ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, আজ আমেরিকাতে অশ্লীল সাহিত্য বা ছবির বিরুদ্ধে কার্যত কোনও আইনই নেই। তাই সেদিন আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন কয়েকটি অতি আধুনিক ছাত্র- (এদের বলা হয় পোস্ট-হাইব্রাও) একখানি অশ্লীল মাসিক বের করলে অবশ্য তাদের মতে নয়, ভাইস চেন্সেলারের মতে– তখন কিছু না করতে পেরে ডাক বিভাগের শরণাপন্ন হলেন; তাদের পুরনো ঝাপিতে একটি অতিপ্রাচীন রক্ষাকবচ আছে–ডাক বিভাগ যদি মনে করেন কোনও চিঠি বা প্যাকেটে অশ্লীল বস্তু আছে তবে তারা সেটি গ্রহণ করবেন না। এই করে অন্তত কাগজটার প্রসার ঠেকানো গেল, প্রচার বন্ধ হল না।
সর্বনাশ! তা হলে উপায়? এদেশেও তাই হবে নাকি?
তুমি ভবিষ্যতের ভয় পাচ্ছ, এদিকে অনেকেই যে মনে করেন আমাদের দিশি ছবি যথেষ্ট অথবা যথা-অনিষ্ট– অশ্লীল হয়ে বসে আছে তাদের কথা ভাবছ না কেন? আমি আদপেই অস্বীকার করছিনে যে আমাদের অনেক ছবিতে অশ্লীলতার ইঙ্গিত থাকে। কিন্তু আমাদের মডার্ন কবিতায় কোনও কোনও কবি যে আর্টের নামে অশ্লীলতার চরমে পৌঁছন তার বেলা কী? তোমার যদি মনে হয়, ফিল্ম ভেবেচিন্তে বাঁদর গড়ছে, গড়ুক। তোমার দেখবার ইচ্ছে নেই, না দেখলেই হল। কিন্তু কবিরা যে শিব গড়তে বাঁদর গড়ছেন সেখানে তুমি শিব দর্শনে গিয়ে পেলে বাদর– তার কী? তার তো কোনও সেন্সর বোর্ড নেই। অথচ এরা তো রবীন্দ্রনাথ, রাজশেখর, সুকুমার রায়কে হটিয়ে দিতে পারেননি। মনমোহন সিরিজের বিক্রি বেশি, তা তারাশঙ্করের বেশি? আসলে শ্লীল হোক অশ্লীল হোক, যে বস্তু সত্য রসের (আর্টের) পর্যায়ে উঠে না সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সংস্কৃত সাহিত্যে নিশ্চয়ই বিস্তর অশ্লীল বস্তু লেখা হয়েছিল– না হলে শ্লীল-অশ্লীল নিয়ে আলঙ্কারিকেরা আলোচনা করলেন কেন? তাই আজ আশ্চর্য হই, সেসব অশ্লীল বই টিকে রইল না কেন?
তার অর্থ এই নয়, অশ্লীলতার বিরুদ্ধে আপত্তি করার কোনও প্রয়োজন নেই- অবশ্য তোমার যদি মনে হয় ফিল্মগুলোর অনেকটাই অশ্লীল। আমি অন্য কথাগুলো বললুম, যাতে করে তুমি ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নিরাশ না হও। গণতন্ত্র যখন করেছ তখন গণ-কলচর, গণসাহিত্য, গণ-ফিল্ম হবেই হবে। তার জন্য তৈরি থাকা উচিত। কিন্তু গণতন্ত্রের তুমি আমি দু জনেই যখন গণ তখন আমরা আমাদের রুচি অনুযায়ী আমাদের যেখানে যেখানে বাধে সেখানে আপত্তি জানিয়ে যাব। আর সত্যজিৎ রায় তো আছেনই। তাঁর নীরব আপত্তিই তো সবচেয়ে জোরালো আপত্তি। আবার তিনিও যদি পুরিটানিজমের চূড়ান্তে পৌঁছে শুচিবায়ুগ্রস্ত হয়ে মানুষের অন্যতম ক্ষুধা যে ক্ষুধাকে কবিরা যুগ যুগ ধরে সুন্দর মধুর রূপে প্রকাশ করেছেন– উপেক্ষা করেন, তবে তিনিও উপেক্ষিত হবেন। তার কারণ মানুষ অশ্লীলতা চায়, সে নয়। তার কারণ কোনও জিনিসের চরমে পৌঁছলে সে জিনিস দিয়ে আর্ট হয় না।
