তা সে যাই হোক্, আমরা বাঙালি প্রথমেই সাততাড়াতাড়ি ইংরেজি শিখেছিলুম বলে বেহার, উড়িষ্যা, যুক্তপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এস্তক সিন্ধুদেশ পর্যন্ত আমরা ছড়িয়ে পড়ি।
এর পর অন্যান্য প্রদেশেও বিস্তর লোক ইংরেজি শিখতে আরম্ভ করেন। ক্রমে ক্রমে আমাদের চাহিদা ও কদর কমতে লাগল। এসব কথা সকলেই জানে, কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটি তত্ত্ব বিশেষভাবে বিজড়িত এবং সেই তত্ত্বটির প্রতি আমি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
যে দুটি জাতীয় সঙ্গীত ভারতের সর্বত্র সম্মানিত সে দুটিই বাঙলা দেশেই রচিত হয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রাম সর্বপ্রথম আরম্ভ হয় বাঙলা দেশেই। এটা কিছু আকস্মিক যোগাযোগ নয়। এর কারণ বাঙালি আপন দেশ ভালোবাসে এবং সে বিদ্রোহী। দেশকে ভালোবাসলে মানুষ তার ভাষাকেও ভালোবাসতে শেখে।
আশ্চর্য, ইংরেজি ভালো করে আসন জমাবার পূর্বেই বাঙলাদেশে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আরম্ভ হয়। (ঠিক সেইরকম ফারসি যখন একদা আসন জমাতে যায় তখন কবি সৈয়দ সুলতান আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন,
আল্লায় বলিছে মুই যে দেশে যে-ভাষ,
সে-দেশে সে-ভাষে করলুম রসুল প্রকাশ।
যারে যেই ভাষে প্রভু করিল সৃজন।
সেই ভাষা তাহার অমূল্য সেই ধন্য৷)
এবং আরও আশ্চর্যের বিষয়, সে বিদ্রোহীদের কাণ্ডারী ছিলেন সে-যুগের সবচেয়ে বড় ইংরেজি (ফরাসি, লাতিন, গ্রিক) ভাষার সুপণ্ডিত মাইকেল। কাজেই যদিও সে উইলসেন, কেশবসেন ও ইস্টিসেন এই তিন সেনের কাছে জাত দিয়ে ছুরি কাঁটা ধরতে শিখল (আজ যা দিল্লিতে বড়ই কদর পাচ্ছে) তবুও সঙ্গে সঙ্গে ওর বিনাশের চারাকে জল দিয়ে বাঁচাতে আরম্ভ করল। এটাকে বাঙালির স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে। এ সময় সে গাছেরও খেয়েছে, তলারও কুড়িয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ই চোখে পড়ল, বাঙালি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজি বইয়ের আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যেরকম কাতর হয়ে পড়েছিল এবারে সে সে-রকম হাঁসফাস করল না। স্বরাজ লাভের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল, বাঙালি ইংরেজি ভাষা, আচার-ব্যবহার কায়দা-কেদা থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছে এবং ফলে দিল্লিতে আর কল্কে, সরি, সের্ভিয়েট পায় না।
তর্ক করে, দলিল-দস্তাবেজ দিয়ে সপ্রমাণ করতে হলে ভূরি ভূরি লিখতে হবে। তা না হয় লিখলুম, কিন্তু পড়বে কে? তাই সংক্ষেপে বলি,
পৃথিবীর সভ্যাসভ্য কোনও দেশই বিদেশি ভাষা দিয়ে বেশিদিন কারবার চালায় না। আজকের দিনে তো নয়ই। ফারসি এদেশে ছশো বছর ধরে রাষ্ট্রভাষা ছিল– আমরা একে চিরন্তনী ভাষা বলে গ্রহণ করিনি।
তাই হিন্দি, গুজরাতি, মারাঠিওলারাও একদিন ইংরেজি বর্জন করে আপন আপন মাতৃভাষায় কাজকারবার করতে গিয়ে দেখবেন, আমরা বাঙালিরা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছি, মেঘে মেঘে বেলা হয়ে গিয়েছে কারণ আমরা অনেক পূর্বে আরম্ভ করেছিলুম। তখন যখন কেন্দ্রে আপন আপন মাতৃভাষায় পরীক্ষা দিতে হবে তখন আবার আমরা সেই যুগে ফিরে যাব, যখন একমাত্র বাঙালিই ইংরেজি জানত। হিন্দি কখনও ব্যাপকভাবে বাধ্যতামূলক হবে না, আর হলেও বাঙালিকে যেমন মাতৃভাষার ওপর হিন্দিতে পরীক্ষা দিতে হবে, হিন্দিওলাকে হিন্দি ভিন্ন অন্য একটি ভাষায় পরীক্ষা দিতে হবে। অমাতৃভাষা অমাতৃভাষায় কাটাকুটি গিয়ে রইবে বাঙলা বনাম হিন্দি। তাই অবস্থা একই দাঁড়াবে আমরা এগিয়ে যাব।
