সে উত্তর না দিয়ে শুধু মিট মিট করে হাসত। চট্টগ্রামের জিতেন হোড় বলত, নিশ্চয়ই দাদামশাই। আমি বললুম, মা। (আশা করি, এ লেখাটি মীরাদি বা তার মেয়ে বুড়ির চোখে পড়বে না তাদের শোক জাগাতে আমার কতখানি অনিচ্ছা সেকথা অন্তর্যামী জানেন। সেই নীতু গেল ইয়োরোপে। ক্ষয়রোগে মারা গেল ১৯/২০ বছর বয়সে। এই শেষ শোকের বর্ণনা দিতে কারওই ইচ্ছা হবে না। কবির বয়স তখন ৭১। একে নিজের শোক, তার ওপর কন্যা পুত্রহারা মাতার শোক।
শুধু একটি সামান্য ঘটনার উল্লেখ করি– শ্রীযুক্তা নির্মলকুমারী মহলানবিশের বাইশে শ্রাবণ থেকে নেওয়া।
রবীন্দ্রনাথ তখন থাকতেন বরানগরে মহলানবিশদের সঙ্গে। বন্ধু এজ সায়েবের কাছ থেকে চিঠি পেলেন, নীতুর শরীর আগের চেয়ে একটু ভালো।
পরদিন সকালবেলা খবরের কাগজে রয়টারের টেলিগ্রামে দেখলাম, ছ দিন (দু দিন?) আগে ৭ আগস্ট জার্মানিতে নীতুর মুত্যু হয়েছে।
এ খবরটা রবীন্দ্রনাথের কাছে ভাঙা যায় কী প্রকারে?
শেষে স্থির হল খড়দায় রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবীকে টেলিফোন করে আনিয়ে আমরা চারজনে একসঙ্গে কবির কাছে গেলে কথাটা বলা হবে। প্রতিমাদি এলে সবাই মিলে কবির ঘরে গিয়ে বসা হল। রথীন্দ্রনাথকে কবি প্রশ্ন করলেন, নীতুর খবর পেয়েছিস, সে এখন ভালো আছে, না? রথীবাবু বললেন, না, খবর ভালো না। কবি প্রথমটা ঠিক বুঝতে পারলেন না। বললেন, ভালো? কাল এজও আমাকে লিখেছেন যে নীতু অনেকটা ভালো আছে। হয়তো কিছুদিন পরেই ওকে দেশে নিয়ে আসতে পারা যাবে।(৩) রথীবাবু এবার চেষ্টা করে গলা চড়িয়ে বললেন, না, খবর ভালো নয়। আজকের কাগজে বেরিয়েছে। কবি শুনেই একেবারে স্তব্ধ, রথীবাবুর মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। একটু পরেই শান্তভাবে সহজ গলায় বললেন, বৌমা আজই শান্তিনিকেতন চলে যান, সেখানে বুড়ি একা রয়েছে। আমি আজ না গিয়ে কাল যাব, তুই আমার সঙ্গে যাস।
নীতুর মা জর্মনি গিয়েছিলেন পুত্রের অসুস্থতার খবর পেয়ে। তিনি যেদিন বোম্বাই পৌঁছবেন, তার কয়েকদিন আগে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বোম্বাইয়ের ঠিকানায় চিঠি লেখেন। তাতে সেই আছে ও নাই-য়ের উত্তর আছে। তাতে এক জায়গায় তিনি লেখেন, যে রাত্রে শমী গিয়েছিল(৪), সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক, আমার শোক তাকে একটুও পিছনে যেন না টানে। তেমনি নীতুর চলে যাওয়ার কথা যখন শুনলুম তখন অনেকদিন ধরে বার বার করে বলেছি, আর তো আমার কোনও কর্তব্য নেই, কেবল কামনা করতে পারি এর পরে যে বিরাটের মধ্যে তার গতি, সেখানে তার কল্যাণ হোক। সেখানে আমাদের সেবা পৌঁছয় না, কিন্তু ভালোবাসা হয়তো-বা পৌঁছয়– নইলে ভালোবাসা এখনও টিকে থাকে কেন?
