তাই এখানে সাংখ্যদর্শনের আশ্রয় নিলে কবিতাটি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বোঝবার সুবিধে হয়– রসগ্রহণ অবশ্য অন্য ক্রিয়া।
কপিল মুনির চরম বক্তব্য কথা এই যে, প্রকৃতিই আপন অধিষ্ঠাতা পুরুষকে অর্থাৎ জীবাত্মাকে মোহে আচ্ছন্ন করিয়া তাহাকে সুখ-দুঃখাদির গুণদ্বারা বন্ধন করেন, এবং প্রকৃতিই মোহান্ধকার ক্রমে ক্রমে অপসারণ করিয়া সুখ-দুঃখাদির হস্ত হইতে জীবকে নিষ্কৃতি প্রদান করেন। (২)
এই টীকাটি করেছেন রবীন্দ্রনাথের সর্বজ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর গীতাপাঠ গ্রন্থে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মতে এর মতো তত্ত্বজ্ঞানী পুরুষ তিনি তার জীবনে আর দেখেননি।(৩) পাছে পাঠক ভাবেন আমি আমার নিজস্ব টীকা দিয়ে তাঁকে অতিশয় কঠিন বস্তু সাতিশয় সরল করে বুঝিয়ে দিচ্ছি তাই দ্বিজেন্দ্রনাথের টীকা উদ্ধৃত করলুম।
তা হলে দাঁড়াল এই :
হে ছলনাময়ী (অয়ি প্রকৃতি!), তুমি তোমার আপন হাতে সৃষ্টির পথ (যে-পথ দিয়ে মানুষ চলে) বিচিত্র ছলনা দিয়ে কন্টকাকীর্ণ করে রেখেছ। (যেমন দড়ির টুকরো দেখে সাপ ভেবে আঁৎকে উঠি, আবার ঝিনুকের টুকরোটাকে কোম্পানির টাকা ভেবে উল্লাসে নৃত্য করি)। তার পর কবি এই বিচিত্র ছলনা উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করছেন, চতুর্থ ছত্রে, মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে। যে জীবন সরল বলে মনে হয়, সেখানে রয়েছে মিথ্যা বিশ্বাসের ছলনা (তাই প্রকৃতি ছলনাময়ী)। এই মিথ্যা বিশ্বাস কী সেটা রবীন্দ্রনাথ এ কবিতা লেখার সতেরো বছর পূর্বে বর্ণনা করেছেন তাঁর আপন জীবনে,
পিপাসার জলপাত্র নিয়েছে সে
মুখ হতে, কতবার ছলনা করেছে সে হেসে হেসে,
ভেঙেছে বিশ্বাস, অকস্মাৎ ডুবায়েছে সে ভরা তরী
তীরের সম্মুখে নিয়ে এসে।
আর একথা বুঝতে তো কণামাত্র অসুবিধা হয় না, সরলকেই ফাঁকি দেয় ধুরন্ধর! বিদ্যাসাগরের মতো সরল লোকই ঠকেছেন সবচেয়ে বেশি!