তাই এক ফারসি আলঙ্কারিক আর্টের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অন্যান্য নানা মূল্যবান কথার ভিতর বলেছেন, আর্টসনাতন-ই-হদ-ই-হর চিজ। এর সব কটি কথাই বাঙলায় চলে। সনাতন=শনাক্ত করা, চেনা, জানা, হদ=হদ, সীমা; হর=প্রত্যেক, চিজ= বস্তু, চিজ। অর্থাৎ প্রত্যেক বস্তুর সীমা কোন জায়গায় সেইটে বুঝে লেখাই আর্ট সৃষ্টি করা।
***
বাবাজি চলে যাওয়ার পর অলস কৌতূহলে একখানা ফরাসি মাসিক হাতে তুললুম। নাম প্রাভ অর্থাৎ প্রমাণ–বাঙলায় এ মাসিক বের করতে হলে নাম হবে প্রামাণিক। ১৯৫০ খৃস্টাব্দে ইয়োরোপে যে কংগ্রেস ফর দি লিবার্টি অব কালচার সংস্কৃতি স্বাধীনতা সঙ্ প্রতিষ্ঠিত হয়, তার দশম অধিবেশন হয় বার্লিনে, এই জুলাই মাসে। সে অধিবেশনে সভাপতির ভাষণ দেন বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক, সমাজতত্ত্ববিদ দেনিস দ্য রুজমে– প্রাভের আগস্ট সংখ্যায় সেটি ছাপা হয়েছে। স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ব্যাখ্যান দিতে গিয়ে দ্য রুজমোঁ বলেছেন :
এই যে আমরা প্রত্যেক জিনিসের চরমতম চূড়ান্তে পৌঁছে গিয়ে এক জিনিস থেকে অন্য জিনিস আহাম্মুখের মতো আলাদা আলাদা করে রাখছি– একদিকে আর্টের সৌন্দর্যচর্চা অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবনের শ্রীহীন আয়ুক্ষয়, একদিকে কঠিন পরিশ্রম অন্যদিকে গভীর মানসিক চর্চা, একদিকে বিমূর্ত সূক্ষ্ম জ্ঞানান্বেষণ অন্যদিকে টেকনিকেল ফলিত কর্ম,- এরা যে প্রতিদিন একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বিকৃত মুখভঙ্গি করছে, এর অবসান হোক।
এর প্রয়োজন পশ্চিম মহাদেশেই বেশি। কিন্তু এখন মহাদেশকে একত্র হয়ে তাদের আপন আপন সঞ্চয় বিশ্ববাসীর উপকারের জন্য তুলে ধরতে হবে :
ইয়োরোপের চিন্তাবৃত্তিজাত ফল (যার থেকে টেকনিকেল কর্মবুদ্ধি বেরিয়েছে),
আফ্রিকার প্রাণশক্তি (যা সে বাঁচিয়ে রেখেছে, আর সকলের চেয়ে ভালো, তার সঙ্গীত, নৃত্য, ছন্দ, অনুভূতির কল্যাণে),
ভারতের আত্মা– যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত তার ঐতিহ্যগত সম্পদ।
আমার মস্তকে বজ্রাঘাত! এদিকে ইয়োরোপ হাত পেতেছে আমাদের দিকে সর্বোচ্চতম সম্পদের জন্য কে না জানে সর্বোত্তম সম্পদ আত্মার উপলব্ধি– আর এদিকে আমি মরছি আমেরিকার ভয়ে!!
নাত্যুচ্চশিক্ষা
এদেশে ছেলেদের প্রায় সবাই ম্যাট্রিক পাসের পর কলেজ পানে ধাওয়া করে। তার কারণ কি এদেশের গুণীজ্ঞানীরা উচ্চশিক্ষা চাই উচ্চশিক্ষা চাই বলে বড্ডবেশি চেঁচামেচি করেছেন বলে! তারা তো আরও বেশি হট্টগোল করে বলেন, সিনেমা ফুটবলে অত বেশি যাসনি, রকবাজি কমা, পরীক্ষার হলে আসবাব-পত্র ভাঙিসনি, কই, কেউ তো শোনে না। উচ্চশিক্ষার বেলাতেই হঠাৎ তাদের অত্যধিক মুরুব্বি-মহব্বৎ বেড়ে যাবে একথা তো চট করে বিশ্বাস করা যায় না। আসলে তারা কলেজ পানে ধাওয়া করে দুই কারণে,
