বাধা দিয়ে বললে, কিন্তু—
আমি বললুম, মেলা ঘেউ ঘেউ করো না। শোনো।
চতুর্থত, তুমি ফিলিম দেখতে যাও, আর আমি ফিলিমের কাগজে লিখতে পারব না?
পঞ্চমত, তুমি জানতে কী করে আমি জলসায় লিখেছি? লোকমুখে?
ছেলেটি সত্যবাদী। বললে, না, নিজে পড়েছি।
আমি বললুম, লাও! তুমি যে কাগজ পড় আমি সেটাতে লিখব না? তবে কি তুমি জলসাতে অশ্লীল লেখার সন্ধানে গিয়ে আমার লেখা পড়ে হতাশ হয়েছ? তবে কি ফিল্মের কাগজে শ্লীল লেখা, তথাকথিত উচ্চাঙ্গ গবেষণামূলক কিংবা মডার্ন কবিতার উন্নাসিক) পত্রিকায় অশ্লীল লেখার চেয়ে ভালো?
আপনি তো প্যারাডক্সে ফেললেন। সে যে স্রোক্রাতিসের গল্প–
আমি বললুম, কোনটা?
একগাল হেসে বললে, কেন? আপনারই কাছ থেকে শোনা। নিরপরাধ সোক্রাসিকে যখন বিষ খাইয়ে মারার সরকারি হুকুম হল তখন তার স্ত্রী ক্ষান্তিপে কেঁদে বলেছিলেন, তুমি কোনও অপরাধ করোনি আর তোমার হল প্রাণদণ্ড। সোক্রাতিস বললেন, তবে কি আমি অপরাধ করে মৃত্যুদণ্ড পেলে এর চেয়ে ভালো হত?
(পাঠক সম্প্রদায় আমার সূক্ষ্ম হাত-সাফাইটি লক্ষ করলেন কি? ইদানীং আমার বদনাম হয়েছে যে, আমি একই কথা বার বার বলি। সেইটে পরের মুখে বলিয়ে অথচ নিজের শাবাশিটি কী কায়দায় নিলুম)!
তার পর বললুম, ষষ্ঠত, থাক্গে। প্রথম কারণটাই যথেষ্ট। ন্যায়শাস্ত্রও তাই বলে, প্রথম কারণ যথেষ্ট হলে অন্য কারণে যাবে না। সেই ইরানি গল্পটি শোনোনি
অনেক কালের কথা। ইরানে তখন ইংরেজের এমনই আধিপত্য যে, হুকুম ছিল ইরানের বৃহত্তম বন্দরেও যদি ইংরেজের ক্ষুদ্রতম মাল জাহাজ পৌঁছয় তবে তার সম্মানে কামান দাগতে হবে। এখন হয়েছে কী, ঘটনাক্রমে একটি ইরানি ছোকরা ফরাসি দেশে লেখাপড়া সেরে এসে আপন দেশে ছোট্ট একটি বন্দরে প্রধান আপিসারের কর্ম পেয়েছে। ফরাসি দেশে সে আবার শিখে ফেলেছে মেলা বড় বড় কথা, সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা, আরও বিস্তর যা তা। মাথা গরম।
প্রথম দিনেই সেই বন্দরে এসেছে এক বিরাট মানওয়ারি জাহাজ ব্যাটল শিপ না কী যেন কয়! ছোকরা কামান দাগলে না, পাড়ে গিয়ে জাহাজের অভ্যর্থনা জানালে না।
আধঘণ্টা যেতে না যেতেই তার দফতরে দুম্ দুম করে ঢুকলেন জাহাজের অ্যাডমিরাল না কী যেন চাই আপিসার। মুখ লাল, গোঁফ লাল, দাঁত পর্যন্ত লাল।
ইরানি ইয়াংম্যান। অতএব অতিশয় ভদ্র। দাঁড়িয়ে উঠে বিস্তর বজুর, ইত্যাদি জানালে। ইংরেজ শুধু চেঁচাচ্ছে, কামান দাগলে না কেন, ইউ, ইউ ইত্যাদি।
ছোকরা বললে, স্যার, ইয়োর অনার, একসেলেন্সি, শান্ত হয়ে বসুন। কামান না দাগার বাইশটি কারণ ছিল। না বসলে বলি কী করে?
ইংরেজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজেই কামান দাগার মতো চেঁচিয়ে বললে, বলে যাও বাইশটা কারণ।
ছোকরা বললে, প্রথম কারণ : বারুদ ছিল না।
ইংরেজ ঝুপ করে চেয়ারে বসে পড়ে বললে, ব্যস্! আর একুশটা কারণ বলতে হবে না। একটাই যথেষ্ট। বারুদ ছিল না, কামান দাগবে কী করে!
