এর কয়েক মাস পরেই দ্বিতীয় মেয়ে রেণুকা বারো বছর বয়সেই পড়ল শক্ত অসুখে। যখন ধরা পড়ল ক্ষয় রোগ, তখন কবি তাঁকে বাঁচাবার জন্য যে কী আপ্রাণ পরিশ্রম আর চেষ্টা দিয়েছিলেন তার বর্ণনা দেওয়া আমার শক্তির বাইরে। কিছুটা বর্ণনা রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং দিয়েছেন– তখনও তিনি জানতেন না, মেয়েটি কিছুদিন পরে তাকে ছেড়ে যাবে। অসুস্থ অবস্থায়ও এই মেয়েটির প্রাণ ছিল আনন্দরসে চঞ্চল। পিতা-কন্যায় গাড়িতে করে স্বাস্থ্যকর জায়গায় যাবার সময় যে মধুর সময় যাপন করেন তার কিছুটা আভাস পাঠক পাবেন পলাতকার ফাঁকি কবিতাতে।
(বছর দেড়েক চিকিৎসাতে করলে যখন অস্থি জর জর
তখন বললে হাওয়া বদল করো।
পাঠক, এই তখন শব্দটির দিকে লক্ষ রাখবেন। রোগের প্রথম অবস্থায় নয়–যখন মৃত্যু আসন্ন। এ নিদারুণ অভিজ্ঞতা ক্ষয়-রুগীর অনেক আত্মীয়-স্বজনের হয়েছে।
দু বছরের ভিতরই দুইটি অকালমৃত্যু–অর্থহীন, সামঞ্জস্যহীন, যেন মানুষকে নিছক পীড়া দেবার জন্য ভগবান তাকে পীড়া দিচ্ছেন। তার পর চার বছর যেতে না যেতেই সর্বকনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ তেরো বছর বয়সে এক বন্ধুর সঙ্গে ছুটিতে বেড়াতে যায় মুঙ্গেরে। সেইখানে শমীন্দ্রের কলেরা হয়; কবি টেলিগ্রাফ পাইয়া কলিকাতা হইতে মুঙ্গের চলিয়া গেলেন। রবীন্দ্রনাথই এই সময়ের এক চিঠিতে লিখছেন, যে সংবাদ শুনিয়াছেন তাহা মিথ্যা নহে। ভোলা মুঙ্গেরে তাহার মামার বাড়িতে গিয়াছিল, শমীও আগ্রহ করিয়া সেখানে বেড়াইতে গেল, তাহার পরে আর ফিরিল না।
অনেকের মুখেই শুনেছি, শমীন্দ্র তার পিতার সবচেয়ে আদরের সন্তান ছিলেন। প্রভাত মুখোপাধ্যায় বলেন, সে আকৃতিতে প্রকৃতিতে পিতার অনুরূপ ছিল।
ঠিক পাঁচ বৎসর পূর্বে ওইদিনে কলিকাতায় শমীন্দ্রের মায়ের মৃত্যু হয়। প্রভাত মুখোপাধ্যায়।
কয়েক বৎসর পর রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই পুত্রের স্মরণে যে কবিতা লেখেন তাতে আছে,
বিজু যখন চলে গেল মরণপারের
দেশে বাপের বাহু-বাঁধন কেটে।
মনে হল, আমার ঘরের সকাল যেন মরেছে বুক ফেটে।
আবার অকালমত্য। শুধু ভগবান জানেন তার ভূমণ্ডল ব্যবস্থায়, ত্রিলোক নিয়ন্ত্রণে ইন হিজ স্কিম অব থিংস-এর কী প্রয়োজন?(২) শমী আমাদের পুত্র নয়, কিন্তু এ কবিতাটি পড়ে কার না বুক ফাটে? এ কবিতাটি আমি জীবনে মাত্র একবার পড়েছি। দ্বিতীয়বার পড়তে পারিনি।
