তবে শেষদিন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ সে সাধনা করলেন না কেন, যাতে করে তিনি দুঃখবেদনার ওপারে চলে যেতে পারেন?
আমার মনে হয় এবং পাঠককে সাবধান করে দিচ্ছি, এইখানে এসে আপনার সঙ্গে আমার মতের মিল না-ও হতে পারে তা হলে তাকে কাব্যলক্ষ্মীর কাছ থেকে বিদায় নিতে হয়। আমার দুঃখানুভূতি হবে, আমার আনন্দোল্লাস হবে, পুত্রবিয়োগে, সন্তানহারা মাতার হাহাকারে আমার অনুভূতির কেন্দ্র, আমার হৃদয়ের অন্তরতম প্রদেশ উদ্বেলিত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠবে তবে তো আমি সেটাকে রসস্বরূপে প্রকাশ করতে পারব। যদি মহাপুরুষের বাণী
‘সর্বদা নিত্য প্রত্যক্ষ আত্মনে তন্ময় হয়ে থাকবে’
বরণ করে নিই, তবে সুখদুঃখ আমাকে স্পর্শ করবে কী করে?
প্রাচীন যুগের কথা বলা কঠিন। এ যুগে দেখতে পাচ্ছি, যে-দ্বিজেন্দ্রনাথ (শুনেছি মধুসূদনের মতো কবি তার কবিতা পড়ে বলেছিলেন, ওই একটিমাত্র লোক কবিতা লিখতে পারে; হ্যাট অফ টু দ্যাট ম্যা–তাকে নমস্কার) স্বল্পপ্রয়াণের মতো অতুলনীয় কাব্য রচনা করে বান্দেবীর বরপুত্ররূপে স্বীকৃত হলেন, তিনি যেদিন থেকে তাঁর অন্তরের পথের প্রয়াণ আরম্ভ করলেন, সেদিন রুদ্ধ হল– কিংবা আপন হাতেই তিনি রুদ্ধ করলেন গোলাপের-পাপড়ি-ছড়ানো পথের শেষের (প্রিমরোজ পাথ টু ইটানেল বন-ফায়ার) কাব্যলক্ষ্মীর দেউল-দ্বার। স্বামী বিবেকানন্দের অতুলনীয় সৃজনীশক্তি ছিল; প্যারিসে (বোধ হয়) তিনি একখানা উপন্যাসও আরম্ভ করেছিলেন শেষ করলেন না কেন? শ্রীঅরবিন্দও কবিতা রচেছিলেন, কিন্তু সে তো গায়ত্রীর সমগোত্র আপনার আমার নিত্যদিনের হাসিকান্নার সন্ধান তাতে কোথায়? ঠাকুর রামকৃষ্ণ, দক্ষিণভারতের রমণ মহর্ষি উভয়ই এ যুগের বিখ্যাত পরমহংস, জীবন্মুক্ত। সাধারণজনের সুখদুঃব নিয়ে এর আলোচনা করেছেন অতি ললিত মধুর ভাষায় কিন্তু সে তো রসসৃষ্টি নয়।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, দাসী মুনিব-বাড়িতে কাজ করে নিতভাবে, কিন্তু তার মন পড়ে থাকে আপন বাড়িতে আপন বাচ্চার কাছে। আমরা এ সংসারের কর্তব্য-কর্ম করব দাসীর মতো, কিন্তু মন পড়ে রইবে ব্রহ্মার পদতলে!
