***
এসব দুঃখ থেকে নিষ্কৃতির পথ কি রবীন্দ্রনাথ জানতেন না? জানতেন, খুব ভালো করেই জানতেন– অন্তত আমার মনে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
অ্যাকাডেমিক অর্থে রবীন্দ্রনাথ দার্শনিক ছিলেন না। অর্থাৎ কান্টের ধিং ই ইটসেলফ এবং বেদান্তের অ-সত্য একই বস্তু কি না, ব্ৰহ্ম যেখানে নিওঁণ সেখানে ত্রিগুণ তার ভিতরে লোপ পায়, না, তিনি তখন ত্রিগুণের অতীত এসব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ কালক্ষেপ করতেন না। কিন্তু একথা তিনি খুব ভালো করেই জানতেন ভারতীয় দর্শনের চরম আদর্শ আনন্দ। এবং সাংখ্য দর্শনের গোড়ার কথাই হচ্ছে, দুঃখের কারণ কীভাবে, ঐকান্তিকরূপে সমূলে বিনষ্ট করা যায়। আমার সঙ্গে সকলে একমত না হলেও নিবেদন করি, যোগ যত না ব্রহ্মানন্দের পথ নির্দেশ করেছেন, তার চেয়ে বেশি পথ নির্দেশ করেছেন আনাতে স্থির হয়ে আপন আনন্দময় কোষ থেকে আনন্দ আহরণ করতে। বেদান্ত প্রণবমন্ত্রের অনুসরণে ত্রিভুবনে অর্থাৎ ভূঃ, ভূবঃ স্বঃ- যা কিছু আনন্দ আছে তা ব্রহ্মে লীন আছে জেনে সেই ব্রহ্মে যযাজিত হয়ে অনন্তকালব্যাপী অনন্ত-দেশব্যাপী পরিপূর্ণানন্দে লীন হতে আদেশ দেয়।
পাঠক! মা ভৈঃ! আমি তোমাকে দর্শনশাস্ত্রের গোলকধাঁধায় ঢুকিয়ে অযথা হয়রান করতে চাইন– যদিও আমার বিশ্বাস পতঞ্জলি, কপিল, শঙ্কর তাদের মূল বক্তব্য আমাদের মতো সাধারণজনের জন্যই বলে গেছেন, এবং সামান্য একটু শ্রদ্ধাভরে এদের মূল বক্তব্য বার বার পড়লে আপাতদৃষ্টিতে যা কঠিন বলে মনে হয় সেটি সরল হয়ে যায়। অবশ্য এরা প্রত্যেকেই যেস্থলে আপন বক্তব্য প্রমাণ করতে, অন্যের বক্তব্যের সঙ্গে আপন বক্তব্যের কোনখানে গরমিল সেটা বোঝাতে গিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তর্কের অবতারণা করেছেন সেগুলো বোঝা পরিশ্রম ও ধ্যান-সাপেক্ষ। যেমন স্বাস্থ্যবান হতে হলে বৈদ্যরাজ প্রদত্ত কয়েকটি মূলসূত্র পালনই যথেষ্ট; পুরো আয়ুর্বেদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অধ্যয়ন করা পরিশ্রমসাপেক্ষ ও নিষ্প্রয়োজন।
এসব তত্ত্ব রবীন্দ্রনাথ খুব ভালো করেই জানতেন।
এবং সেটা প্রমাণ করা কঠিন নয়।
***
রবীন্দ্রনাথ তার জীবনের শেষ কবিতা রচনা করে যান অস্ত্রোপচারের কয়েক ঘন্টা পূর্বে। এবং সকলেই জানেন, সে অস্ত্রোপচার ব্যর্থকাম হয়, ও কবি অন্য কোনও রচনাতে হাত দিতে পারেননি। এ কবিতা সকলেই পড়েছেন, তবু আলোচনার সুবিধার জন্য এটি তুলে দিচ্ছি :
তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে
হে ছলনাময়ী।
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে
সরল জীবনে!
এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত;
তার তরে রাখনি গোপন রাত্রি।
তোমার জ্যোতিষ্ক তারে
যে-পথ দেখায়।
সে যে তার অন্তরের পথ,
সে যে চির স্বচ্ছ,
সহজ বিশ্বাসে সে যে
করে তারে চির সমুজ্জ্বল।
বাহিরে কুটিল হোক অন্তরে সে ঋজু,
এই নিয়ে তাহার গৌরব।
লোকে তারে বলে বিড়ম্বিত।
সত্যেরে সে পায়
আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে।
কিছুতে না পারে তারে প্রবঞ্চিতে,
শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে
আপন ভাণ্ডারে।
অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে
শান্তির অক্ষয় অধিকার।
—শেষ লেখা, ৩০ জুলাই ১৯৪১
এস্থলে প্রথমেই বলে রাখা ভালো, রবীন্দ্রনাথ কোনও বিশেষ দার্শনিক তত্ত্ব বা বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণ করবার জন্য কবিতা লিখতেন না। একথা তিনি নিজেও একাধিকবার বলেছেন। কবিতা তার নিজের মহিমায় মহিমময়ী, দর্শন বিজ্ঞান এমনকি ধর্মের সেবা-দাসী হয়েও সে তার চরম মোক্ষের অনুসন্ধান করে না (ধর্মও ঠিক সেইরকম দর্শন বা বিজ্ঞানের মুখাপেক্ষী নয়)। কাল যদি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তাবৎ ঐতিহাসিক কড়ায় কড়ায় প্রমাণ করে দেন যে কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধ আদৌ হয়নি, কৃষ্ণার্জুন সংবাদের তো কথাই ওঠে না, তা হলেও গীতার মূল্য কানাকড়ি কমবে না। মধুসূদন যখন উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু হায়!
তখন তিনি একথা সপ্রমাণ করতে কোমর বাঁধেননি যে, আশার ছলনে ভুলতে নেই। বস্তৃত তিনি তার পরও আশার ছলনে ভুলেছেন, বেঁচে থাকলে আরও ভুলতেন এবং না ভুললে আমাদের ক্ষতি হত।
আপাতদৃষ্টিতে আমাদের মনে হয়, পৃথিবী নিশ্চল এবং ধ্রুবতারা স্থির। বৈজ্ঞানিকরা কিন্তু বলেন, এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড- মায় ধ্রুবতারা প্রচণ্ড গতিবেগে কোনও অজানার দিকে যে ধেয়ে চলেছে সে খবর কেউ জানে না। তাই বলে রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন,
দেখিতেছি আমি আজি
এই গিরিরাজি,
এই বন, চলিয়াছে উন্মুক্ত ডানায়
দ্বীপ হতে দ্বীপান্তরে, অজানা হইতে অজানায়।
তখন তিনি কোনও বৈজ্ঞানিক সত্য মস্তিষ্ক দিয়ে বুঝে, তার পর হৃদয় দিয়ে অনুভব করে সেটি কবিতার রসে প্রকাশ করছেন না। এটা প্রত্যক্ষ অনুভূতি, পুত্রশোকে মাতার কাতরতা যেমন সোজা অনুভূতি, প্রিয়জনবিরহ আমাদের বুকে যেরকম সরাসরি বেদনার অনুভূতি এনে দেয়, সেইরকম।
তাই যখন কবি বলছেন তোমার সৃষ্টির পথ বিচিত্র ছলনাজালে আকীর্ণ করে রেখেছ তখন তিনি একটি সহজ সত্য অনুভব করেছেন। এটি দার্শনিক গবেষণা নয়।
এখন প্রশ্ন, এই ছলনাময়ীটি কে?
তিনি পরব্রহ্ম হতে পারেন না, কারণ তার লিঙ্গ নেই, এবং এ-স্থলে শব্দটি পরিষ্কার স্ত্রীলিঙ্গে আছে।
