৩. এর আগের দিন রথীন্দ্রনাথ শ্রীযুক্ত মহলানবিশকে বলেন, কাল এজের চিঠি পেয়ে অবধি নীতুর জন্য মনটা উদ্বিগ্ন হয়ে আছে, যদিও তিনি লিখেছেন, ও এখন একটু ভালোর দিকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সাহেব লিখেছেন, নীতুকে হয়তো শিগগিরই দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তা হলে তাবছি তাকে একটা কোনও ভালো জায়গায় অনেকদিন ধরে রেখে দেব। ভাওয়ালি কি কোনও পাহাড়ে বেশ কিছুদিন থাকলেই সেরে উঠবে। পৃ. ২৮
৪. এর মৃত্যুর কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। এবং আরও বলেছি মাতা ও পুত্র যান একই দিনে, এবং আশ্চর্য, দাদামশাই ও নাতি যান একই দিনে। (২২ শ্রাবণ)।
রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সহকর্মিদ্বয়
রবীন্দ্রনাথের জীবন ও রচনার ওপর দেশি-বিদেশি কোন কোন মহাজন তথা কীর্তিমান লেখক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, সে বিষয় নিয়ে বাঙলাসাহিত্যে বহু বৎসর ধরে আলোচনা-গবেষণা হবে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এমনও একাধিক সজ্জন আছেন যাদের সন্ধান রবীন্দ্রনাথের রচনা থেকে অতি সহজে পাওয়া যাবে না, যদিও এদের প্রভাব থাক আর না-ই থাক, এদের সাহচর্যে যে রবীন্দ্রনাথ উপকৃত হয়েছেন সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
যে একটি বিষয়ে অনুমতি পেলে আমি প্রথমেই বলতে চাই সেটি এই–দীর্ঘ পাঁচ বৎসর ধরে ছাত্রাবস্থায় আমি রবীন্দ্রনাথকে ক্লাস নিতে দেখেছি, সভাস্থলে সভাপতিরূপে, আপন প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা, নাট্যের পাঠকরূপে এবং অন্যান্য নানারূপে তাকে দেখেছি। আমার মনের ওপর সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে, গুণী-জ্ঞানীর সঙ্গে তার কথোপকথন, কখনও কখনও সূর্যাস্ত থেকে রাত্রি দ্বিপ্রহর পর্যন্ত তর্ক, ভাবের আদান-প্রদান, আলোচনা। কিন্তু, এই সমস্ত আলোচনায় তাকে তার সৃজনী সাহিত্যের (ক্রিয়েটিভ লিটরেচারের) আঙ্গিকের (টেকনিকাল দিকের আলোচনা করতে শুনিনি। যেমন বেলা-র সঙ্গে খেলা মিলের চেয়ে পূর্ণিমা সন্ধ্যায়-এর সঙ্গে উদাসী মন ধায় অনেক ভালো মিল, কিংবা তারচেয়ে অনেক বড় সাধারণতত্ত্ব- লিরিকে কী গুণ থাকলে কবি এমনই শব্দের সঙ্গে শব্দ বসাতে পারেন যার ফলে পাঠক শব্দ অর্থ ধ্বনি সবকিছু পেরিয়ে অপূর্ব নবীন লোকে উপনীত হয়। তাঁর বহু বহু গান শুনে মনে হয়, এই যে অভূতপূর্ব শব্দ সম্মেলন, যার একটিমাত্র শব্দ পরিবর্তন করে অন্য শব্দ প্রয়োগ সম্পূর্ণ অসম্ভব–আর্টে এই পরিপূর্ণ সিদ্ধহস্তের কৃতিত্ব আসে কী প্রকারে তিনি কোন পদ্ধতিতে এখানে এসে পৌঁছলেন? কিংবা কোনও সুচিন্তিত পূর্ব-পরিকল্পিত পদ্ধতি যদি না থাকে তবে অন্তত সে পরিপূর্ণতায় পৌঁছবার পক্ষে নতুন নতুন বাঁকে বাঁকে তিনি কী দেখলেন, কী অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলেন?
