ইতোমধ্যে ফার্স শেষ হয়েছে। মামাকে স্টেজে দাঁড় করানো হয়েছে। মামা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, এ সম্মান সম্পূর্ণ আমার প্রাপ্য নয়। বস্তুত সবটাই পাবেন, সুসাহিত্যিক আকাঁদেমি কর্তৃক সম্মানিত শ্ৰীযুত গজেন্দ্রশঙ্কর সান্যাল। একমাত্র তাঁরই পরামর্শে আমি এটা স্টেজ করি। পাড়ার আর সবাই বলছিল, এটা সাপ ব্যাঙ কিছুই হয়নি।
বুঝতেই পারছেন, আমার নাম গজা সান্যাল। তখন আরেক ধুন্দুমার। আমার গলা জিরাফের মতো হলেও অত মালার স্থান হত না। নিতান্ত রঙ্গদর্শী গৌরকিশোর সেখানে সেদিন উপস্থিত বুদ্ধি খাঁটিয়ে আমাকে সময়মতো না সরালে, বঙ্গীয় পাঠকমণ্ডলী উল্লিখিত কলকাতার কাছেই কবির মহাপ্রস্থান, বই থেকে বঞ্চিত হত।
বাড়ি ফেরার পরও আমার মাথা তাজ্জিম মাজ্জিম করছিল। নল ছেড়ে দিয়ে তলায় মাথা রেখে মনে মনে বললুম, অয়ি বাগেশ্বরী, তোমার সৃষ্টিরহস্য আমাকে একটু বুঝিয়ে বল তো। মামার ওই ফার্স পড়ে এ-পাড়ার সক্কলের তো কান্না পেয়েছিল। তবে কি পাড়ার মেধো ও-পাড়ার মধুসূদন?
বিস্তর অলঙ্কারশাস্ত্র পড়ে আমার মনে একটা আত্মম্ভরিতা হয়েছিল, আমি বলতে পারি কোন রচনা রসোত্তীর্ণ হয়েছে, কোনটা হয়নি। এখন দেখি ভুল।
ভারত, বামন, ক্রোচে, বেৰ্গসো, তাহা হোসেন, আবু সঈদ আইয়ুব সবাইকে পরের দিন বস্তা বেঁধে শিশি-বোতলওলার বাড়িতে পাঠিয়ে দিলুম।
আমি জানি, আমার পাঠকমণ্ডলী অসহিষ্ণু হয়ে বলবেন, তোমার যেমন বুদ্ধি! পার্ক সার্কাসের রদ্দি বই পেল রাজাবাজারের সম্মান। আর তুমি তাই করলে বামন ভামহকে প্রত্যাখ্যান! জৈসকে তৈসন, শুঁটকিসে বৈগন- যার সঙ্গে যার মেলে– শুঁটকির সঙ্গে বেগুনই তো চলে। রাজাবাজার পার্ক সার্কাসে গলাগলি হবে না?
কথাটা ঠিক। ফারসিতেও বলে,
স্বজাতির সনে স্বজাতি উড়িবে মিলিত হয়ে
পায়রার সাথে পায়রা শিকরে শিকরে লয়ে?
The same with same shall take its flight,
The dove with dove and kite with kite.
কুনদ হম্-জিনস ব হম-জিন্স্ পরওয়াজ
কবুতর ব কবুতর বাজ ব বাজ।
এসব অতিশয় খাঁটি কথা। কিন্তু প্রশ্ন, শেক্সপিয়র মলিয়ের জনসাধারণের রাজা-উজির গুণীজ্ঞানীর কথা হচ্ছে না– চিত্ত জয় করেছিলেন যে রস দিয়ে সেটি কি খুব উচ্চাঙ্গের রস? মাঝে মাঝে তো রীতিমতো অশ্লীল। এবং শেকসপিয়র যে আজও খাতির পাচ্ছেন তার কারণ জনসাধারণ তিনশো বছর ওঁর নাটক দেখত চেয়ে চেয়ে ওগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছিল বলে। শুধুমাত্র গুণীজ্ঞানীর কদর পেলে ওঁর নাট্য আজ পাওয়া যেত লাইব্রেরির টপ শেফে– সেটা উচ্চমান হলেও অপ্রয়োজনীয় বই-ই রাখা হয় সেখানে।
আরেকটা উদাহরণ দি : ওস্তাদ মরহুম ফৈয়াজ খানের শিষ্য শ্রীমান সন্তোষ রায়ের কাছে শোনা। রাস্তায় এক ভিখিরির গাইয়া গান শুনে ফৈয়াজ তাকে আদরযত্ন করে বাড়ি নিয়ে গিয়ে, তার সেই গাঁইয়া গানের এক অংশ শিখে নিয়ে তাকে গুরুদক্ষিণা দিয়ে বিদায় দিলেন। কয়েকদিন পরে সেই টুকরোটি তার অতিশয় উচ্চাঙ্গ ওস্তাদি গানে বেমালুম জুড়ে দিয়ে বড় বড় ওস্তাদের কাছে শাবাশি পেলেন–ওরকম ভয়ঙ্কর অরিজিনাল অলঙ্কার কেউ কখনও শোনেনি!
