তার পর ইংরেজ, যুগো শ্লোভ, সুইডিশ ও জর্মন লেখকরা আপন আপন দেশ থেকেই টেলিফোনযোগে আপন আপন মন্তব্য সুইডেনে পাঠালেন ও সেখানকার বেতার কেন্দ্র থেকে সেগুলো বিশ্ব-সংসারের জন্য বেতারিত হল।
জর্মনির হাইনরিষ বোল বললেন, ঈশ্বর রক্ষতু (ফর হেভেস্ সেক, উম্ হিমেস্ বিলে! সর্বনাশ হবে– লেখক যদি সরকারের মাইনেখোর হয়। সে সৃষ্টির কাজ করে যাবে নিছক সৃষ্টিরই জন্যে। এই আমাদের জৰ্মনিতে পঁয়ত্রিশ হাজার লেখক আছেন। (সর্বনাশ! এই সোনার বাংলায় পঁয়ত্রিশ হাজার লেখক ক্রেতা নেই)। কে এমন মাপকাঠি বের করবে যা দিয়ে স্থির করা হবে, কোন লেখক কত পাবেন? কৃতকার্য লেখকই যে মূল্যবান লেখক এ কথা বলে কে (সাকসেস এবং কোয়ালিটি সমার্থসূচক নয়)।
লন্ডন থেকে রবার্ট গ্রেভসেরও বিচলিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল, আমার আটটি সন্তান। সত্য বলতে কী, এদের পালা-পোষা আমার পক্ষে সবসময় সহজ হয়নি। তাই বলে যে-কাজ আমি এখনও আদপেই করিনি তার জন্য আগেভাগেই পয়সা নিয়ে বসব? ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, হি হু পেজ দি পাইপার কলান্ড দি টুন– যে কড়ি ফেলে সে-ই হুকুম দেয় কোন সুর গাইতে হবে। আমি আমার ইচ্ছেমতো যে সুর খুশি গাইব।
আর বেলগ্রেড থেকে উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল ডুসান মাটিকের,- না, দয়া করে চাকুরে কবি তৈরি করতে যাবেন না– আমরা কারও চাকরি করিনে। কবিতা রচনা করা আর ফর্ম ফিল্ আপ করা এক কাজ নয়। মানুষকে লেখক হবার জন্য জোর করা যায় না, কবিতা রচনা করার সময় কোনও কবি কর্তব্যবোধ থেকে তা করে না, বরঞ্চ সে রচে যখন ভিতরকার তাড়না সে আর থামিয়ে রাখতে পারে না। কী করে মানুষ যে কবিকে সরকারি চাকুরে বানাবে তা তো আমার বুদ্ধির অগম্য…।
এসব নিদারুণ মন্তব্য শোনার পরও কিন্তু সুইডেনের ঔপন্যাসিক ফলকে ইসাকসন তার সুইডিশ নৌকোর হাল ছাড়লেন না, অর্থাৎ সরকারি সাহায্যের প্রস্তাবটা। বললেন, কত ভালো লেখক দৈনন্দিন জীবনধারণ সমস্যায় এমনই ভার-গ্রস্ত যে, লেখার কাজ করে উঠতে পারেন না। সরকারের কিছু একটা করা উচিত…। তার মানে এই নয়, সুইডেনের সব লেখকই এই মত পোষণ করেন। জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক আকে ভার্সিং বলেছেন, প্রচুর, প্রচুর আমি শিখেছি মানবচরিত্রের, গড়ে তুলেছি আমার জীবনদর্শন, আমার জীবনের পেশা থেকে। এঁর পেশা দারোয়ানি। অর্থাৎ বাড়ির দরওয়ান। পত্রলেখক জাৎসার চিঠি শেষ করেছেন এই মন্তব্য করে, বাড়ির দরওয়ানই যদি এত ভালো লেখে তবে চিন্তা করো তো বড় হোটেলের পোর্টার (দরওয়ানই তো) আরও কত শতগুণে ভালো লিখবে। অর্থাৎ কাকতালীয়!
