কে হ্যাঁ করা কঠিন নয়, কিন্তু উভয়কে মধুরতম করাই আর্ট, সেইটি কঠিন, ওইটেই আলঙ্কারিকদের ওয়াটারলু। এবং সবচেয়ে কঠিন, মধুরকে মধুরতর করা। ফুল তত সুন্দর, তাকে সুন্দরতম করা যায় কী করে। স্বয়ং খৃস্ট বলেছেন, লিলিফুলকে তুলি দিয়ে রঙ মাখায় কে?
অথচ জাপানি শ্ৰমণ রিয়োকোয়ান রচলেন–
কি মধুর দেখি রেশমের গাছে
ফুটিয়াছে ফুলগুলি
কোমল পেলব করিল তাদের
ভোরের কুয়াশা তুলি।
কি সে ভোরের কুয়াশা তুলি যা সবকিছুকে মধুর মেদুর, কোমল পেলব করে দেয়? দৃষ্টান্ত দিই :
প্রাচ্য ভূখণ্ড হইতে পবন আসিয়া আমাকে দোদুল্যমান করাতে আমি মুগ্ধ হইয়া আ মরি, আ মরি বলিতেছি–
কবির তুলির পরশ পেয়ে হয়ে যায়; পূব হাওয়াতে দেয় দোলা মরি-মরি—
আমি বললুম, সব বনে ছায়া ক্রমে ক্রমে ঘন হইতে ঘনতর হইতেছে—
কবির তুলি লাগাতে হল, ছায়া ঘনাইছে বনে বনে।
কিংবা আমি বললুম, শুক্লপক্ষের পঞ্চদশী রাত্রে পথ দিয়া যাইবার সময় যখন চন্দ্রোদয় হইয়াছে, তখন তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হইয়াছিল; তাহাকে কি শুভ লগ্ন বলিব, জানি না।
যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে
চাঁদ উঠেছিল গগনে।
দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে
কী জানি, কী মহা লগনে।
পাঠক হয়তো বলবেন, তুমি বলেছ গদ্যে, সে যেন পায়ে চলা; আর কবি বলেছেন ছন্দে, সে যেন নাচা।
উত্তম প্রস্তাব। ছন্দে বলি,
পথিমধ্যে তোমার সঙ্গে
পূর্ণিমাতে দেখা
বলব একে মহা লগন
ছিল ভালে লেখা।
কবিতা হল, কিন্তু রসসৃষ্টি হল না।
আর নিখুঁত, নিটোল ছন্দ মিল হলেই যদি কবিতা হয় তবে নিচের কবিতাটি নোবেল প্রাইজ পাওয়ার কথা :
হর প্রতি প্রিয় ভাষে কন হৈমবতী
বত্সরের ফলাফল কহ পশুপতি!
কোন গ্রহ রাজা হৈল কেবা মন্ত্রির
প্রকাশ করিয়া তাহা কহ দিগম্বর!
অলঙ্কারের দিক দিয়ে কবিতাটি দিগম্বরই বটে।
এই যে তুলি সবকিছু মধুময় করে তোলে, কী দিয়ে এ বস্তু তৈরি, কী করে এর ব্যবহার শিখতে হয়? এ কী সম্পূর্ণ বিধিদত্ত, না পরিশ্রম করে এর খানিকটে আয়ত্ত করা যায়?
ঘটিতে টোল দেখলে চট করে পাই, কিন্তু নিটোল ঘটি বানাই কী করে?
আর এই তো সেই তুলি সে যখন আপন মনে চলে তখন সে গীতিকাব্য লিরিক মেঘদূত। যখন ঘটনার ঘাতপ্রতিঘাত চরিত্রের ক্রমবিকাশের ওপর এর ছোঁয়া লাগে সে তখন কাব্য- রঘুবংশ। যখন ধর্মকে ছুঁয়ে যায় সে তখন গীতা, কুরান, বাইবেল।
পঞ্চতন্ত্র
মাভৈঃ!