আরেকটি নিবেদন করি : মেজর জেনরল স্লিমান গেল শতাব্দীর গোড়ার দিকে একরাত্রি কাটান দিল্লি থেকে মাইল দশেক দূরের এক গ্রামে। রাত্রে শোনেন ইঁদারা থেকে বলদ দিয়ে জল তোলার সময় এক চাষা অন্য চাষাকে মিষ্টি টানা সুরে হুশিয়ার, খবরদার, সবুর বলছে। পরদিন সে-কথা এক ভারতীয় কর্মচারীর সামনে উল্লেখ করাতে সে বললে, তানসেন মাঝে মাঝে এখানে এসে এসব সুর শিখে নিয়ে আপন সৃষ্টিতে জুড়ে দিতেন।
মামার ফার্সটা চেয়ে নিয়ে আবার নতুন করে পড়লুম। নাঃ! আমি ফৈয়াজ নই, তানসেনও নই। এর কোনও বস্তুই আমার কোনও কাজে লাগে না। মামাকে দোষ দেওয়া বৃথা।
সমস্তটা ডাহা অনরিয়েল, কোনও প্রকারের বাস্তবতা নেই কোনওখানে।
তখন মনে পড়ল ওস্কার ওয়াইডের একটি গল্প। তিনি সেটি তার সখা এবং শিষ্য আঁদ্রে জিকে বলেছিলেন। তিনি সেটি ওয়াইল্ড সম্বন্ধে লেখা তার ইন মেমোরিয়াম, (সুনির), পুস্তকে উল্লেখ করেছেন। নিজের ভাষায় গল্পটা বলি– ও বই পাই কোথায়?
গ্রামের চাষাভূষোরা এক কবিকে খাওয়াত পরাত। কবির একমাত্র কাজ ছিল সন্ধের পর আড্ডাতে বসে গল্প বলা। চাষারা শুধোত কবি আজ কী দেখলে? আর কবি সুন্দর সুন্দর গল্প শোনাত। রোজ একই প্রশ্ন। একদিন যখন ওই শুধোলে, তখন, কবি বললে, আজ যা দেখেছি তা অপূর্ব। ওই পাশের বনটাতে গিয়েছিলুম বেড়াতে। বেজায় গরম। গাছতলায় যখন জিরোচ্ছি তখন ওমা, কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ দেখি, একটা গাছের ফোকর থেকে বেরিয়ে এল এক পরী। তার পর আরেকটি, তার পর আরেকটি, করে করে সাতটি। আর সর্বশেষে বেরুলেন রানি। মাথায় হীরের ফুলের তৈরি মুকুট, পাখনা দুটি চরকা-কাটা বুড়ির সুতো দিয়ে তৈরি। হাতে সোনার বাঁশি। সাতটি পরীর চক্করের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাজাতে লাগল সেই সোনার বাঁশি। তার পর নাচতে নাচতে তারা এগিয়ে চলল সাগরের দিকে। আমিও ঘাপটি মেরে পিছনে পিছনে। সেখানে গিয়ে এরা গান গেয়ে বাঁশি বাজিয়ে কাদের যেন ডাকলে। সঙ্গে সঙ্গে উঠে এল সাত সমুদ্রকন্যা। সবুজ তাদের চুল তাই আঁচড়াচ্ছে সোনার চিরুনি দিয়ে। সন্ধ্যা অবধি, ভাই, তাদের গান শুনলুম, নাচ দেখলুম– তার পর তারা চাঁদের আলোয় মিলিয়ে গেল।