লেখাটি পড়ে শোনাতে আমার একজন প্রিয় লেখক-বন্ধু আশ্চর্য হয়ে শুধোলেন, বলেন কী মশাই! ওসব দেশের পাঠক যখন প্রতিবার লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে যায় তার জন্য সরকার লেখককে পয়সা দেয়। আর এদেশের লাইব্রেরি আমার কাছ থেকে ফ্রি বই চায়! বইটার দাম পর্যন্ত দিতে চায় না।
আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেললুম। গরিব দেশ! তার পর বললুম, কিন্তু ভেবে দেখুন, না চাইলে কি আরও ভালো হত? একদম পড়তেই চায় না, সেটা কি আরও ভালো হত? প্রিয়ার বিরহ বেদনা পীড়াদায়ক; কিন্তু যার একদম কোনও প্রিয়াই নেই?
বন্ধু অধৈর্য হয়ে শুধোলেন, তোমার কাছে চাইলে তুমি কী করতে?
আমার চিত্তে সহসা কবিত্বের উদয় হল। বাইরের দিকে তাকিয়ে উদাস নয়নে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিরীক্ষণ করতে লাগলুম ॥
দেহি দেহি
কিছুদিন পূর্বে আমার এক আত্মজন এসে আমাকে শুধাল, আপনার কি অত্যন্ত অর্থাভাব হয়েছে?
আমি ইহুদিদের মতো পাল্টা প্রশ্ন শুধালুম, কেন, তোমার কি অর্থ প্রাচুর্য হয়েছে। ধার দেবে? সে ধনী আমি জানি।
বললে, সিনেমার কাগজে যে লিখেছিলেন!
আমি বললুম, আমার যতদূর জানা আছে, একমাত্র এই বাঙলা দেশেই বহু সিনেমার কাগজ সাহিত্যিকদের কাছে লেখা চায়, এবং এমন দেশে সিনেমার কাগজ সাহিত্যের তোয়াক্কা তো করেই না, উল্টো ভালো ভালো সাহিত্যের কাগজ সিনেমা সম্বন্ধে লেখে। এ সম্মানটা আমাদের যতদিন দেখাচ্ছে ততদিন সেটা নেব না কেন?
দ্বিতীয়ত, এই ধরো তোমার মনিহারি দোকানে আমরা পাঁচজন যাই, দর কষাকষি করিনে। ওই সময়ে গাঁয়ের খদ্দেরও ভয়ে বেশি দরদর করে না। ফলে তোমার দোকানের টোন্ অন্য দোকানের চেয়ে ভালো হয়নি– বুকে হাত দিয়ে কও! অন্য দোকানে এখনও মেছোহাটার দরাদরি ভুল বললুম– মেছোহাটেও এখন দর কষাকষি বিস্তর কমে গেছে, যবে থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণি চাকর না পাঠিয়ে নিজেরা বাজার যেতে আরম্ভ করেছে। ভালো সাহিত্যিকরা–আমার কথা বাদ দাও–যতদিন জলসাতে লিখবে ততদিন তো সে কুরুচির প্রশ্রয় দিতে পারবে না।
তৃতীয়ত, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ কুন্তলীন তেলের পুরস্কার পাবার জন্য সেখানে কম্পিট করেছিলেন। তেলের ব্যবসার দোকান ও ফিল্মের কাগজে তফাতটা কি?
বাকিটা বলার পূর্বেই বাবাজি শুধালেন, আপনি কি রবীন্দ্রনাথ?
আমি তৈরি ছিলুম। বললুম, এর উত্তর আমি জানি, বাঙলা দেশ জানে– তুমি বুঝি জানো না–?
সেই যে গল্প আছে;– দুই বন্ধু রাস্তা দিয়ে যাবার সময় কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনে একজন ভয় পাওয়াতে অন্য জন সাহস দিয়ে বললে, ইংরেজি প্রবাদ জানিস,- বার্কিং ডগ ডাজ নট বাইট- যে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে সে কামড়ায় না। দ্বিতীয় জন বললে, প্রবাদটা তুই জানিস, আমিও জানি। কিন্তু কুকুরটা কি জানে? আমি রবীন্দ্রনাথ নই সে কথা আমি জানি, আমার পাঠক সম্প্রদায়ও জানে– এখন প্রশ্ন তুমি জানো কি না?
