সবাই বললে, তোফা, খাসা, বেড়ে।
কবি রোজই এরকম গল্প বলে।
একদিন হয়েছে কী, কবি গিয়েছে ওই বনে, আর সত্য সত্যই একটা গাছের ফোকর থেকে বেরলো সাতটি পরী, তারা নাচতে নাচতে গেল সমুদ্রপারে, সেখানে জল থেকে বেরিয়ে এল সমুদ্রকন্যা। কবি একদৃষ্টে দেখলে।
সেদিন সন্ধ্যায় চাষারা নিত্যিকার মতো শুধোলে, কবি, আজ কী দেখলে বল।
কবি গম্ভীর কণ্ঠে বললে, কিচ্ছু দেখিনি।
অর্থ সরল। যে বস্তু মৃন্ময়রূপে চোখের সামনে ধরা দিল, সেটাকে নিয়ে কবি করবে কী? কবির ভুবন তো চিন্ময়, কল্পনার রাজ্য। বাস্তবে যে জিনিস দেখা হয়ে গেল তারই ঠাই কল্পনা রাজ্যে, কাব্যের জগতে আর কোথায়? চার চক্ষু মিলনের পর বধূকে আর কল্পনা কল্পনায় তিলোত্তমা বানিয়ে বেহেশতের হুরী-পরীর শামিল করা যায় না।
প্রকৃতির বিরুদ্ধে ওয়াইলডের আরেকটি ফরিয়াদ, সৃষ্টিতে আছে শুধু একঘেয়েমি। প্রকৃতি বিস্তর মেহন্নত করে যদি একটি ফুল ফোঁটায় (রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, তত লক্ষ বরষের তপস্যার ফলে/ ধরণীর তলে ফুটিয়াছে এ মাধবী,) তবে বার বার তারই পুনরাবৃত্তি করে অপিচ কবির সৃষ্টি নিরঙ্কুশ একক, সৃষ্টিকর্তারই মতো একমেবাদ্বিতীয়ম, এক জিনিস সে দু বার করে না, অন্যের নকল তো করেই না, নিজেরও কার্বনকপি হতে চায় না।
ওয়াইলডের বহুপূর্বে জর্মন কবি শিলার বলেছিলেন, প্রকৃতি প্রবেশ করা মাত্র কবি অন্তর্ধান করেন।
আর রবীন্দ্রনাথ এ সম্বন্ধে কী বলেছেন, সেকথা অন্যত্র বলার সুযোগ আমার হয়েছে। পুনরাবৃত্তির ভয় বাধ্য হয়ে বর্জন করে বলছি, তিনি প্রকৃতির সওগাত কদম ফুল দেখে বলেছেন, ওটা ঋতুস্থায়ী, আর আমার সৃষ্টি অজরামর,
আজ এনে দিলে হয়তো দেবে না কাল
রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল
এ গান আমার শ্রাবণে শ্রাবণে
তব বিস্মৃতি স্রোতের প্রাবনে
ফিরিয়া ফিরিয়া আসিবে তরণী
বহি তব সম্মান।
এ আবার কীরকমের সম্মান!