বাঙালি সবদিক দিয়েই পিছিয়ে যাচ্ছে, এরকম একটা কথা প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায়। কথাটা ঠিক কি না, হলফ খেয়ে বলা কঠিন, কারণ দেশ-বিভাগের ফলে তার যে খানিকটে শক্তিক্ষয় হয়েছে সে বিষয়ে তো কোনও সন্দেহই থাকতে পারে না। পার্লামেন্টে যদি আপনার সদস্যসংখ্যা কমে যায় তবে সবকিছুই কাটতে হয় ধার দিয়ে ভার দিয়ে কাটার সুযোগ আর মোটেই জোটে না।
দিল্লিতে থাকাকালীন আমি একটি বিষয় নিয়ে কিঞ্চিৎ চিন্তা করেছিলুম। কেন্দ্রে অর্থাৎ ইউপিএসসি-তে বাঙালি যথেষ্ট চাকরি পাচ্ছে কি না? ওই অনুষ্ঠানের সদস্য না হয়েও যারা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের বিশ্বাস, বাঙালির এতে যতখানি কৃতকার্য হওয়া উচিত ততখানি সে হচ্ছে না। একদা বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমাকে সেখানে ডাকা হয়েছিল; আমি তখন চোখকান খোলা এবং খাড়া রেখে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করেছিলুম।
দিল্লিতে এখন যারা বসবাস করেন তারা বিলিতি কিংবা বিলিতি ঘষা পোশাক পরেন, ছুরিকাঁটা দিয়ে খাওয়া প্রচুর বাড়িতে চালু হয়েছে, ইংরিজি আদব-কায়দা, বিশেষ করে ইংরিজি এটিকেট এঁদের কাছে আর সম্পূর্ণ অজানা নয়।
ইউপিএস সি-এর তাবৎ মেম্বারই সায়েবিয়ানা পছন্দ করেন, এ-কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু যেখানে সে-আবহাওয়া বিদ্যমান, মানুষ ইচ্ছা-অনিচ্ছায় তার থেকেই প্রাণবায়ু গ্রহণ করে। তাই যদি বাঙালি ছেলের পোশাক ছিমছাম না হয়, চেয়ার টেনে বসার সময় সে যদি শব্দ করে, মোকামাফিক পার্ডন, থ্যাঙ্কু না বলতে পারে এবং সর্বক্ষণ ঘন ঘন পা দোলায় তবে সদস্যরা আপন অজান্তেই যে তার প্রতি কিঞ্চিৎ বিমুখ হয়ে ওঠেন সেটা কিছু আশ্চর্যজনক বস্তু নয়।
কিন্তু আসল বিপদ অন্যত্র। বাঙালি উমেদার ইংরিজিতে ভাব প্রকাশ করতে পারে না। পাঞ্জাবি, হিন্দিভাষী কিংবা মারাঠি যে ইংরিজি বলে সেটা কিন্তু আমরি আমরি করবার মতো নয়। বিশেষত পাঞ্জাবি, হিন্দি-ভাষী ও সিন্ধিদের ইংরিজিজ্ঞান শিলিং-শকার ও পেনি-হার থেকেই আহরিত। তা হোক, কিন্তু ওইসব বুঝে-না-বুঝেই যারা বেশি পড়ে তাদের কথাবার্তার অভ্যাস হয়ে যায় বেশি, অন্তত থ্যাঙ্ক, পার্ডন, আই এম এফ্রেড তারা তাগমাফিক লাগিয়ে দিতে কসুর করে না।
এ স্থলে ইতিহাসের দিকে একনজর তাকাতে হয়।
মুসলমান আগমনের পর থেকে ১৮৪০-৪২ পর্যন্ত বাঙলা দেশের ব্রাহ্মণ তথা বৈদ্য সম্প্রদায়ের বিস্তর লোক সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা করেন, এবং মুসলমান ও কায়স্থরা ফারসি (এবং কিঞ্চিৎ আরবির) চর্চা করেন। এদেশের বড় বড় সরকারি চাকরি, যেমন সরকার (চিফ সেক্রেটারি) কানুনগো (লিগেল রিমেমব্রেন্সার) বখসি (একাউন্টেন্ট জেনারেল পে মাস্টার) অর্থাৎ এডমিনস্ট্রেটিভ তাবৎ ডাঙর ডাঙর নোকরিই করেন কায়স্থেরা; ইংরেজের আদেশে এঁরাই কলকাতাতে প্রথম ইংরেজি শিখতে আরম্ভ করেন। বস্তৃত ফারসি তাদের মাতৃভাষা ছিল না বলে তারা সেটা অনায়াসে ত্যাগ করে ইংরেজি আরম্ভ করে দিয়েছিলেন এবং ফলে হাইকোর্টটি তাদের হাতে চলে যায়। ব্রাহ্মণরা আসেন পরে; তাই তারা পেলেন বিশ্ববিদ্যালয়। মুসলমান আসেন সর্বশেষে, তার কপালে কিছুই জোটেনি।