এই সেই মূল কথা। সে নেই কিন্তু আমার ভালোবাসার মধ্যে সে আছে। বার বার নমস্কার করি শুরুকে, গুরুদেবকে। বার বার দূরদৃষ্টের সঙ্গে কঠোর সংগ্রামে তিনি কাতর হয়েছেন, কিন্তু কখনও পরাজয় স্বীকার করেননি।
এবং পাঠক-পাঠিকাদের উপদেশ দিই, প্রিয়-বিয়োগ– এমনকি প্রিয়বিচ্ছেদ হলে তারা যেন উপরে বর্ণিত এই চিঠিখানা পড়েন। এ চিঠি মুক্তপুরুষের লেখা চিঠি নয়। কারণ গীতায় আছে মুক্তপুরুষ দুঃখে অনুদ্বিগ্নমন। রবীন্দ্রনাথ দুঃখে আমাদের মতোই কাতর হতেন– হয়তো-বা আরও বেশি; কারণ তার দিলের দরদ, হৃদয়ের স্পর্শকাতরতা ছিল আমাদের চেয়ে লক্ষগুণ বেশি কিন্তু তিনি পরাজয় মানতেন না। আমরা পরাজয় মেনে নিই। এ চিঠি যদি একজনকেও পরাজয়-স্বীকৃতি থেকে নিষ্কৃতি দেয় তবে অন্যলোকে রবীন্দ্রনাথ তৃপ্ত হবেন।
সহৃদয় পাঠক, তুমি সিনেমা দেখতে যাও। সেখানে যদি কোনও ছবিতে তোমার হিরোর জীবনে পরপর এতগুলো শোকাবহ ঘটনা ঘটত তবে তুমি বলতে, এ যে বড় বাড়াবাড়ি। এ যে অত্যন্ত অবাস্তব, আরিয়ালিস্টিক।
তাই বটে। যা জীবনে বাস্তব তা হয়ে যায় সিনেমায় অবাস্তব! আশ্চর্য! আমার কাছে আবার সিনেমাটা অত্যন্ত অবাস্তব ঠেকে।
তাই সিনেমাওয়ালাদের কাছেই রবীন্দ্র-জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর অধ্যায় তুলে ধরলুম। নইলে রবীন্দ্রনাথের শোক ও কাব্যে তার প্রতিচ্ছবি এ জাতীয় ডক্টরেট থিসিস লেখবার বয়স আমার গেছে। আর তাই এ রম্যরচনাটি আরম্ভ করেছি আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। কারণ আমার জীবন আর তোমাদের পাঁচজনের জীবনের লেশমাত্র পার্থক্য নেই। তফাৎ যদি থাকে, তবে শুধু এইটুকু যে, তোমরা মনোবেদনা গুছিয়ে বলতে পার না বলে গুমরে গুমরে মরো বেশি। কিন্তু তোমাদের এই বলে সান্ত্বনা জানাই, যতদিন তোমার প্রিয়জন তোমার প্রতি সহৃদয় ততদিন তোমার না বলা সত্ত্বেও সে তোমার হৃদয়ের সব কথাই বোঝে। আর যেদিন তার হৃদয় বিমুখ হয়ে যায়, সেদিন যতই গুছিয়ে বল না কেন, সে শুনবে না। কাজেই না-বলতে পারাটা তোমাকে গুছিয়ে-বলতে-পারার বিড়ম্বনা থেকে অন্তত বাঁচাবে।
———
১. ইনি কী রোগে গত হন জানা যায়নি। রবীন্দ্রনাথ বলতেন, উদরের পীড়া, খুব সম্ভব এপেন্ডিসাইটিস। আমি বাল্যকালে গুরুজনদের মুখে শুনেছি সূতিকা।
২. রবীন্দ্রনাথও পুত্রহারা-মাতা তার কন্যার দিকে তাকিয়ে শুধিয়েছেন, তুমি স্থির সীমাহীন নৈরাশ্যের তীরে নির্বাক অপার নির্বাসনে। অহীন তোমার নয়নে অবিরাম প্রশ্ন জাগে যেন–কেন, ওগো কেন?– দুর্ভাগিনী, বীথিকা, পৃ, ৩০৯
