বিধুশেখর তবু তার ব্রহ্মচর্যাশ্রমাদর্শে আকণ্ঠ আলিঙ্গনাবদ্ধ।
রবীন্দ্রনাথ বললেন, হ্যারিকেন লণ্ঠন যখন আশ্রম ব্যবহার করেছে, বিজলিই-বা করবে না কেন?
বিধুশেখর বললেন, রেড়ির তেলে আমি সানন্দে ফিরে যাব। হ্যারিকেন আর রেড়ির তেল প্রায় একই বিজলির তুলনায়। বিজলি আনবে বিলাস। তার সর্বনাশের সর্বশেষ সোপান আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
পাঠক ক্ষণতরে ভাববেন না, বিধুশেখর সঙ্কীর্ণচেতা কৃপক ছিলেন। তাঁর প্রতি এরচেয়ে নির্মম অবিচার আর কিছুই হতে পারে না। ব্যক্তিগত জীবনে খ্রিস্টান পাদ্রি এক্রুজ যার অন্তরঙ্গ সখা, ব্রহ্মমন্দিরের আচার্যের আসনে বসে যিনি মুগ্ধ কণ্ঠে যবন ইমাম গজ্জালির কিমিয়া সাদ (সৌভাগ্য-স্পর্শমণি) আবৃত্তি করে ব্রহ্মলাভের পন্থা-বর্ণনা করছেন, যিনি মৌলানা শওকত আলিকে বাহুপাশে আবদ্ধ করে আত্রম ভোজনাগারে নিয়ে যাচ্ছেন, তিনি যদি সঙ্কীর্ণচেতা হন তবে প্রার্থনা করি সর্বভারতবাসী যেন এরকম সঙ্কীর্ণচেতা হয়।
বিধুশেখর না থাকলে যে রবীন্দ্রনাথ রাতারাতি ব্রহ্মবিদ্যালয়কে অক্সফর্ডে পরিণত করতেন তা নয়। বিধুশেখর ছিলেন প্রাচীন ভারতের মৃর্তমান প্রতীক। তার সন্তুষ্টি থাকলে রবীন্দ্রনাথ আপন কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে দ্বিধাহীন হতে পারতেন। এবং যখনই তিনি বিধুশেখরকে- তা সে যত অল্পই হোক না কেন আপন মতে টেনে আনতে পারতেন তখনই তার মনে হত তিনি যেন ঐতিয়াবদ্ধ ভারতকে, তার ধর্ম থেকে তাকে বিচ্যুত না করে, বর্তমান প্রাচীন সংসারের বিশ্বনাগরিকরূপে তার প্রাপ্য আসন নির্দিষ্ট করে দিতে পেরেছেন।
এই বিশ্বনাগরিক হওয়ার জন্য বিশ্বভারতীয় সৃষ্টি।
পূর্বেই বলেছি, আশ্রম যতদিন বারো বৎসরের বেশি বয়স্ক ছাত্র নিত না ততদিন ব্রহ্মচর্যাদর্শ সম্মুখে রাখা সম্ভবপর ছিল। কিন্তু ব্রহ্মচর্যাশ্রম যখন বিশ্বভারতীতে রূপান্তরিত হল (স্কুলের সঙ্গে কলেজও যুক্ত হল) তখন পূর্ণবয়স্ক কিশোর ও যুবাকেও গ্রহণ করতে হয়। এই বিশ্বভারতী নির্মাণে রবীন্দ্রনাথের প্রধান উৎসাহদাতা ও সচিব ছিলেন বিধুশেখর ও ক্ষিতিমোহন (সঙ্গীতে দিনেন্দ্রনাথ, চিত্রে নন্দলাল)। রবীন্দ্রনাথ যখন বললেন, এই শান্তিনিকেতনে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের গুণী-জ্ঞানীরা একত্র হবেন– সঙ্গে সঙ্গে বিধুশেখর সংস্কৃত থেকে উদ্ধার করে দিলেন, যত্র বিশ্ব ভবত্যেকনীড়ম।
