আজ বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় সরকারের অর্ধদানের ওপর নির্ভর করে, কিন্তু তার মূল্য যতই হোক না কেন, বিধুশেখর-ক্ষিতিমোহন যে মূলধন তাদের গুরুদেবের পদপ্রান্তে রেখেছিলেন তার ওপর নির্ভর করে চিন্ময় মৃন্ময় ধ্যানে এবং কর্মকাণ্ডে অদ্যকার ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিশ্বভারতী। অদ্য বাজশতান্তে সে যতই পরিবর্তিত হোক না কেন, এদের কাছে বিশ্বভারতী চিরঋণী।
———-
১. এদের ছাড়া আরও বহু পণ্ডিতের নাম করতে হয়। তাদেরই একজন কোষকার স্বর্গত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ইনি যৌবনকাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শান্তিনিকেতনেই বসবাস করেন। অন্যজন ভগবদ্কৃপায় এখনও আমাদের মাঝখানে আছেন। গোস্বামীরাজ নিত্যানন্দবিনোদ। ইনি। ১৯২০/২১ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিস্তর শাস্ত্রালোচনা করেন।
২. বিধুশেখরের পালি ও আবেস্তাচর্চা, ক্ষিতিমোহনের পালিচর্চায় রবীন্দ্রনাথই প্রধান উৎসাহদাতা। হয়তো-বা ভুল বলা হবে না, রবীন্দ্রনাথের আদেশেই বিধুশেখর আবেস্তাচর্চা আরম্ভ করেন।
রবীন্দ্রনাথের আত্মত্যাগ
কেউ দেশের জন্য প্রাণ দেয়, কেউবা দয়িতের জন্য, কেউ বংশের সম্মানরক্ষার্ধে আত্মোৎসর্গ করে। যারা প্রাণ দিয়ে শহীদ হন তাদের অনেকেই তখন সুদ্ধমাত্র কর্তব্যবোধ থেকে, বিবেকের অলজ আদেশ পালন করার জন্যই নিজের জীবন বিসর্জন দেন। আবার কেউ কেউ তাবেন, কর্তব্যকর্ম না করলে তারা মুক্তি-মোক্ষ-নির্বাণ থেকে বঞ্চিত হবেন।
এদেশে সাধারণজনের ধারণা, মুক্তি বা মোক্ষের অর্থ নাসিকার্যে মনোনিবেশ করে কঠোর-কঠিন সাধন। অথচ আমাদের দেশে সর্ব দার্শনিক সর্ব ঋষি একবাক্যে বলেছেন মানুষের চরম কাম বা মোক্ষ বলতে বোঝায় পরিপূর্ণ, নিরবচ্ছিন্ন আনন্দ যে আনন্দের সঙ্গে পার্থিব কোনও সুখেরই তুলনা হয় না। মুসলমান সাধকরা ওই কথাই বলেছেন, এবং ইহুদি মহাপুরুষ তো স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, As the bridegroom rejoiceth over the bride, so shall the Lord rejoice over thee এবং এইটিই খ্রিস্টানদের মূলমন্ত্র।
কয়েক মাস পূর্বে আমি মৃত্যু–হয়তো শোক বললে ভালো হতো নাম দিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখি এবং রবীন্দ্রনাথের জীবনে মৃত্যুদূত বার বার এসে তাকে যে কী গভীর বেদনা দিয়েছে তার বিবরণ দিই। আরও বহু, বহু বেদনা তিনি পেয়েছেন, যার স্মরণে আপন জন্মদিন উপলক্ষে পিছন পানে তাকিয়ে বলছেন–
পায়ে বিঁধেছে কাঁটা
ক্ষতবক্ষে পড়েছে রক্তধারা।
নির্মম কঠোরতা মেরেছে ঢেউ
আমার নৌকার ডাইনে বাঁয়ে,
জীবনের পণ্য চেয়েছে ডুবিয়ে দিতে
নিন্দায় তলায়, পঙ্কের মধ্যে।(১)
এসব কিছু তিনি সয়ে নিয়েছিলেন তার অসাধারণ চরিত্রবল দিয়ে।
কিন্তু সবচেয়ে বেদনা পেয়েছেন, যখন তার আত্মজন পেয়েছে আঘাত। যেখানে তাকে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হয়েছে, বেদনা-বেদনায় সে আত্মজনের ধূলিতলে অবলুণ্ঠন। সান্ত্বনা দেবার মতো ভাষাও খুঁজে পাননি তখন। নিজের বেলা তিনি অন্তরের দিকে তাকিয়ে নিরাশ হননি, কিন্তু আত্মজনের বেলা?