এর পর দশ বছর কাটেনি। সর্বজ্যেষ্ঠ সন্তান, বড় মেয়ে মাধুরীলতার হল ক্ষয়রোগ। প্রভাত মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, আমিও শুনেছি, মাধুরীর স্বামীর সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির সদ্ভাব ছিল না (যদিও তাঁর পিতার সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির বিশেষ অন্তরঙ্গতা ছিল বলেই এ বিয়ে হয়। কবি বিহারী চক্রবর্তী ছিলেন কাদম্বরী দেবীর সর্বাপেক্ষা প্রিয় কবি)। রবীন্দ্রনাথ দুপুরবেলা মেয়েকে দেখতে যেতেন বন্ধ গাড়িতে করে। জামাই তখন আদালতে। সমস্ত দুপুর মেয়েকে গল্প শোনাতেন। হয়তো-বা কবিতা পড়তেন। বোধহয় তারই দু-একটি পলাতকা (নামকরণ অবশ্য পরে হয়) বইয়ে স্থান পেয়েছে।
একদিন দুপুরে বাড়ির সামনে পৌঁছতেই বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। কবি কোচম্যানকে গাড়ি ঘোরাতে হুকুম দিলেন। বাড়িতে প্রবেশ করলেন না। আমি শুনেছি, এই মেয়ে নাকি বড় উৎসুক আগ্রহে পিতার লেখার জন্য প্রতীক্ষা করতেন। ভাগলপুরে, কলকাতায়।
বহু বহু বত্সর পর এর সখী ঔপন্যাসিকা অনুরূপা দেবী লেখেন, (উভয়ের শ্বশুরবাড়ি ভাগলপুর বোধহয় সেইসূত্রে পরিচয় ও সখ্য) মেয়ের স্মরণে কবির চোখ দিয়ে দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। বোধহয় পলাতকার মুক্তি কবিতায় এ মেয়ের কিছুটা বর্ণনা পাওয়া যায়।
***
পূর্বেই বলেছি, মাধুরীলতার রোগশয্যায় কবি তাকে গল্প বলতেন। এবং শেষের দিকে বোধহয় বেদনার সঙ্গে অনুভব করেছিলেন যে এ মেয়েও বাঁচবে না। তখন তিনি হৃদয়ঙ্গম করলেন, তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, এরা সব তার মায়ার বন্ধন কেটে সময় হবার বহু পূর্বেই পালিয়ে যাচ্ছেন–এরা সব পলাতকা। তাই মাধুরীলতার মৃত্যুর কয়েক মাস পরেই বেরুল পলাতকা। এই বইয়ের ওপর মাধুরী, রেণুকা, শমী তিনজনের ছাপ স্পষ্ট রয়েছে। আরও হয়তো কয়েক জনের ছাপ রয়েছে, কিন্তু তারা হয়তো তার পরিবারের কেউ নয়, তাই তাদের ঠিক চেনা যায় না।
পলাতকার সর্বশেষের কবিতাটিতে আছে,– কবিতাটির নাম শেষ প্রতিষ্ঠা–
এই কথা সদা শুনি, গেছে চলে, গেছে চলে
তবু রাখি বলে
বোলো না সে নাই।
***
আমি চাই সেইবানে মিলাইতে প্রাণ।
যে সমুদ্রে আছে নাই পূর্ণ হয়ে রয়েছে সমান।
এই কবিতাটি কবির সর্ব পলাতকার উদ্দেশে লেখা। কিন্তু প্রশ্ন, আছে ও নাই দুটোই একসঙ্গে অস্তিত্ব রাখে কী প্রকারে? কবি এর উত্তর দিলেন– অবশ্য সে উত্তরে সবাই সন্তুষ্ট হবেন কি না জানিনে তাঁর জীবনের শেষ শোকের সময়।
পলাতকার সব কটি পালিয়ে যাবার পর কবির রইলেন, পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও কন্যা মীরা। এই মীরাদির একটি পুত্র ও কন্যা। এ নাতিটিকে রবীন্দ্রনাথ যে কীরকম গভীর ভালোবাসা দিয়ে ডুবিয়ে রেখেছিলেন সেকথা ওই সময়ে আশ্রমবাসী সবাই জানে। একটু ব্যক্তিগত কথা বলি–নীতু যদিও আমার চেয়ে বছর নয়েকের ছোট ছিল তবু হস্টেলে সে প্রায়ই আমার ঘরে আসত। ভারি প্রিয়দর্শন ছিল সে। মাঝে মাঝে ফিনফিনে ধুতি কুর্তা পরে এলে মানাত চমৎকার– আমরা গুতুম, কে সাজিয়ে দিল রে।
