অবশ্য মনে রাখতে হবে কন্টিনেন্টে ১৭/১৮-এর পূর্বে কেউ ম্যাট্রিক পাস করে না। এবং তাদের ওই সময়ের ভিতর এমনই নিবিড় (intenes) শিক্ষা দেওয়া হয় যে ওরই কল্যাণে পরবর্তী জীবনে সে অনেক কিছু আপন চেষ্টাতেই শিখতে পারে, রস নিতে পারে।
এদেশের ছেলেমেয়েকে ১৭/১৮ অবধি ইস্কুলে রাখুন আর না-ই রাখুন, উত্তম পদ্ধতিতে শিক্ষা দান করুন আর না-ই করুন, প্রশ্ন এই তারা বেরিয়ে এসে করবে কী? কৃষি, বাণিজ্য, কলকজা বানানো, ম্যাট্রিকে তাকে যা-ই শেখান না কেন, বাইরে এসে তার ওপনিং কোথায়? যত ভালো কৃষিই সে শিখুক না কেন, গ্রামে যেটুকু জমি সে যোগাড় করতে পারবে তাতে সে জাপানের ড্রাই-ফার্মিংই করুক আর আইল্যান্ডের কো-অপারেটিভই করুক, ওই দিয়ে আণ্ডা-বাচ্চা পুষতে পারবে? আমি সাধারণ প্রতিভাবান ছেলেকে তিন বছরে তিনটে বিদেশি ভাষা শিখিয়ে দিতে পারি, যার জোরে সে ইয়োরোপে ভালো কাজ পাবে। এখানে?
কাজেই বাইরের অনুকূল পরিস্থিতি, আবহাওয়া, ওপেনিংও সৃষ্টি করতে হবে।
তা সে দেশকে ইন্ডাসট্রিয়ালাইজ এবং এগ্রিকালচারাইজ বা অন্যান্য যা-কিছু হোক সেসব আইজ করে, কিংবা অন্য কিছু করে। সেটা কী করে করতে হয় আমি জানিনে।
ততদিন কলেজে কলেজে ভিড়। অনিচ্ছুক লেখাপড়া করবে– আখেরে যার কোনও মূল্যই নেই। দেশের অর্থক্ষয়, শক্তিক্ষয়। সর্ব অপচয়।
কথায় বলে, ওরে পাগল, কাপড় পরিসনে কেন? পাগল বললে, পাড় পছন্দ হয় না। আমাদের হয়েছে উল্টোটা। ভাবছি, উচ্চশিক্ষার যত বস্তা বস্তা কাপড় ছেলের পিঠে বাঁধব ততই সে সুবেশ নটবর হবে।
নিরলঙ্কার
একটি লোকের কাছে আমি নানাদিক দিয়ে কৃতজ্ঞ ছিলুম। মাসাধিক কাল আমি যখন টাইফয়েডে অজ্ঞান, সে তখন আমার সেবা করে বাঁচিয়ে তোলে। ভালো করেছে কি মন্দ করেছে, সে অবশ্য অন্য কথা। আর শুধু আমিই না, আমাদের পার্ক সার্কাস পাড়ার বিস্তর লোক তার কাছে নানান দিক দিয়ে ঋণী। মাঝারি রকমের পাস-টাস দিয়েছে পরীক্ষার ঠিক আগে তার জোর চাহিদা। বেশ দু পয়সা কামায়– ধার চাইতে হলে ও-ই ফার্স্ট চইস। আর বললুম তো, রুগীর সেবায় ঝানু নার্সকে হার মানায়।
তার যে কেন হঠাৎ শখ গেল সাহিত্যিক হবার বোঝা কঠিন।
একটা ফার্স লিখেছে। তার বিষয়বস্তু : ধনী ব্যবসায়ী তার ম্যানেজারের ওপর ভার দিয়েছে, কলেজ-পাস মেয়ের জন্য বিজ্ঞাপন দিয়ে ইন্টারভ নিয়ে বর বাছাই করতে। নাটকের আরম্ভ ইন্টারভ্য দিয়ে। কেউ কবি, কেউ গবিতা লিখে গবি, কেউ ফিলিম স্টার আরও কত কী?