এর পর আবার একটুখানি সাংখ্যদর্শনে আসতে হয়। সাংখ্যাদি শাস্ত্রে যার নাম মহান দেওয়া হয়েছে সেই মহান শব্দের অর্থ বাধিত অপরিচ্ছিন্ন (বাঙলা মলিন অর্থে নয়, সংস্কৃত অর্থে অখণ্ডিত) বুদ্ধিতত্ত্ব।
এই মহান-ই চিরানন্দের পথ দেখায়।
সেই মহান-কে, হে ছলনাময়ী, তুমি মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতে
প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত
অর্থাৎ মহান-কে আচ্ছাদিত করেছ। সাংখ্যের সেই মহান-কে এখানে কবি মহত্ত্বরূপে ব্যবহার করেছেন। এর পর বোঝার সুবিধার জন্য একটি কিন্তু যোগ দিতে হবে।(৪) পড়তে হবে,
(কিন্তু) তার তরে রাখনি গোপন রাত্রি।
এরপর বাকি কবিতাটুকু সহজ; তাতে তিনটি কথা আছে :
১. যে-পথ দিয়ে জীবন ছলনা থেকে মুক্ত হয়ে শান্তির অক্ষয় অধিকার পায়, সেটা তার ভিতরেই আছে। সেটা তার অন্তরের পথ।
২. সে যখন মানুষকে সরল বিশ্বাস করে ঠকবে, সে হয়তো জানতেই পারবে না যে বুদ্ধিমতী (ছলনাময়ী) তাকে ঠকাচ্ছে, এবং অন্য লোক তার সরলতা ও ছলনাময়ীর নষ্টামি দেখে তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-ন্দ্রিপ করবে–লোকে তারে বলে বিড়ম্বিত।
৩. সে-ই শুধু শান্তির অক্ষয় অধিকার পায় যে অনায়াসে ছলনা সহিতে পারে। সেই লোক যে ছলনাময়ীকে। তা সে রমণীরূপেই দেখা দিক, আর পুরুষরূপেই দেখা দিক এসে ছলনা সে বেদনা-তিন প্রকারের হতে পারে :ক, বাহ্যবস্তু-ঘটিত ঋ, আপনা-ঘটিত কিংবা গ. দেবতা-ঘটিত অর্থাৎ অ্যাকসিডেন্টাল সে যখন তার বেদনার জন্য দায়ী দুষ্টকে কঠোর সাজা দিয়ে প্রতিহিংসা নেয় না, হাসিমুখে ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে নেয় সেই পায় শান্তির অক্ষয় অধিকার। (অবশ্য সে যখন লোকের কাছে আরও বেশি হাস্যাস্পদ, বিড়ম্বিত।}
আবার অন্তরের পথে ফিরে যাই। এ প্রবন্ধে সেইটেই মূল বক্তব্য।
এই অন্তরের পথের শেষ প্রান্তে আছেন জ্যোতির্ময় পুরুষ। কুরান শরিফও বলেন তিনি জ্যোতিস্বরূপ।(৫)
তাঁর সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ যে তার জীবনে কতবার উল্লেখ করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। তিনিই জীবন-দেবতা। যে পাঠক জীবন-দেবতা জাতীয় কবিতা কঠিন বলে মনে করেন তিনি যেন গল্পে গল্পে বলা– ওই বিষয় নিয়েই সিন্ধুপারে (চিত্র) কবিতাটি পড়েন। কবি এক গভীর রাত্রে হঠাৎ ডাক শুনতে পেয়ে, ঘুম থেকে জেগে উঠে, দুরুদুরু বুকে বাইরে এসে দেখেন, কৃষ্ণ অন্তে বসে আছে এক রমণীমূরতি- আরেক অশ্ব দাঁড়ায়ে অদূরে পুচ্ছ ভূতল চুমে। কবিকে নিয়ে রমণী উধাও বিদ্যুৎ বেগে ছুটে যায় ঘোড়া। তার পর কী হল, পাঠক নির্ভয়ে পড়ে নেবেন, ঠিক কথা ও কাহিনীর গল্পের মতো সরল সাসপেন্স নষ্ট হবে বলে আমি আর বাকিটা বললুম না।
একে তিনি ঠিক চিনতে পারেননি বলে রবীন্দ্রনাথ বার বার দুঃখ করেছেন :
জানি, জানি আপনার অন্তরের গহনবাসীরে
আজিও না চিনি।
এবং এই ধরনের ক্ষোভ ও আক্ষেপ কবি বহু শত বার করেছেন। এ নিয়ে কৌতূহলী তরুণ পাঠক চর্চা করলে উপকৃত হবেন।
তা হলে প্রশ্ন, এই অন্তরের পথ ধরে তিনি সেই অন্তরের গহনবাসীর সম্মুখীন হলেন না কেন?
ভার অসাধারণ চরিত্রবল ছিল, জীবনমরণ পণ করে যে কোনও সাধনার পথে এগিয়ে যাবার মতো বিধিদত্ত বীর্যবল তার ছিল, তিনি জিতেন্দ্রিয় পুরুষোত্তম ছিলেন– এসব কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। ঋষিতুল্য দ্বিজেন্দ্রনাথ তার কনিষ্ঠতম ভ্রাতার সম্বন্ধে এখানকারই এক গুরুজনকে বলেন, আমাদের সকলেরই পা পিছলিয়েছে–রবির কখনও পা পিছলোয়নি!