প্রকতিকে সব কবি হেনস্তা করার বর্ণনা দেবার পর, আবার ক্ষণতরে ওয়াইলডে ফিরে যাই।
আচ্ছা মনে করুন, ওয়াইডের সেই গ্রাম্য কবি যদি চাষাদের একদিন বলত, আজ ভাই, আবার সেই বনে গিয়েছিলাম। দেখি গাছতলায় বসে এক পথিক তার সঙ্গীকে বলছে, সে তার পুরনো চাকরকে নিয়ে তীর্থ করতে যায়, সেখানে চাকরটা মারা যায়; তাই নিয়ে সে বিস্তর আপসা-আপসি করছিল।
চাষারা নিশ্চয়ই ঠোঁট বেঁকিয়ে বলত, এতে আবার বলার মতো কী আছে– এ তো আকছারই হচ্ছে।
কিন্তু মনে করুন, তখন যদি কবি, পুরাতন ভৃত্য কবিতাটি আবৃত্তি করত? বিষয়বস্তু উভয় ক্ষেত্রে একই।
কবিতাটিতে যে অতি উত্তম রসসৃষ্টি হয়েছে সে সম্বন্ধে এ-যাবৎ কেউ কখনও সন্দেহ করেনি।
অথচ ওয়াইলড বর্ণিত কবির পরী-সিন্ধুবালা অবাস্তব, পুরাতন ভৃত্যের বিষয়বস্তু অতিশয় বাস্তব। পুরাতন ভৃত্য মনে না ধরলে দেবতার গ্রাস নিন। সেটা তো অতিশয় বাস্তব আইন করে বন্ধ করতে হয়েছিল, পরীর নাচ বন্ধ করার জন্য আইন তৈরি হয় না।
তা হলে দাঁড়াল এই, বাস্তব হোক, কাল্পনিক হোক– প্রাকৃত হোক, অতিপ্রাকৃত হোক– যে-কোনও বিষয়বস্তু রসোত্তীর্ণ হতে পারে যদি–
এইখানেই আলঙ্কারিকদের ওয়াটারলু। কী সে জিনিস, কী সে যাদুর কাঠি, কী সে ভানুমতীর মন্ত্র যার পরশ পেয়ে পুরাতন ভৃত্য বনের পরী কাব্যরসাঙ্গনে একই তালে, একই লয়ে চটুল নৃত্য আরম্ভ করে? কিংবা বাস্তবে না নেচেও কাব্যেতে নাচা হয়ে যায়? যথা–
জোন বললে– চ্যাটার্জি, এই আনন্দের দিনে তুমি অমন গ্রাম হয়ে বসে থেক না, আমাদের নাচে যোগ দাও।
বললুম মাদার লক্ষ্মী, আমার কোমরে বাত। নাচতে কবিরাজের বারণ আছে।
(শুনুন কথা! পৃথিবীর উপরে হাউ অন্ আর্থ-কবিরাজ কী করে কল্পনা করতে পারে যে, ষাট বছরের বুড়া গাইয়া চাটুয্যের বলড্যান্সের অভ্যাস আছে; আগে-ভাগে বারণ করে দিতে হবে)!
ভানুমতী বলে ভালোই করেছি। ম্যাজিকের জোরেই শরঙ্কালে আম ফলানো যায়। দীপক গেয়ে আগুন ধরানো যায়, মল্লার গেয়ে বৃষ্টি নামানো যায়। কিন্তু সত্য সঙ্গীতজ্ঞ নাকি তাতে কণামাত্র বিচলিত না হয়ে বলেন, তার চেয়ে ঢের বেশি সার্থক হবে সঙ্গীত যদি সদ্য-বিধবাকে সান্ত্বনা দিতে পারে, স্বাধিকারপ্রমত্তকে শান্ত করতে পারে। এবং কিছু না করেও যে সার্থক সঙ্গীত হতে পারে সে তো জানা কথা।
আর্টে এই ম্যাজিক জিনিসটির সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ :
গাহিছে কাশীনাথ নবীন যুবা
ধ্বনিতে সভাগৃহ ঢাকি,
কণ্ঠে খেলিতেছে সাতটি সুর
সাতটি যেন পোষা পাখি।
শাণিত তরবারি গলাটি যেন,
নাচিয়া ফিরে দশদিকে,
কখন কোথা যায় না পাই দিশা,
বিজুলি হেন ঝিকমিকে!
আপনি গড়ি তোলে বিপদজাল
আপনি কাটি দেয় তাহা।
সভার লোকে শুনে অবাক মানে,
সঘনে বলে, বাহা বাহা ॥
এখানে বিশেষ করে লক্ষ করবার জিনিস, সভার লোকে বাহা বাহা বলছে, কেউ কিন্তু, আহা আহা বলেনি।
পার্থক্যটা কোথায়?
দড়ির উপর নাচ দেখে বলি বাঃ, জাদুকর যখন চিরতনের টেক্কাকে ইসকাপনের দুরি বানায় তখন বলি বা রে–কাশীনাথ যখন গানের টেকনিকাল স্কিল (ম্যাজিক) দেখায় তখন বলি, বাঃ, কিন্তু যখন কবি গান,
তোমার চরণে। আমার পরাণে,
লাগিবে প্রেমের ফাঁসি—
তখন মনে হয়, যেন আমারই বিরহতপস্যা শ্রান্ত ভালে প্রিয়া তার আপন কণ্ঠের যুথীরমালে আমার সর্ব দহনদাহ ঘুচিয়ে দিলেন। চরম পরিতৃপ্তিতে হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে বেরিয়ে আসে, আ আহ।