তাই মা ভৈঃ ॥
পৌষ মেলা
হয়তো মেলাতেই বসে আপনি এ-লেখাটি পড়ছেন। না-হলে মেলাতে আসার সময় এখনও আছে। মোটরে আসতে পারেন, অবশ্য যদি পণ্ডিতজি দুর্গাপুর থেকে শান্তিনিকেতন মোটরে এসে থাকেন। তার আসার সঙ্গে আপনার মোটরের আসার একটা অদৃশ্য সূক্ষ্ম কার্যকারণ সম্পর্ক আছে। তিনি মোটরে এলে অজয় নদের উপরে কজওয়েটি তৈরি হবে, বিকল্পে তিনি যদি হেলিকপ্টারে আসেন এখানকার ফার্পো কালোর দোকানে সেই শুজোরব– তবে উড়িষ্যা ভাষায় আপনারো কপালো ভাঙিলো। সাধে কি আর মাইকেল গেয়েছেন, রাজেন্দ্রসঙ্গমে দীন যথা যায় দূর তীর্থ দরশনে– সে ব্যবস্থার পরিবর্তন এখনও হয়নি।
এসে কিন্তু কোনও লাভ নেই। কারণ, জেলা বীরভূমের অন্তঃপাতী ডিস্ট্রিক্ট রেজেস্টারি বীরভূম সবরেজেস্ট্রারি বোলপুর পরগণে সেনভূম তালুক সুপুরের অন্তর্গত হুদা বোলপুরে পত্তনীর ডৌল খারিজান মৌজে ভুবননগর ইস্তেক ভাববেন না, আমি সুকুমার রায়ের কাকালত নামা থেকে চুরি করছি, ইটি পাবেন শান্তিনিকেতন ট্রডিডের পয়লা পাতায়, সেকথা পরে হবে– সিকিটি ফেলবার জায়গা নেই। কারও না কারও মাথায় আটকে যাবে, কিংবা স্ত্রীপুরুষের পদতাড়নে যে পুঞ্জীভূত ধূলিস্তর আকাশে-বাতাসে জমে উঠেছে, তারই একটিতে। অন্য মেলার তুলনায় এখানে মেয়েদের সংখ্যা কিছু নগণ্য নয়, অথচ ভাবতে অবাক লাগে, পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে আশ্রমের মাস্টারদের গৃহিণী-কন্যারা যখন মেলা দেখার প্রথম অনুমতি পেলেন– শ্রীসদনের কল্পনাও তখন কেউ করতে পারেননি– তখন তাদের আনা হয়েছিল গোরুর গাড়িতে করে এবং তাঁরা মেলার প্রত্যন্ত প্রদেশ থেকে, গাড়িতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেলা দেখেছিলেন।
এই মেলাটি বিশ্বভারতীর চেয়ে বয়েসে বড়। একথা বলতে হল বিশেষ করে, তার কারণ, যে-বেদির উপর বসে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর উপাসনা করতেন, সে-বেদির পাশ দিয়ে যাবার সময় গেল মেলার সময় শুনি, এক গুণী আরেক গুণীকে বুঝিয়ে বলছেন, এই বেদির নিচে রবীন্দ্রনাথের পূত-অস্থি প্রোথিত আছে! আশ্চর্যচিহ্ন দিলুম এহেন তত্ত্ব নিতান্তই আমার কল্পনার বাইরে বলে, কিন্তু আসলে আমার আশ্চর্য হওয়া উচিত নয়। আমাদের কেন্দ্রের এক মন্ত্রী বোম্বাই না কোথায় যেন রবীন্দ্রনাথের জন্মতিথি উপলক্ষে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেন, রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত প্রথম ইংরেজিতে রচনা লিখে বুঝতে পারলেন, মাতৃভাষা বাংলাতেই ফিরে যাওয়া উচিত। গীতাঞ্জলি অনুবাদ করার পূর্বে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজিতে বিশেষ কিছু লিখেছেন বলে জানতুম না; পরে চিন্তা করে বুঝলুম মন্ত্রীবর মাইকেল এবং রবীন্দ্রনাথে গুবলেট করে ফেলেছেন! (এবার আশ্চর্যচিহ্ন যে তাগ-মাফিক লেগেছে সে-কথা হর ব্যাকরণবাগীশই কবুল করবেন)। শতবার্ষিকী শত বার সিকি ভেবে এঁরা যদি এখন পঁচিশ টাকা খর্চা করেন তবে আমি আর বিস্মিত হব না। পাটা আমার নয়– এটা স্বয়ং কবিগুরু করে গেছেন।