বলা হয়, পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন শোক পায় মা, যখন সে পুত্রহারা হয়। এবং সে মা-ও যদি দুঃখিনী হয়, এবং ওই পুত্ৰই যদি একমাত্র পুত্র হয়। এবং তার চেয়ে নির্মম আঘাত পান যদি সে মাতার আপন পিতা জীবিত থাকেন তবে তিনি। রবীন্দ্রনাথের বেলা তাই হয়েছিল। দুর্ভাগিনীকে মনক্ষুর সামনে রেখে বলছেন–
তোমার সম্মুখে এসে, দূর্ভাগিনী, দাঁড়াই যখন
নত হয় মন।
যেন ভয় লাগে
প্রণয়ের আরম্ভেতে স্তব্ধতার আগে।
এ কী দুঃখভার,
কী বিপুল বিষাদের স্তঙ্কিত নীরন্ধ্র অন্ধকার
ব্যাপ্ত করে আছে তব সমস্ত জগৎ
তব ভূত ভবিষ্যৎ।
প্রকাণ্ড এ নিষ্কলতা
অভ্রভেদী ব্যথা
দাবদগ্ধ পর্বতের মতো
খররৌদ্রে রয়েছে উন্নত
লয়ে নগ্ন কালো শিলাস্তূপ
ভীষণ বিরূপ।
কী হৃদয়ভেদী তুলনা! যেন আগ্নেয়গিরি থেকে বেরিয়ে এসেছে লাভা হয়ে মাতার বাসল্যরস! তার পর সে মায়ের আকুলিবিকুলি
সব সন্ত্রনার শেষে সব পথ একেবারে
মিলেছে শূন্যের অন্ধকারে;
ফিরিছ বিশ্রামহারা ঘুরে ঘুরে,
খুঁজিছ কাছের বিশ্ব মুহূর্তে যা চলে গেল দূরে
খুঁজিছ বুকের ধন সে আর তো নেই
বুকের পাথর হল মুহূর্তেই।
এর চেয়ে নিদারুণতর বর্ণনা আর মানুষ কী দিতে পারে মায়ের পুত্রশোকের? আমার লেখাপড়া সীমাবদ্ধ। পাঠক, তুমি যদি পেয়ে থাকে, তবে সেটি আমায় পাঠিও। না, ভুল বললুম, পাঠিও না! পড়ে দরকার নেই।
চিরচেনা ছিল চোখে চোখে
অকস্মাৎ মিলালো অপরিচিত লোকে।
স্বল্পপরিচিত জনের মৃত্যুসংবাদ শুনেই আমরা শোকে, এক অজানা আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যাই আর, এখানে কল্পনা করুন যে বাচ্চাটিকে মা ক্ষণতরে চোখের আড়াল হতে দিত না, যার কণ্ঠস্বরের সামান্যতম রেশ, যার ক্ষুদ্রতম অঙ্গভঙ্গি তার চেনা, আর সে যখন হঠাৎ খেলা ছেড়ে ছুটে এসে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলত, মা, সে হঠাৎ নেই হয়ে গেল? চিরতরে এ মহাশূন্যতা কল্পনায় এ যে আপন মৃত্যুযন্ত্রণার চেয়েও নির্মম!
কিন্তু তার পর শুনুন, বীভৎসতার চূড়ান্ত :
দেবতা যেখানে ছিল সেথা জ্বালাইতে গেলে ধূপ,
সেখানে বিদ্রূপ।
চরম দুঃখে মা যখন কোনও সান্ত্বনা পেয়ে তার পুজোর ঘরে মাথা কুটতে গেল–ইষ্টদেবতার সামনে, যে-দেবতা যুগ যুগ ধরে এ-বংশের কত না দুঃখী, কত না দুঃখিনীর চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছেন, সে-দেবতা তখন যদি লজ্জায় গা-ঢাকা দিতেন তা-ও কিছু বিচিত্র হত না, কিন্তু তার চেয়েও পৈশাচিক পরিস্থিতি। দেবতার জায়গায় হনুমান বসে মায়ের লোকের দিকে ভেংচি কাটছে।