তার পর বললুম, গল্পটা মনে রেখো। কাজে লাগবে। বিশেষ করে যখন তোমার হাতে থাকবে মাত্র একটি কারণ– বাইশটে নেই। সদম্ভে গল্পটি বলে এমনভাবে তাকাবে যেন তোমার হাতে আরও পঞ্চশত তর্কবাণ ছিল।
বাবাজি গলায় এক ঢোক চা ফেলে এমনভাবে কোঁত করে গিললে যে, মনে হল আমার উপদেশটি ট্যাবলেটের মতো সঙ্গে সঙ্গে পেট-তল করলে। তার পর শুধালে, আপনি ফিল্মি কাগজে লেখেন অথচ ফিল দেখতে যান না, তার কারণটা কী?
আমি অনেকক্ষণ চুপ করে ভাবলুম। এ বিষয় নিয়ে এই যে আমি প্রথম ভাবলুম তা নয়। এবং এটা শুধুমাত্র একলা আমারই ভাবনা, তা-ও নয়।
বাবাজি ফের বললে, দিশি ফিল্মের স্ট্যান্ডার্ড বিদেশির মতো নয় বলে?
এটার উত্তর আমি জানি। বললুম, কে বললে তোমায় বিদেশি ছবির মান উঁচু। বিদেশি ছবির ভালোগুলো আসে এ দেশে। ওদেশের নিজের কনজস্পশনের ছবি তো তুমি দেখনি। সেগুলো যে কী রদ্দি তা তো তুমি জানো না। আর ওরা ভাবে আমাদের সব ছবিই সত্যজিৎ রায়ের তৈরি।
তা হলে?
আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললুম, এ এক বিরাট সমস্যা। তার পুরো ধাক্কা এদেশে এখনও এসে লাগেনি। ইয়োরোপ-আমেরিকার গুণী জ্ঞানীরা রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়েছেন, পঁচিশ বৎসর পরে ঐতিহাসিকরা কি শেষটায় বলবে, সভ্য মানুষের পতন আরম্ভ হয়েছিল বিংশ শতাব্দীতে? এ যুগের সিনেমা, ট্র্যাশ নভেল, অশ্লীল সাহিত্য, বাচ্চাদের জন্য রগরগে খুন-ডাকাতির ছবির বই তো ছিলই– এখন এসে জুটেছে টেলিভিশন।
আইন করে বন্ধ করে দেয় না কেন?
আমেরিকাতে এমেরিকান সিভিল লিবার্টিস ইউনিয়ন নামক একটি নাগরিক স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠান আছে। যখনই কোনও অশ্লীল পুস্তক বা ওই-জাতীয় কোনও জিনিসের বিরুদ্ধে পুলিশ মোকদ্দমা করে তখন ওই প্রতিষ্ঠান এসে পুলিশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলে, পুলিশ সাহিত্যিকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। সরকার পক্ষের উকিল যখন প্রত্যুত্তরে বলেন, এসব রাবিশ সাহিত্য নামের উপযুক্ত নয়, তখন অন্যপক্ষ বলে, সে হচ্ছে নিছক রুচির কথা। বিপদ আরও এক জায়গায় রয়েছে। পুলিশপক্ষ এখনও এমন একটা সংজ্ঞা বের করতে পারেনি যা দিয়ে শ্লীল-অশ্লীলের পরিষ্কার পার্থক্য করা যায়। এ নিয়ে দুঃখ করে কী হবে; সংস্কৃত অলঙ্কারশাস্ত্রেও এ নিয়ে বিস্তর আলোচনার পর গুণীরা একমত হয়ে বলতে পারেননি শ্লীল-অশ্লীলে পার্থক্য করা যায় কী প্রকারে বলেছেন আমাদের বাঘা পণ্ডিত গোঁসাইজি। ইয়োরোপ-আমেরিকায় আবার আরেক বিপদ। যারা ডাহা অশ্লীল জিনিসের সামান্যতম প্রতিবাদ জানান তাদের বিরুদ্ধে অমনি মার মার কাট কাট অট্টরব জেগে ওঠে–সঙ্গে সঙ্গে তারা গুটিকয়েক চোখা চোখা বাক্যবাণ শুনতে পান– এরা প্রগতির শত্রু, এরা আর্টের শত্রু। এ পক্ষে যে সবাই স্বার্থপর নীচ লোক রয়েছে তা নয়। ভালো ভালো ডাক্তারেরা বলেছেন, অশ্লীল সাহিত্য, খুনোখুনির ছবি ওইসব জিনিস তৃষ্ণার্ত জনের নৈতিক স্বাস্থ্য উন্নতি হয়তো নাও করতে পারে কিন্তু ওইসব দেখেশুনে তাদের নৈতিক ব্যালানস অনেকটা রক্ষা পায়। তখন প্রশ্ন উঠবে, কিন্তু যারা ওসব জিনিস সম্বন্ধে তৃষ্ণার্ত নয় তাদের হাতে পড়লে? উত্তরে এঁরা বলেন, তাদের যে কোনও ক্ষতি হয় সেটা তো কোনও সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কোনও কমিশন, কোনও তদন্ত করে প্রমাণ করতে পারেননি।