পড়ে আমার কান্না পেল। দুই কারণে। অত্যন্ত প্রিয়জনের নিষ্ফল প্রচেষ্টা দেখলে যেরকম কান্না পায়, এবং দ্বিতীয়ত ওই কথাটি ওকে বলি কী প্রকারে? ওটা কিছুই হয়নি, ওকে বলতে গেলে আমার মাথা কাটা যাবে। শেষটায় মাথা নিচু করে ঘাড় চূলকে বললুম, বুঝলে মামা, আমি ফার্স-টার্স বিশেষ পড়িনি, দেখিনি আদপেই অথচ এ-সব জিনিস স্টেজে দেখার এবং শোনার।
মামা সদানন্দ পুরুষ। একগাল হেসে বললে, যা বলেছিস। আমি ঠিক তাই ভাবছিলুম।
সোয়াস্তির নিশ্বাস ফেললুম।
ওমা, কোথায় কী। হঠাৎ পাড়ার চায়ের দোকানে শুনি মামার ফার্স ট্যাংরা না বেনেপুকুরে কোথায় যেন রিহার্সেল হচ্ছে। সর্বনাশ। বলি, ও চাটুয্যে, এখন উপায়?
সোমেন যদিও নিকষ্যি, তবু কথা কয় কলকাতার খাস বাসিন্দা বনেদি সোনার বেনেদের মতো। অর্থাৎ আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারে হুতোম আলালকে আড়াই লেন্থ পিছনে ফেলে। দাঁতের মাড়ি পর্যন্ত বের করে বললে, উপায় নদারদ। দেখি নসিবে কী কী গর্দিশ আছে?
তার পর মামা একদিন ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে ফার্স-অভিনয়ের লগ্ন রাঁদেভু বাতলে গেলেন। ট্যাংরা, গোবরায় নয়! রাজাবাজারের কোনও এক গলির ভিতরে।
চাটুয্যের বাড়ি মসজিদবাড়ি স্ট্রিটে। ওখানে কখনও যাইনি। ভাবলুম, সেদিন ওখানেই আশ্রয় নেব। মামা সময় পেলেও আমাকে খুঁজে পাবে না।
চাটুয্যে তো আমাকে দেখে অবাক। ব্যাপার শুনে বললে, তা আপনি চা পাঁপর খান। আমাকে তো যেতেই হবে। চাটুয্যে চাণক্যের সেই আইডিয়াল বান্ধব–রাজদ্বারে শ্মশানে ইত্যাদি। আর এটা যে মামার ফুরেল সে বিষয়ে আমার মনে কোনও সন্দ ছিল না।
ঘণ্টা দুই দাঁত কিড়মিড়ি দিয়ে বার বার রাজাবাজারের দৃশ্যটা মনক্ষু থেকে তাড়াবার চেষ্টা করলুম। কিছুতেই কিছু হয় না। কোথাকার কে এক কবি বলেছে, সদ্য লাঞ্ছিতজন যেরকম বার বার চেষ্টা করেও অপমানের কটুবাক্য মন থেকে সরাতে পারে না।
এমন সময় চাটুয্যে এক ঢাউস প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে উপস্থিত। তার সর্বাঙ্গ থেকে উত্তেজনা ঠিকরে পড়ছে। মুখে শুধু এলাহি ব্যাপার, পেল্লায় কাণ্ড। বুঝলুম, মামাকে উদ্ধারে সত্ত্বার্যে, কিংবা নিমতলার সকারে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু চাটুয্যে ঢাউস গাড়ি পেল কোথায় পায় তো কুল্লে পঞ্চাশ টাকা, খাদি প্রতিষ্ঠানে।
গলির বাইরে থেকে শুনতে পেলুম তুমুল অট্টরব। বুঝলুম, গর্দিশ পেল্লায়।
ওমা, এ কী? কোথায় না দেখব, মামা লিনচট হচ্ছে– দেখি, হাজার দুই লোক হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে, হেথা হোথা কেউ কেউ পেটে খিল ধরেছে বলে ডান দিকে চেপে ধরে কাতরাচ্ছে, আরেক দঙ্গল লোক হাসতে হাসতে মুখ বিকৃত করে কাঁদছে। সে এক ম্যাস হিস্টিরিয়ার হাসির শেয়ারবাজার কিংবা এবং রেসের মাঠ। ইস্তেক চাটুয্যে হেঁড়ে গলায় চেঁচাচ্ছে চাক্কু মারছে, চাক্কু মাইরা দিছে!