এই উপদেশ নিয়ে কারও মনে কোনও সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রশ্ন, দাসীকে যদি আদেশ করা হয়, তাকে কাপড় কাঁচা বাসন মাজার মেকানিক্যাল রুটিন কাজ নয়, তন্ময় হয়ে গাইতে হবে গান, কিংবা উদ্ভাবন করতে হবে কাঁথা সেলাইয়ের নিত্য-নব প্যাটার্ন পারবে কি সে? দাসী কেন, যদি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে বলা হত, জমিদারি চালানো বা ছাত্র-অধ্যাপনা নয়– এগুলো মোটামুটি মেকানিক্যাল কাজ– তোমাকে তনয় হয়ে গাইতে হবে গান কিংবা রচতে হবে কবিতা অথচ তোমার সর্বসত্তা পড়ে থাকবে পক্ষের পদপ্রান্তে, তবে তিনি কি সেটা পারতেন? এই ডবল তন্ময়তা কি সম্ভবপর হয়তো ধর্মসঙ্গীত রচনার সময় সম্ভবপর (যদিও কেউ কেউ বলেন, তাঁর ধর্মসঙ্গীত অনবদ্য হলেও তার প্রেম বা প্রকৃতি সঙ্গীতের তুলনায় নিচে} কিন্তু হৃদয়ের গভীরতম বেদনার স্মরণে তন্ময় হয়ে সে-বেদনাকে সর্বাঙ্গসুন্দর, বিশ্বজননমস্য রূপ দিয়ে সৃষ্টি করা কি সম্ভবপর দুঃখে যে-জন অনুদ্বিগ্নমনা, সুখে যে জন বিগতস্পৃহ সে তো শান্ত; শান্ত রস কি রস? খ্রিস্টান মিষ্টিক তরুণ সাধককে বলেছেন, যা বলার এই বেলা বলে নাও। ব্রহ্মপ্রাপ্তির পর যে অভূতপূর্ব আনন্দ পাবে তখন আর কোনও কিছু বলতে চাইবে না।
চতুর্দিক থেকে তারস্বরে প্রতিবাদ উঠবে– আমি জানি তবু ক্ষীণকণ্ঠে নিবেদন করে যাই, রবীন্দ্রনাথ সেই ব্রহ্মানন্দে লীন হতে চাননি। তিনি আমাদের মতো পাপীতাপীদের যে ভাঙা নৌকা, সেটা ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে চাননি। সুখের মলয় বাতাসে ঝাবাতের ক্র আঘাতে নিমজ্জমান তরীতে বসে তিনি আমাদের শুনিয়েছেন, আমাদেরই হৃদয়ের গীতি– যে গীতির প্রকাশক্ষমতা আমাদের নেই।
যুধিষ্ঠিরের মতো তিনিও স্বর্গারোহণ করতে চাননি।
———-
১. সত্যেন্দ্রনাথের মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ লেখেন,
যে খেয়ার কর্ণধার তোমাদের নিয়েছে সিন্ধুপারে আষাঢ়ের সকল ছায়ায়, তার সাথে বারে বারে হয়েছে আমার চেনা।– পূরবী
২. ঠাকুর রামকৃষ্ণ বোঝাতেন উপনিষদ দিয়ে : বিদ্যারূপিণী স্ত্রীও আছে আবার অবিদ্যা-রূপিণী স্ত্রীও আছে। বিদ্যারূপিণী শ্রী ভগবানের দিকে লয়ে যায়; আর অবিদ্যা-রূপিণী ঈশ্বরকে ভুলিয়ে দেয়, সংসারে ডুবিয়ে দেয়। তার মহামায়াতে এই জগৎ সংসার। এই মায়ার ভিতর বিদ্যামায়া, অবিদ্যামায়া দুই-ই আছে। বিদ্যামায়া আশ্রয় করলে সাধুসঙ্গ, জ্ঞান, ভক্তি, প্রেম, বৈরাগ্য এইসব হয়। অবিদ্যামায়া পঞ্চভূত আর ইন্দ্রিয়ের বিষয়, রূপ, রস, গ, স্পর্শ, শব্দ, যত ইন্দ্রিয়ের ভোগের জিনিস; এরা ঈশ্বরকে ভুলিয়ে দেয়। উপনিষদে আছে: অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যে অবিদ্যামুপাসতে,
ততো ভূয়ো ইব তে তমো য উ বিদ্যায়াং রতাঃ।
অর্থাৎ,
যাহারা অবিদ্যার উপাসনা করে তাহারা অন্ধ তিমিরে প্রবেশ করে।
তাহা অপেক্ষা আরো ঘোরতর অন্ধ তিমিরে প্রবেশ করে যাহারা বিদ্যায় রত।
—দ্বিজেন্দ্রনাথের অনুবাদ।
এখানে স্পষ্টত একটা দ্বন্দ্ব রয়েছে। সেটা সরল হয়, কান্ট যেটাকে thing-in-itself বলেছেন সেটাকে অবিদ্যা অর্থে নিলে। দ্বিজেন্দ্রনাথ সেই অর্থে নিয়েছেন। তার মতে, এই জিনিসই সাংখ্যের অচেতন প্রকৃতি, শোপেন-হাওয়ারের অন্ধ will, Mill-এর ইন্দ্রিয়চেতনার অধিষ্ঠাত্রী নিত্যাশক্তি, ইংরাজিতে Permanent possibility of sensation, বেদান্তের সদৃসদৃভ্যামনির্বাচনীয়া অবিদ্যা। সাংখ্য নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতাটি বুঝবার চেষ্টা করলে সরল হয় বলে আমি সাংখ্য নিয়েছি।