বিষয়টি আমি খুব পরিষ্কার করে পেশ করতে পারলুম না, কিন্তু আমার মনে ভরসা আছে, যারা শুধু পাঠক নন, কবিতা বা গল্প সৃষ্টি করেন, তারা আমার বক্তব্যটি অনুমানে অনুভব করে নিয়েছেন।
অবশ্য শুনেছি, পরবর্তী যুগে কবি যখন তথাকথিত আধুনিক কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গল্প-কবিতা লিখতে আরম্ভ করেন তখন নাকি তিনি ওই নিয়ে বিস্তর আলোচনা তর্ক-বিতর্ক করেন। তার বোধহয় অন্যতম কারণ, আধুনিক কবিতার বহুলাংশ বুদ্ধিবৃত্তির ওপর নির্ভর করে বলে তাই নিয়ে আলোচনা করা সহজ; পক্ষান্তরে আমি পূর্বে যে বিষয়ের উল্লেখ করেছি সেটা প্রধানত বুদ্ধির ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এমনকি সঙ্গীতের রাগ-রাগিণী, ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গীতের ভিন্ন ভিন্ন প্রসাদগুণ এবং ওই সম্পর্কে অন্যান্য নানা বিষয় তাঁকে আলোচনা করতে শুনেছি কিন্তু তিনি স্বয়ং যে তার গানে শব্দ ও সুরের পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যে পৌঁছলেন সেটা কী পদ্ধতিতে হল, তার ক্রমবিকাশের সময় কোন কোন দ্বন্দ্ব কিংবা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল সে সম্বন্ধে বিশেষ কোনও আলোচনা করতে শুনিনি। আমি যে পাঁচ বৎসর এখানে ছিলুম, তখন তাকে বহু-বহুবার সঙ্গীতরাজ দিনেন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, খোশগল্প করতে শুনেছি, কিন্তু, যেমন মনে করুন, তার প্রথম বয়সের অপেক্ষাকৃত কাঁচা কথাসুরের সম্মিলিত গান থেকে তিনি কী করে নিটোল গানের পরিপূর্ণতায় পৌঁছলেন সে সম্বন্ধে কোনও আলোচনা করতে শুনিনি। স্বৰ্গত ধূর্জটিপ্রসাদ এবং শ্ৰীযুত দিলীপ রায়ের সঙ্গে তিনি সঙ্গীত নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন এবং এখানকার শিক্ষক শাস্ত্রজ্ঞ সুপণ্ডিত ভীমরাও শাস্ত্রীর সঙ্গে তো অহরহই হত কিন্তু আমি এস্থলে যে বিষয়টির অবতারণা করেছি সেটি হত বলে জানিনে।
এবং এস্থলে আমার যদি ভুলও হয় তাতেও আমার মূল বক্তব্যের কোনওপ্রকার ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। আমার মূল বক্তব্য : চিন্তার জগতে রবীন্দ্রনাথ কাদের সঙ্গে বিচরণ করতেন।
রবীন্দ্রনাথের সর্বজ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ পিতার মৃত্যুর প্রায় এক বৎসর পর (১৯০৫/৬) শান্তিনিকেতনে এসে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে পরলোকগমন পর্যন্ত স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপনা করার পর থেকে রবীন্দ্রনাথ এখানেই মোটামুটি পাকাপাকিভাবে বাস করেন। সে-যুগে তাঁদের ভিতর কতখানি যোগাযোগ ছিল বলতে পারি না, কিন্তু ১৯২১ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত অর্থাৎ দ্বিজেন্দ্রনাথের জীবনের শেষ পাঁচ বৎসর দুজনাতে একসঙ্গে বসে দীর্ঘ আলোচনা করতে কখনও দেখিনি। অথচ এ সত্য আমরা খুব ভালো করেই জানি, দ্বিজেন্দ্রনাথের পাণ্ডিত্য, চরিত্রবল তথা বহুমুখী প্রতিভার প্রতি রবীন্দ্রনাথের অতি অবিচল শ্রদ্ধা ছিল এবং জ্যেষ্ঠভ্রাতাও রবীন্দ্রনাথের কবিপ্রতিভাকে অতিশয় সম্মানের চোখে দেখতেন। শুধু তাই নয়, আমি আশ্রমে কিংবদন্তি শুনেছি, দ্বিজেন্দ্রনাথ নাকি একদা এক আশ্ৰমাচার্যকে বলেন, আমাদের সকলেরই পা পিছলেছে, কিন্তু রবির কখনও পা পিছলায়নি। অবশ্য স্মরণ রাখা উচিত, রবীন্দ্রনাথ প্রতি উত্সব দিনে, কিংবা বিদেশ থেকে আশ্রমে ফিরলে সেখানে প্রবেশ করামাত্র জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে প্রণাম করতে আসতেন। সামান্য যে দু-একটি কথাবার্তা হত তা অতিশয় আন্তরিকতার সঙ্গে। তা ছাড়া দ্বিজেন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে ছোট্ট একটি কবিতা কিংবা অন্য এই ধরনের কোনওকিছু একটা লিখে কবিকে পাঠিয়ে মতামত জানতে চাইতেন। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ভিন্ন অন্যকিছু রবীন্দ্রনাথকে প্রকাশ করতে শুনিনি।