বিধুশেখরের আনন্দের সীমা নেই। এতদিন আশ্রম-বালক তার কাছ থেকে সন্ধি-সমাস পূর্ণরূপে আয়ত্ত করার পূর্বেই অধাতক অবস্থায় আশ্রম ত্যাগ করত, এখন ভারতের সর্ব খণ্ড থেকে আসতে লাগল প্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রছাত্রী। এরা লুপ্তপ্রায় যাঙ্কের নিরুক্ত অধ্যয়নে উগ্রীব, বিধুশেখরেরই সম্পাদিত ও অনূদিত পালি গ্রন্থ মিলিন্দা পহো থেকে তাকে বহুতর পঞহো (প্রশ্ন) শুধায়। বিধুশেখরের আনন্দ উচ্ছলিত হয়ে উপচে পড়ছে। এইবারে সত্য জ্ঞানচর্চা হবে। এইবারে তিনি তার জ্ঞানভাণ্ডার উজাড় করে দিতে পারবেন।
কিন্তু হায়, এইসব ছাত্রছাত্রীর অনেকেই ভো ব্রহ্মচর্যে বিশ্বাস করে না। এমনকি এদের ভিতর নাস্তিক চার্বাকপন্থীও একাধিক ছিল। খ্রিস্টান-মুসলমানও ছিল। এদের কেউ কেউ সমবেত উপাসনায় বেদমন্ত্র উচ্চারণ করতে অনিচ্ছুক। খ্রিস্টান ছেলেটির আপত্তি ছিল না কিন্তু সেই চার্বাকপন্থী তাকে বোঝাল খ্রিষ্টানের সর্বপ্রার্থনা যিশুর মারফত পাঠাতে হয়, বেদমন্ত্রে তা হয় না; এবং মুসলমানকে আল্লা-রসুলের দোহাই দিল। খ্রিস্টান ধাঁধায় পড়ল, মুসলমান বলল, পাঁচ বেককে সাত বেকৎ করতে তার আপত্তি নেই, কিন্তু বেদমন্ত্রদ্বারা উপাসনা করছে এ খবর পেলে তার পিতা অসন্তুষ্ট হবেন।
নাচার অধ্যক্ষ বিধুশেখর সিদ্ধান্তের ভার ছেড়ে দিলেন পাদ্রি এজের হাতে।
এন্ড্রুজ আবেগ-ভরা কণ্ঠে বিশ্বমানবিকতার শপথ নিয়ে বেদমন্ত্রের সর্বজনীনতা ব্যাখ্যা করলেন। আস্তিক-নাস্তিক সকলেই সম নতমস্তকে তার বক্তব্য শুনল। কিন্তু সংশয়বাদী তথা নাস্তিকদের মত পরিবর্তন হল না।
রবীন্দ্রনাথ ছাত্রছাত্রীদের সমবেত উপাসনায় যোগ দিতে বাধ্য করলেন না।
ক্ষিতিমোহন সমাজে সংস্কারমুক্ত ছিলেন বলে কেউ যেন মনে না করেন তিনি। শুচি-অশুচির পার্থক্য করতেন না। কিন্তু তাঁর কষ্টিপাথর মনু এমনকি ঋগ্বেদ থেকেও তিনি আহরণ করেননি। বেদ থেকে নিশ্চয়ই, কিন্তু সেটি আয়ুর্বেদ। একে তিনি বৈদ্যকুলোব, তদুপরি তিনি গভীর মনোযোগ সহকারে আয়ুর্বেদ অধ্যয়ন করেছিলেন; আহারবিহার তিনি তাই আয়ুর্বেদসম্মত পদ্ধতিতেই করতেন।
প্রাচীন-অর্বাচীন নিয়ে তার ব্যক্তিগত জীবনে কোনও দ্বন্দ্ব ছিল না। উপনিষদের বাণীর সন্ধান তিনি অহরহ পাচ্ছেন আউল-বাউলে। আবার আউল-বাউলের আচার-আচরণ তিনি পাচ্ছেন অথর্ববেদে। তার সম্মুখে বহু পন্থা, তিনি সবকটিতেই বিশ্বাস করেন।
তিনি ছিলেন বিধুশেখর ও রবীন্দ্রনাথের মাঝখানে সেতুম্বরূপ– এন্ড্রুজ যেরকম ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও গাঁধীর মাঝখানে। তিনি এ যুগে সনাতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের অসম্ভব আদর্শে বিশ্বাস করতেন না, আবার সখা বিধুশেখরের নিষ্ঠায় শ্রদ্ধাবান ছিলেন বলে তাকে সমর্থন করতে পারলে আনন্দিত হতেন। বিশ্বভারতীর আদর্শ, তার ধ্যানলোকের ঐতিহ্যের সন্ধানে বিধুশেখর শরণ নিতেন ঋগ্বেদের, আশ্রমের পাল-পার্বণের জন্য মন্ত্রসন্ধানে ক্ষিতিমোহন যেতেন অথর্ববেদে।
